আন-নাসর মিডিয়ানির্বাচিতনির্বাচিত প্রকাশনাপিডিএফ ও ওয়ার্ডবই ও রিসালাহ [আন নাসর]মিডিয়া

Bengali Translation || এগারো সেপ্টেম্বরের বরকতময় হামলা প্রকৃত সত্য ও সংশয় নিরসন- নুমান হিজাযী 

اداره النصر
আন নাসর মিডিয়া
An Nasr Media

پیش کرتے ہیں
পরিবেশিত
Presents

بنگالی ترجمہ
বাংলা অনুবাদ
Bengali Translation

عنوان:
শিরোনাম:
Titled

گیارہ ستمبر کے بابرکت حملے: حقائق و شبہات

এগারো সেপ্টেম্বরের বরকতময় হামলা
প্রকৃত সত্য ও সংশয় নিরসন

The Blessed Attacks of September 11
The True Facts and the Removal of Doubts

 

نعمان حجازى

নুমান হিজাযী

Nu’man Hijazi

 

ভূমিকা

আজ সেই বরকতময় ঘটনার পঁচিশটি বছর পেরিয়ে গেছে। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে মিসরীয় ইশতিশহাদী (শাহাদাতকামী) মুজাহিদ মোহাম্মদ আতা আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর ১১-কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আছড়ে ফেলেন। আর ঠিক এই মুহূর্তটিই পুরো বিশ্বকে যেন চিরতরে বদলে দেয়। পৃথিবীর ইতিহাস সুনির্দিষ্টভাবে ১১ই সেপ্টেম্বরের আগে (Pre 9/11) এবং ১১ই সেপ্টেম্বরের পরে (Post 9/11) নামক দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর সকাল ৯টা ৩ মিনিটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইশতিশহাদী মুজাহিদ মারওয়ান আল-শেহি ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর ১৭৫ নিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত হানেন। এই ঘটনার পরপরই আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংবাদ মাধ্যমগুলো ‘America Under Attack’ বা ‘আমেরিকা আক্রান্ত’ শিরোনামে সংবাদ প্রচার করতে বাধ্য হয়। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে সৌদি আরবের ইশতিশহাদী মুজাহিদ হানি হানজুর আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর ৭৭-কে খোদ পেন্টাগনে আছড়ে ফেলেন। তাদের এই সুরক্ষিত সামরিক দুর্গে হামলার মধ্য দিয়ে মূলত আমেরিকার ‘অস্পৃশ্য’ থাকার কাল্পনিক মূর্তিও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। প্রথম আঘাতের ৫৬ মিনিট পর সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে দক্ষিণ টাওয়ারটি ধসে পড়ে। অন্যদিকে উত্তর টাওয়ারটি বিমান হামলার ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিট পর সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এরই মাঝে লেবাননের ইশতিশহাদী মুজাহিদ জিয়াদ জাররাহ ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর ৯৩-কে হোয়াইট হাউসের দিকে আছড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে ধেয়ে যাচ্ছিলেন। তবে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে বিমানটি পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের সমারসেট কাউন্টির একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

এই হামলার ফলে আমেরিকার যে ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:

  • এই হামলার কারণে আমেরিকাকে সর্বমোট ১০৫ বিলিয়ন (১০৫,০০০,০০০,০০০) মার্কিন ডলারের বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
  • হামলার প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে দুই হাজার নয়শত সাতাত্তর (২,৯৭৭) জন নিহত হয়।
  • ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপ ধসে পড়ার কারণে প্রাপ্ত আঘাত এবং সেই ধ্বংসস্তূপের ধুলো ও দূষণ থেকে সৃষ্ট নানাবিধ রোগে নয় হাজার ছয়শ (৯,৬০০)-এরও বেশি মানুষ মারা যায়। এভাবে হামলার ফলে নিহতের সর্বমোট সংখ্যা সাড়ে বারো হাজার (১২,৫০০+) ছাড়িয়ে যায়।
  • ধ্বংসস্তূপের ধুলো ও মারাত্মক দূষণের ফলে এক লাখ চল্লিশ হাজার (১৪০,০০০) মানুষ গুরুতর রোগে আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে সাতান্ন হাজার (৫৭,০০০) মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।
  • হামলার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে এক লাখ ছেচল্লিশ হাজার একশ (১৪৬,১০০) চাকরি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
  • এই হামলাগুলো আমেরিকানদের মনস্তত্ত্বে এতটাই গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে, চার লাখ বাইশ হাজার (৪২২,০০০) মানুষ স্নায়ুবিক রোগ পিটিএসডিতে (PTSD) আক্রান্ত হয়।
  • ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের স্থানে হামলার পর সুদীর্ঘ নিরানব্বই (৯৯) দিন পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি।

আমেরিকায় যখন এই হামলাগুলো সংঘটিত হচ্ছিল, পাকিস্তানে তখন রাতের আঁধার নেমে এসেছে। সে সময় ইন্টারনেটের সুবিধা আজকের মতো এত সহজলভ্য হয়নি; ফলে বেশিরভাগ মানুষ টিভিতে প্রচারিত খবরের মাধ্যমেই এই চমকপ্রদ তথ্যটি জানতে পারে। পরের দিন যখন খবরটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সবখানে প্রবল উত্তেজনা ও বাঁধভাঙা আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। এটি যে মুজাহিদদেরই হামলা, তা নিয়ে কারও মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। সবাই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এটি বিশ্বাস করত, আর সবার মনেই এই আনন্দ কাজ করত যে, মুজাহিদরা শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে একটি ভালো শিক্ষা দিতে পেরেছে।

তবে বেশি সময় পার না হতেই সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিকল্প ন্যারেটিভ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মানুষের মন ও মগজে জায়গা করে নিতে শুরু করে। এই আখ্যানটি দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে যে, এই হামলাগুলো মূলত আমেরিকা নিজেই করিয়েছে অথবা এটি স্রেফ একটি ‘ইহুদী ষড়যন্ত্র’। আমাদের এই অঞ্চলে ‘যা হচ্ছে তা আমেরিকাই করাচ্ছে’ নামক এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা তো সবসময়ই বিরাজমান ছিল। এর পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনাকেই ‘ইহুদী ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দেওয়াও একটি অতি সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। আর ঠিক এ কারণেই এই বিকল্প আখ্যান এবং এর সাথে যুক্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করার কিংবা এর সত্য-মিথ্যা উদ্ঘাটন করার কোনো কষ্টই কেউ করেনি। আর সম্ভবত বাকি বিশ্বের অবস্থাও ঠিক একই রকম ছিল। ফলে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করে নেয় যে, এটি একটি ‘ইহুদী ষড়যন্ত্র’ বা ‘Inside Job’ (ভেতরের কাজ)।

কিন্তু এসব তো সিকি শতাব্দী আগের কথা। তখন আমেরিকা ছিল বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। সে যুগে এমন একটি ধারণা প্রবলভাবে প্রচলিত ছিল যে, আমেরিকার অনুমতি ছাড়া খোদ আমেরিকায় কোনো পাখিও ডানা মেলতে পারে না। তখন মানুষের মনে এই চিন্তাই বদ্ধমূল ছিল যে, আমেরিকা এতটাই শক্তিশালী যে, কেউই তার টিকিটিও ছুঁতে পারবে না। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এমন চিন্তাকারীদের হয়তো কোনো অজুহাত দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আজ দীর্ঘ পঁচিশটি বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১১ই সেপ্টেম্বরের পরের দুই দশকে আমেরিকার সমস্ত অহংকার, ঔদ্ধত্য, দাপট এবং একমাত্র পরাশক্তি হওয়ার আকাশচুম্বী অহমিকা আজ ধুলোয় মিশে গেছে। এই হামলাগুলোর অসীম প্রভাব ও বরকত, এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল এবং বাস্তব প্রতিক্রিয়া যখন দিবালোকের মতো স্পষ্টভাবে সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে; বিশ্ব যখন ‘ইউনিপোলার’ ব্যবস্থা থেকে ‘মাল্টিপোলার’ ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে, আজও এমন বিপুল সংখ্যক মানুষ রয়েছেন যারা এখনও ১১ই সেপ্টেম্বরের এই বরকতময় হামলাগুলোকে সেই পুরনো ‘Inside Job’ বা ‘ইহুদী ষড়যন্ত্র’ বলেই আখ্যা দিয়ে থাকেন।

যারা আজও মনে করে যে এই হামলাগুলো আমেরিকা নিজেই করিয়েছে, কিংবা এগুলো নেহাতই ইহুদী ষড়যন্ত্র, অথবা যারা এই হামলার নিন্দা করে, তাদের বুদ্ধিমত্তার দেউলিয়াত্বের জন্য কেবল শোকই প্রকাশ করা যায়। দীর্ঘ সিকি শতাব্দীতে এতসব যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও যাদের চোখ খোলেনি; এমনকি শায়খ উসামা, শায়খ আইমান এবং আল-কায়েদার অন্য অনেক শীর্ষ নেতার সুস্পষ্ট বিবৃতি এবং ১১ই সেপ্টেম্বরের ইশতিশহাদীদের (শাহাদাতকামীদের) রেখে যাওয়া অসিয়তের জ্বলন্ত শব্দগুলো শুনেও যাদের মোহভঙ্গ হয়নি, তাদের চোখ হয়তো এই লেখাও খুলতে পারবে না। তবুও এই লেখাটি যৌক্তিক প্রমাণের সাহায্যে প্রচলিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর নিরেট অসারতা প্রমাণ করার, মানুষের মনের সংশয়গুলো খণ্ডন করার এবং আসল সত্যটি পাঠকদের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। আল্লাহ তাআলা আমাদের সত্যকে সঠিকভাবে চেনার এবং নিষ্ঠার সাথে তার অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

اللّٰهُمَّ أَرِنَا الحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتِّبَاعَهُ وَأَرِنَا البَاطِلَ بَاطِلًا وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ.

“হে আল্লাহ! আমাদের সামনে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখান এবং তা অনুসরণ করার তাওফীক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে দেখান এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিন।”

ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো কে ও কেন ছড়াল?

যেভাবে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ছড়ানো হয়েছে, তা দেখলেই এর পেছনের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। বিষয়টি এতটাও সরল নয় যে, সরকার বিরোধী গোষ্ঠীগুলো কেবল সরকারের প্রতি অনাস্থা থেকেই এগুলো ছড়াচ্ছে। ব্যাপারটি যদি এমনই হতো, তবে কিছুদিন পরই তারা আসল সত্যটা উপলব্ধি করতে পারত এবং এই তত্ত্বগুলোও এমনিতেই ধূলিসাৎ হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ছড়িয়ে আসলে কার ফায়দা ছিল?

এ নিয়ে যতই গভীর চিন্তা করা হোক না কেন, একটি কথাই বারবার সামনে আসে যে, এই তত্ত্বগুলো ছড়িয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে খোদ মার্কিন সরকার। মূলত এ কারণেই মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেই এগুলো ছড়ানোর সূচনা হয়েছিল। এখানে অনেকের মনেই একটি আপত্তি জাগতে পারে, যার বিরুদ্ধে এই তত্ত্বগুলো ছড়ানো হচ্ছে এবং যাকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে, সে নিজে কেন এগুলো বানাবে ও ছড়াবে?

মার্কিন সরকারের নেপথ্য উদ্দেশ্য

মূলত মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এই তত্ত্বগুলো তৈরি করা এবং ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে দুটি বড় উদ্দেশ্য কাজ করছিল:

১. মুজাহিদরাই আমেরিকার একমাত্র শত্রু ছিলেন না; বিশ্বে আরও অনেকেই ছিল, যারা আমেরিকার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বসেছিল। কিন্তু আমেরিকা নিজেদের ‘সুপার পাওয়ার’ হওয়ার এমন এক ভীতি বা জুজু তৈরি করে রেখেছিল, যার কারণে সারা বিশ্বে এই ধারণাই বদ্ধমূল ছিল যে, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কেউ তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারবে না। আর খোদ আমেরিকার মাটিতে গিয়ে তাদের ক্ষতি করার কথা তো সবার কাছে নিতান্তই পাগলের প্রলাপ বলে মনে হতো। এখন মানুষের সামনে যদি এই সত্যটি উন্মোচিত হয়ে যেত যে, আফগানিস্তানের পাহাড়ের গুহায় বসে থাকা সহায়-সম্বলহীন কয়েকজন ‘সন্ত্রাসী’ আমেরিকায় ঢুকে এত বড় পরিসরে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম, তাহলে আমেরিকার যেসব শত্রুর কাছে তাদের চেয়ে ঢের বেশি রসদ ও উপায়-উপকরণ রয়েছে, তারা না জানি কী করে বসত! কিন্তু অন্যদিকে, সরকারি পর্যায়ে আমেরিকা এ কথাও অস্বীকার করতে পারছিল না যে, এই হামলাগুলো আল-কায়েদাই করেছে। এভাবে ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা আমেরিকার গলায় আটকে থাকা এমন এক কাঁটায় পরিণত হলো, যা তারা গিলতেও পারছিল না, আবার উগড়ে ফেলতেও পারছিল না। এই মহাসংকট থেকে নিষ্কৃতি পেতে আমেরিকা বিকল্প মিডিয়ার আশ্রয় নিল। একদিকে তারা মূলধারার মিডিয়ায় সরকারি বয়ান প্রচার করতে থাকল, আর অন্যদিকে বিকল্প মিডিয়ার মাধ্যমে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ছড়াতে শুরু করল। মানুষের কাছে যেন পুরো বিষয়টিই সন্দেহজনক হয়ে ওঠে এবং শত্রুদের অন্তরে তাদের শক্তির দাপট ও ভীতি অটুট থাকে, সেটিই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

২. দ্বিতীয় কারণটি হলো, যদি এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো না ছড়ানো হতো এবং সবাই এটাই জানত যে, হামলাগুলো আল-কায়েদাই করেছে, তবে মানুষ অনিবার্যভাবেই এর পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করত। আর মার্কিন জনগণ যদি সেই আসল কারণটি বুঝে ফেলত, তবে তা মার্কিন সরকারের জন্য আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যু সমতুল্য হতো। হামলার পরপরই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করা সত্ত্বেও, আমেরিকায় বিপুল সংখ্যক মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে প্রবল কৌতূহল জেগে ওঠে। পবিত্র কুরআনের কপিগুলো আমেরিকার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ে পরিণত হয়। আর এই হামলাগুলোর বরকতেই পরবর্তী বছরগুলোতে কোনো ধরনের অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে, লাখ লাখ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো যদি না থাকত, তবে মার্কিন সমাজে এর যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ত, তা মার্কিন সরকার ও তাদের প্রভুদের জন্য একেবারেই অসহনীয় হতো। আজও গাজায় ইসরাঈলি আগ্রাসনের পর, ইসরাঈলের প্রতি আমেরিকার নিঃশর্ত সমর্থন দেখে খোদ আমেরিকার অনেক মানুষই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলাগুলো সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত ছিল। এরপর শায়খ উসামা রহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বার্তাটিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি দেখে আবারও সেই পুরোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোকে উসকে দেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে এর প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। পাছে মানুষের সামনে আসল সত্যটা উন্মোচিত হয়ে যায়, কেবল এই ভয়েই এমনটি করা হয়েছে!

মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোতে স্ফুলিঙ্গ ছোঁয়ানোর পর, সেটিকে দাউদাউ করে জ্বালানোর কাজটি করেছে অন্যরা। আমেরিকার বামপন্থী লিবারেল বা উদারনৈতিক শ্রেণিটি মার্কিন সরকারের নীতি এবং তার ওপর ইহুদী লবির প্রভাব নিয়ে সবসময়ই বিরক্ত ছিল। অতীতে সিআইএ-এর যেসব গোপন অপারেশন লোকচক্ষুর সামনে উন্মোচিত হয়েছে, সেগুলোর কারণে এই শ্রেণিটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে নিয়েছিল যে, এই হামলাগুলোও নিশ্চিতভাবেই আমেরিকা নিজেই করিয়েছে।

মুসলিম বিশ্বে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রসার ও তার কারণ

এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পাওয়ার কিছুদিন পর, মুসলিম বিশ্বের মূলধারার মিডিয়াগুলোও এগুলোর প্রচার শুরু করে। এখানে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন মাথায় আসে যে, যদি এই হামলাগুলো আমেরিকা নিজেই গোপনে করিয়ে থাকে, তবে মুসলিম দেশগুলোর মূলধারার মিডিয়া, যারা কিনা খোদ আমেরিকার উচ্ছিষ্টের ওপরই বেঁচে থাকে, তারা কীভাবে এর প্রচার করতে পারল? আর তারা প্রচার করলেও, সেসব দেশের শাসক, যারা কিনা আমেরিকার প্রত্যক্ষ গোলাম, তারা কীভাবে এটি সম্প্রচার হতে দিল এবং তা আটকানোর কোনো চেষ্টাই করল না? এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনার আওতায় এই তত্ত্বগুলোর প্রচার চালানো হচ্ছিল। মুসলিম বিশ্বে যদি এই উপলব্ধি জাগ্রত হতো যে, গুহায় বসে থাকা সহায়-সম্বলহীন কয়েকজন মুজাহিদ রুখে দাঁড়িয়ে আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ারকে তাদের নিজেদের মাটিতে ঢুকে এমন মোক্ষম আঘাত হেনেছে, তবে তা এক বিশাল ঝড় তুলে দিতে পারত। মুজাহিদদের প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মানুষ দলে দলে তাদের কাতারে শামিল হতে শুরু করত এবং দেখতে দেখতে পুরো মুসলিম বিশ্বের মানচিত্রই বদলে যেত। মূলত এই গণজাগরণ ঠেকানোর জন্যই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর প্রচার অত্যন্ত জরুরি ছিল, যাতে মানুষের অন্তরে আমেরিকার সেই পুরোনো ভীতি ও দাপট বজায় থাকে।

শাসকদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে মূলধারার মিডিয়ার চালানো এই প্রোপাগান্ডাটি মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে থাকা ধর্মনিরপেক্ষ ও লিবারেল চিন্তাধারার মানুষেরা সবার আগে লুফে নেয়। এই শ্রেণিটি নুসরাতে ইলাহি এবং বরকতের মতো আধ্যাত্মিক ধারণাগুলো সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। তাদের দৃষ্টি ‘আলামুল আসবাব’ তথা দৃশ্যমান বস্তুগত কারণ ও উপকরণের জগতের বাইরে যেতেই পারে না। তাই এই শ্রেণির দৃষ্টিতে, গুহায় বসবাসকারী সহায়-সম্বলহীন মুজাহিদদের পক্ষে ১১ই সেপ্টেম্বরের মতো হামলা চালানো একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। এ কারণেই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর প্রচারে অংশ নেয়। এই শ্রেণিটি যদি কখনো বাধ্য হয়ে এমন কোনো কাজকে মুজাহিদদের দিকে সম্পৃক্ত করেও, তবুও তাদের মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বড় পরাশক্তির হাত রয়েছে। এর পাশাপাশি, পাশ্চাত্যের সামনে ইসলামী শিক্ষা নিয়ে হীনম্মন্যতা ও ক্ষমাপ্রার্থনা সুলভ মনোভাব পোষণকারী আরও একটি শ্রেণি তো রয়েছেই। তারা সবসময় এই যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টায় মগ্ন থাকে যে, ইসলাম তো কেবলই শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম; এ ধরনের ‘সন্ত্রাসী’ কার্যক্রমের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এই শ্রেণিটিও ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর প্রসারে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছে।

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের খণ্ডন

১১ই সেপ্টেম্বরের বরকতময় হামলার পরপরই ডজন ডজন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়। এর মাঝে অনেকগুলো তত্ত্ব তো এতটাই হাস্যকর ছিল যে, সেগুলোর কারণে বাকিগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। অন্যদিকে এমন অনেক তত্ত্বও ছিল, যেগুলো অত্যন্ত নড়বড়ে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল এবং সেগুলোকে খণ্ডন করার মতো অকাট্য প্রমাণও বিদ্যমান ছিল। এছাড়া তৃতীয় আরেক ধরনের তত্ত্ব ছিল, যেগুলোকে অত্যন্ত জোরালো ও অকাট্য প্রমাণের সাহায্যে খণ্ডন করা হলেও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী শ্রেণিটি সেসব প্রমাণ ও সত্যকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। নিচে আমরা এই তৃতীয় প্রকারের কয়েকটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়েই আলোচনা করব:

১. টুইন টাওয়ার বিমানের আঘাতে নয়, বরং ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে ধ্বংস করা হয়েছে

একটি বহুল প্রচলিত তত্ত্ব হলো, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার বিমানের আঘাতে ধ্বংস হয়নি; আর তা হওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ, বিমানে ব্যবহৃত জ্বালানি তথা জেট ফুয়েলের উত্তাপ এত বেশি থাকে না যা স্টিলের বিমগুলোকে গলিয়ে দিতে পারে। তাই তাদের দাবি হলো, উভয় ভবনের বিভিন্ন স্থানে আগে থেকেই বিস্ফোরক দ্রব্য স্থাপন করে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এই নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ থেকে মানুষের মনোযোগ সরানোর জন্যই কেবল বিমানগুলো সেখানে আছড়ে ফেলা হয়েছিল।

এখন কথা হলো, যদি সত্যি সত্যিই এই ভবনগুলোকে ভেতরে বিস্ফোরক লাগিয়ে ধ্বংস করা হতো, তবে এত বিশাল দুটি ভবনকে সোজা নিচের দিকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যে বিপুল পরিমাণ কাজ করা দরকার, তা সম্পন্ন করতে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই পুরো ভবনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিস্ফোরক বসানোর কাজ শুরু করতে হতো। প্রতিদিন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে পঞ্চাশ হাজার (৫০,০০০) কর্মী কাজ করতে আসতেন। এর বাইরেও সারাদিনে আরও প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার (১৪০,০০০) দর্শনার্থী ও সাধারণ মানুষ সেখানে যাতায়াত করতেন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে এটা একেবারেই অসম্ভব একটি ব্যাপার যে, প্রায় দুই লাখ মানুষের মধ্যে কেউই কখনো কাউকে এই ভবনগুলোতে বিস্ফোরক বসাতে দেখল না! তাছাড়া, এটি যদি সত্যিই কোনো নিয়ন্ত্রিত ধ্বংসযজ্ঞ অর্থাৎ ‘কন্ট্রোলড ডেমোলিশন’ হতো, তবে ধ্বংসস্তূপ এবং ওড়া ধুলোর মাঝে বিস্ফোরক দ্রব্যের কণা ও গন্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু এরও কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি।

এই পুরো কল্পকাহিনিটি যে মূল যুক্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে তা হলো, জেট ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানি জ্বলার সময় এর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পৌঁছায় ৯৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত, অন্যদিকে স্টিল গলে ১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তাহলে জেট ফুয়েল কীভাবে স্টিলের বিম গলাতে পারে, যার ফলে পুরো ভবনই ধসে পড়বে? কিন্তু এই তত্ত্বটি যারা উপস্থাপন করেন, তারা অত্যন্ত সাধারণ ও মৌলিক একটি বিষয় একেবারেই এড়িয়ে যান। আর তা হলো, এই টাওয়ারগুলো ধ্বংস হওয়ার জন্য স্টিলের বিমগুলো ‘গলে যাওয়া’ কেন জরুরি হবে? নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত স্টিল ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেই তার ৫০ শতাংশ শক্তি হারিয়ে ফেলে, আর ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে তা ৮০ শতাংশ শক্তি হারিয়ে ফেলে। আর উভয় টাওয়ারেই তাপমাত্রা ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এর কারণ হলো, সেখানে কেবল জেট ফুয়েলই জ্বলছিল না; বরং বিমান আছড়ে পড়ার পর ভবনগুলোতে যে আগুন ধরে যায়, তার ফলে ভেতরের অসংখ্য জিনিসপত্রও জ্বলতে শুরু করে। ভবনের লিফটের ফাঁকা জায়গাগুলো দিয়ে এই জেট ফুয়েল অন্যান্য তলাতেও গিয়ে পড়ে এবং সেখানেও আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। ভবনগুলোতে জেট ফুয়েলের সাথে সাথে আসবাবপত্র, বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র, কার্পেট, প্লাস্টিক ইত্যাদির মতো অসংখ্য জিনিস জ্বলছিল, যা আগুনের উত্তাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। উভয় টাওয়ারেই ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া এই নিয়ন্ত্রণের বাইরের আগুন প্রায় এক ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকে, যার ফলে স্টিলের বিমগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি, বিমান আছড়ে পড়ার প্রচণ্ড ধাক্কায় টাওয়ারগুলোর সেই মূল স্তম্ভগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যেগুলোর ওপর ভর করে ভবনগুলো সগর্বে দাঁড়িয়ে ছিল।

ফলে এই স্তম্ভ এবং স্টিলের বিমগুলো তাদের ওপরের তলাগুলোর বিশাল ওজন আর সহ্য করতে পারেনি। বিমান আঘাত হানার স্থান থেকে ওপরের তলাগুলো যখন ধসে পড়ে, তখন সেই ধসে পড়া তলাগুলোর কারণে নিচের তলাগুলোর ওপর ওজন ও চাপ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে এবং সেগুলোও পর্যায়ক্রমে ধসে পড়তে থাকে। ঠিক এ কারণেই, যদিও দক্ষিণ টাওয়ারে বিমান আঘাত করেছিল পরে এবং উত্তর টাওয়ারে আগে, তবুও দক্ষিণ টাওয়ারটি উত্তর টাওয়ারের আগেই ধসে পড়ে। কারণ, দক্ষিণ টাওয়ারে বিমানটি ৭৭তম থেকে ৮৫তম তলার মাঝখানে আঘাত করেছিল, অন্যদিকে উত্তর টাওয়ারে বিমানটি আঘাত করেছিল ৯৩তম থেকে ৯৯তম তলার মাঝখানে। যেহেতু দক্ষিণ টাওয়ারের ক্ষতিগ্রস্ত স্তম্ভগুলোর ওপর ওপরের তলাগুলোর ওজন অনেক বেশি ছিল, তাই সেগুলো অত্যন্ত দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং পুরো ভবনটি আগে ধসে যায়।

২. ইচ্ছাকৃতভাবে ৭ নম্বর ভবনটি (Building 7) গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে

টুইন টাওয়ারের চেয়েও যে ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি শোরগোল তোলা হয়, তা হলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ৭ নম্বর ভবনের ধ্বংসের বিষয়টি। এই ভবনটি টুইন টাওয়ারের উত্তরে অবস্থিত ছিল এবং এতে অন্য অনেক সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর কার্যালয়ও ছিল। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে এই ভবনটি হঠাৎ করেই সম্পূর্ণভাবে মাটিতে ধসে পড়ে। এর ধ্বংসের বিষয়ে অত্যন্ত জোরেশোরে দাবি করা হয় যে, এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, এই ভবনে তো কোনো বিমান আঘাত করেনি, তাহলে এটি এভাবে হঠাৎ করে পুরোটা ধসে পড়ল কীভাবে?

প্রথমত, টুইন টাওয়ারের মতোই এই ভবনটিকেও ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে ধ্বংস করার যুক্তিটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, এর জন্যও ভবনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিস্ফোরক লাগানো জরুরি ছিল। অথচ এই ভবনেও এমন কিছু করতে কেউ দেখেনি বা পরবর্তী সময়ে এর সপক্ষে এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটানো হলে বিস্ফোরণের শব্দ অত্যন্ত স্পষ্ট হয় এবং বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়। কিন্তু এই বিশাল ভবনটি একেবারে নিঃশব্দে মাটিতে ধসে পড়ে এবং কোনো বিস্ফোরণের শব্দই শোনা যায়নি।

আসল ঘটনা হলো, উত্তর টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার পর তার বিশাল ধ্বংসস্তূপের একটি বড় অংশ ৭ নম্বর ভবনের ওপর এসে পড়ে। এর ফলে ভবনের দক্ষিণ অংশের প্রথম থেকে দশম তলা পর্যন্ত প্রায় পঁচিশ শতাংশ জায়গা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে ভবনের মূল কাঠামো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একই সাথে পুরো ভবনে আগুন ধরে যায়। টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার কারণে আগুন নেভানোর জন্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ফলে এই ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকে।

আগুন প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকে। ধ্বংসস্তূপ পড়ার কারণে ভবনের যে কাঠামো আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তা এর ফলে আরও বেশি দুর্বল হতে থাকে। ভবনটিকে ধরে রাখার মূল স্তম্ভগুলো ছিল ৭ম এবং ১৩তম তলার মাঝখানে, আর ঠিক এই তলাগুলোতেই সবচেয়ে ভয়াবহ আগুন জ্বলছিল। এই স্তম্ভগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে এগুলো পুরো ভবনের ওজন আর ধরে রাখতে পারেনি এবং ভবনটি পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণভাবে মাটিতে ধসে পড়ে।

৩. পেন্টাগনে কোনো যাত্রীবাহী বিমান আঘাত করেনি

আরেকটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব যা অত্যন্ত জোরেশোরে প্রচার করা হয় তা হলো, পেন্টাগনে কোনো যাত্রীবাহী বিমান আঘাত করেনি; বরং এটিকে কোনো মিসাইল বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে নিশানা বানানো হয়েছিল। এর সপক্ষে অনেক যুক্তি পেশ করা হয়, যার প্রতিটির পর্যালোচনা আমরা এখানে করছি।

একটি দাবি করা হয় যে, পেন্টাগনের ভবনে আঘাতের ফলে যে গর্তটি তৈরি হয়েছিল, তা একটি বোয়িং ৭৫৭ বিমানের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। তাই হয় এটিকে কোনো মিসাইল দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, নয়তো কোনো ছোট বিমান দিয়ে। কিন্তু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকারীরা এ ক্ষেত্রে চরম অতিরঞ্জনের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। অনেকের দাবি তো এমনও ছিল যে, গর্তটি মাত্র ১৬ ফুট চওড়া ছিল! অথচ বাস্তবে গর্তটি ছিল প্রায় ৯৬ ফুট চওড়া, যা একটি বোয়িং ৭৫৭ বিমানের চওড়ার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এই বিমানের লেজ এবং ডানাগুলো তুলনামূলক হালকা উপাদানে তৈরি হয়, তাই আঘাত লাগার সাথে সাথেই সেগুলো ভেঙে আলাদা হয়ে যায়। এর বেশিরভাগ অংশই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, আর কিছু অংশ পেন্টাগন ভবনের বাইরের মাঠে গিয়ে পড়েছিল, যার ছবি পরবর্তী সময়ে মিডিয়াতেও প্রচারিত হয়েছে।

এমন দাবিও করা হয় যে, পেন্টাগন থেকে বিমানের কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি। অথচ ফায়ার ফাইটার এবং প্রাথমিক চিকিৎসায় নিয়োজিত অনেক কর্মী সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তারা ভবনের ভেতরে বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখেছেন। এর মধ্যে ইঞ্জিনের টুকরো, ল্যান্ডিং গিয়ার এবং অন্যান্য অংশও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এসব জিনিসের ছবিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এর পাশাপাশি দাবি করা হয় যে, কোনো বড় বিমান পেন্টাগনে আঘাত করার কোনো প্রমাণ নেই। যে সিকিউরিটি ক্যামেরার ফুটেজ সামনে এসেছে, তা দেখেও মনে হয় না যে, আঘাতকারী বস্তুটি কোনো বড় বিমান ছিল। এই কথাটি এদিক থেকে কিছুটা সত্য যে, সেই আমলের সিকিউরিটি ক্যামেরাগুলোর মান এত উন্নত ছিল না যে, ঘণ্টায় ৫০০ মাইল বেগে ছুটে চলা কোনো বস্তুকে তা স্পষ্টভাবে ধারণ করতে পারবে। তাই যে সিকিউরিটি ফুটেজটি সামনে এসেছিল, তা কিছুটা ঘোলাটে ছিল। কিন্তু তারপরও সেই ফুটেজ থেকে এতটুকু স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, পেন্টাগনে যে বস্তুটি আঘাত করেছিল, তা কোনো মিসাইল বা ছোট বিমানের মতো ক্ষুদ্র কিছু ছিল না, বরং তা বোয়িং ৭৫৭-এর আকারের মতোই বিশাল কোনো বস্তু ছিল। আর এর মাধ্যমেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকারীদের দাবির অসারতা প্রমাণিত হয়ে যায়।

এছাড়াও, অসংখ্য মানুষ বোয়িং ৭৫৭ বিমানটিকে পেন্টাগনে আঘাত করতে দেখার সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তা কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

আরেকটি ভুল ধারণা যা ছড়ানো হয়েছে তা হলো, পেন্টাগন এতটাই সুরক্ষিত জায়গা ছিল যে, সেখানে অনুমতি ছাড়া কোনো পাখিও উড়তে পারে না। সেখানে স্বয়ংক্রিয় মিসাইল সিস্টেম বসানো ছিল, যা যেকোনো আক্রমণকারী মিসাইল বা বিমানকে আঘাত করার অনেক আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশানা বানিয়ে ধ্বংস করে দিত। অথচ এটি একটি ডাহা মিথ্যা দাবি। প্রথম কথা হলো, পেন্টাগন হলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি দপ্তর; এটি কোনো মিলিটারি বেস বা সামরিক ঘাঁটি নয়। আমেরিকানরা কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি যে, এর ওপরও হামলা হতে পারে, তাই সেখানে এমন কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই বসানো ছিল না। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে, সেখানে এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল, তবুও তাদের সেই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কোনো যাত্রীবাহী বিমানকে নিশানা বানানোর জন্য তৈরি করা হয়নি। যতক্ষণ বিমানটি আকাশে দূরে ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত কারও পক্ষেই এটা অনুমান করা সম্ভব ছিল না যে, এটি পেন্টাগনে আঘাত করতে আসছে। আর আঘাত করার ঠিক আগমুহূর্তে বিমানটি মাটির খুব কাছাকাছি উড়তে শুরু করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যই তাকে চিহ্নিত করা বা নিশানা বানানো সম্পূর্ণ অসম্ভব একটি ব্যাপার ছিল।

আরেকটি দাবি করা হয় যে, মাটির এত কাছ ঘেঁষে বিমানটিকে পেন্টাগনে আঘাত করানো কোনো অনভিজ্ঞ পাইলটের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল। কিন্তু এই কথাটিও সত্য নয়। এই কাজটি কোনো অনভিজ্ঞ পাইলটের জন্য তখনই অসম্ভব হতো, যখন তার উদ্দেশ্য হতো জরুরি অবস্থায় বিমানটিকে নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করানো। কিন্তু যখন উদ্দেশ্যই হয় বিমানটিকে আছড়ে ফেলা বা ক্র্যাশ করানো, তখন যে ব্যক্তি ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংয়ের সামান্য কিছু প্রাথমিক প্রশিক্ষণও নিয়েছে, তার জন্য এমনটি করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। আর এই বিমানটি পরিচালনাকারী ইসতিশহাদী মুজাহিদ হানি হানজুর তাকাব্বালাল্লাহ (আল্লাহ তাঁর শাহাদাত কবুল করুন) ঠিক এই প্রশিক্ষণটিই গ্রহণ করেছিলেন।

৪. এই হামলাগুলো ছিল একটি ইহুদী ষড়যন্ত্র

যে ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি নিয়ে আজও সবচেয়ে বেশি মাতামাতি করা হয় এবং গাজার ওপর সাম্প্রতিক ইসরাঈলি আগ্রাসনের পর থেকে যাকে আরও বেশি উসকে দেওয়া হচ্ছে তা হলো, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলাগুলো ইহুদীদের গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’ করিয়েছে। এর সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে দুটি বিষয় তুলে ধরা হয়। এক. ইহুদীরা আগে থেকেই এই হামলার কথা জানত এবং সেদিন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে কর্মরত ইহুদীরা ছুটিতে ছিল। দুই. পাঁচজন ইসরাঈলিকে এই হামলাগুলোর ভিডিও রেকর্ডিং করতে এবং নাচানাচি ও উল্লাস করতে দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে যে এটি ইসরাঈলেরই কাজ।

এর মধ্যে প্রথম দাবিটি তো সম্পূর্ণ ডাহা মিথ্যা, যা খুব বেশিদিন টিকতেও পারেনি। তাই আজকাল এই হামলাগুলোকে ইহুদী ষড়যন্ত্র আখ্যাদানকারীরা এই দাবিটি খুব একটা উল্লেখ করেন না। কারণ, এর অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যে, টুইন টাওয়ারে মোট ৪০০ জন ইহুদী নিহত হয়েছিল।

আর যেখানে পাঁচজন ‘নাচতে থাকা ইহুদী’ বা ‘ড্যান্সিং জিউস’-এর কথা বলা হচ্ছে, এই কথার মধ্যে কিছুটা সত্যতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। ১১ই সেপ্টেম্বরের দিন হামলা চলাকালীন একজন গৃহবধূ নিউইয়র্ক পুলিশকে ফোন করে অভিযোগ করেন যে, তার বাড়ির বাইরে পাঁচজন লোক দাঁড়িয়ে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ভিডিও বানাচ্ছে এবং সাথে নাচানাচি ও উল্লাস করছে। পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ওই পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। পরবর্তী সময়ে মিডিয়া কর্মীরা ওই গৃহবধূকে জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি আসলে কী দেখেছিলেন, তারা কি সত্যিই নাচানাচি করছিল? তখন ওই নারী তা অস্বীকার করেন। তিনি জানান যে, ওই ঘটনায় তারা সবাই যেমন বিষণ্ণ বা শোকাহত ছিলেন, এদের দেখে তার তেমনটা মনে হয়নি। বরং তার মনে হচ্ছিল এরা খুশি, আর তাই সন্দেহের বশবর্তী হয়েই তিনি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তদন্তে জানা যায় যে, ওই পাঁচজন ব্যক্তি ইসরাঈলি নাগরিক ছিলেন, যারা সেখানে একটি বাড়ি স্থানান্তরের কোম্পানিতে কাজ করতেন। অন্য আরও অনেক সাধারণ মানুষের মতোই তারাও এই ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন। তদন্তের পর তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

এভাবে, কেবল একজন গৃহবধূর অতিরঞ্জিত অভিযোগের ভিত্তিতে পাঁচজন ইসরাঈলি নাগরিকের গ্রেফতার হওয়াকে পুঁজি করে, অন্য কোনো প্রমাণ ছাড়াই এত বড় এক কল্পকাহিনি ফেঁদে বসা হলো যে, এই হামলাগুলো ইসরাঈল করিয়েছে! অথচ ইসরাঈল তো আমেরিকারই পালিত সন্তান। আমেরিকা হলো ইসরাঈলের অস্তিত্ব টিকে থাকার একমাত্র গ্যারান্টি; সেই ইসরাঈল কীভাবে আমেরিকাকে ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে? যদি এই হামলাগুলো ইসরাঈল করেই থাকে, তবে এর অনিবার্য অর্থ দাঁড়ায় যে, মার্কিন সরকারও এর সাথে জড়িত। কিন্তু এই হামলায় খোদ মার্কিন সরকারের জড়িত থাকার মানে হলো, এই পরিকল্পনাটি কেবল উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি বাস্তবায়নের জন্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির কাছে নির্দেশাবলি পৌঁছাতে হয়েছে। অথচ পঁচিশটি বছর পেরিয়ে গেল, সরকারি মহল থেকে এমন একজন ব্যক্তিও সামনে আসতে পারল না, যে এই বিশাল ষড়যন্ত্রটি ফাঁস করে দিতে পারে! জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ উইকিলিকসের মাধ্যমে মার্কিন সরকারের অসংখ্য গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন, কিন্তু সেখানেও ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার কোনো উল্লেখ নেই। যেখানে অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো বিষয়গুলোও কয়েক বছর পর ফাঁস হয়ে যায়, সেখানে এত বড় একটি ঘটনা, যাতে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়িত থাকার কথা, যে বিষয়ে শুরু থেকেই মানুষ সন্দেহ পোষণ করে আসছে, যে বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন বছরের পর বছর ধরে তদন্ত করেছে; সেই ঘটনা সম্পর্কে একটি প্রমাণও সামনে আসতে পারল না, এটা কি কোনোভাবেই সম্ভব?

হামলায় আমেরিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কিত দাবি ও তার খণ্ডন

যারা দাবি করেন যে, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা আমেরিকা নিজেই করিয়েছে, তারা এর পেছনে আমেরিকার তিনটি উদ্দেশ্যের কথা বলে থাকেন:

১. আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলার অজুহাত খুঁজছিল

যারা এই যুক্তি পেশ করেন, তাদের কাছে প্রথমেই একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। আপনারা নিরপেক্ষভাবে একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন তো, আমেরিকার কি সত্যিই হামলা করার জন্য কোনো অজুহাতের প্রয়োজন ছিল? আর অজুহাতটিও এমন হতে হবে, যার জন্য তারা এতটা চরম পর্যায়ে চলে যাবে যে, খোদ নিজেদেরই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়ে যাবে! অতীতে কি এমন কোনো ঘটনার কাছাকাছি বা এর চার ভাগের এক ভাগও কোনো নজির পাওয়া যায়, যেখানে আমেরিকা কারও ওপর হামলার অজুহাত খুঁজতে গিয়ে নিজেদের এত বড় ক্ষতি করেছে? যে দেশটি সে সময় বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি ছিল এবং যারা স্নায়ুযুদ্ধে রাশিয়াকে হারিয়ে পুরো বিশ্বের মুকুটহীন সম্রাটের আসনে বসেছিল, তাদের কি আফগানিস্তানের মতো গত কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি দেশে হামলা করার জন্য কোনো অজুহাতের আদৌ প্রয়োজন ছিল? যারা এমন ধারণা পোষণ করেন, তারা মূলত আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। চলুন, এ বিষয়ে আমরা আমেরিকার সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসের ওপর একটু চোখ বুলিয়ে নিই।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই বৈশ্বিক গুন্ডারা খুব ভালোভাবে বুঝে গিয়েছিল যে, এভাবে সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করাটা তাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাছাড়া ইতোমধ্যে যেহেতু উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে গেছে এবং প্রায় পুরো বিশ্বই তাদের পছন্দমতো ব্যবস্থার অধীনে জাতিরাষ্ট্রে (National states) বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাই এখন আর নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গায়ে পড়ে যুদ্ধ করে নিজেদের ক্ষতি করার কোনো প্রয়োজন তাদের নেই। মূলত এই উদ্দেশ্যেই তারা জাতিসংঘ নামের প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছে।

তবে একটি সমস্যা তখনো বাকি থেকে যায়। বিশ্বের ওপর প্রভুত্বের দাবিদার কেবল আমেরিকাই ছিল না, বরং রাশিয়াও এর সমান্তরাল দাবিদার ছিল। কোনো এলাকায় যেমন দুটি কুকুর একে অপরকে সহ্য করতে পারে না, কিংবা কোনো একটি গুন্ডাবাহিনী যেমন অন্য কারও গুন্ডামি মেনে নেয় না; ঠিক তেমনি এই বৈশ্বিক গুন্ডারাও বিশ্বের ওপর তাদের একচ্ছত্র প্রভুত্বের দাবিতে অন্য কাউকেই অংশীদার হিসেবে মেনে নিতে পারছিল না। কিন্তু এখানে বাধা ছিল কেবল একটি। আর তা হলো, উভয় বৈশ্বিক গুন্ডাই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী ছিল। পারমাণবিক হামলার ধ্বংসযজ্ঞের সামান্য ঝলক জাপানে দেখার পর তখন খুব বেশি সময়ও পার হয়নি। ফলে উভয় পক্ষের চূড়ান্ত ধ্বংস নিশ্চিত করার মিলিটারি ডকট্রিন কিংবা সামরিক নীতি ‘Mutual Assured Destruction’ (MAD)-এর জন্ম হয়।[1]

এই ‘ম্যাড’ ডকট্রিনই পরবর্তী সময়ে ‘ডিটারেন্স থিওরি’ (Deterrence theory) বা ভীতি প্রদর্শনের তত্ত্বের জন্ম দেয়। ডিটারেন্স থিওরি হলো, নিজের সামরিক শক্তির মহড়া দেখিয়ে এবং তাতে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি ঘটিয়ে প্রতিপক্ষকে এতটা ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখা, যাতে সে আপনার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সামান্য সাহসটুকুও না করতে পারে। এই ডিটারেন্স থিওরি ব্যবহার করেই আমেরিকা সবসময় পুরো বিশ্বে তাদের গুন্ডামি চালিয়েছে এবং নিজেদের মনগড়া কাজ হাসিল করেছে।[2] কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ার মাঝখানেই ভিয়েতনাম যুদ্ধও এসে হাজির হয়।

সাধারণত যেমনটা মনে করা হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধেও আমেরিকা আসলে সরাসরি ‘ফুল-স্কেল’ অর্থাৎ সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। শুরুতে আমেরিকার লক্ষ্য কেবল দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে সামরিক সহায়তা এবং পরামর্শ দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি তাদের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে হাতের বাইরে চলে যেতে থাকে। আমেরিকার মনে প্রবল ভয় ছিল যে, ভিয়েতনাম যদি কোনোভাবে কমিউনিস্ট ব্লকে চলে যায়, তবে আশেপাশের সব প্রতিবেশী দেশও একে একে কমিউনিস্ট ব্লকে যোগ দিতে শুরু করবে। আর এই বিষয়টি আমেরিকার জন্য একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ছিল। এরপর মার্কিন নীতিনির্ধারকরা উত্তর ভিয়েতনাম এবং ভিয়েত কং (Viet Cong) বাহিনীর যোগ্যতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে পুরোপুরি ভুল হিসাব কষে বসে। নিজেদের শক্তির নেশায় মত্ত আমেরিকা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিশ বছর ধরে ২ লাখ মার্কিন সেনাকে এই যুদ্ধে খাটিয়ে এবং তাদের মধ্যে ৫৮ হাজার সেনাকে মরতে বাধ্য করার পর, আমেরিকাকে শেষ পর্যন্ত লেজ গুটিয়েই পালাতে হয়েছিল।

ভিয়েতনামের এই গ্লানিকর পরাজয় আমেরিকার ভেতরে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো থেকে বেঁচে থাকার চিন্তাধারাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে। আর এ বিষয়ে তারা রীতিমতো নীতিমালাও তৈরি করে। ১৯৭৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে মার্কিন বাহিনীকে কেবল নিজের একক সিদ্ধান্তে কোনো যুদ্ধে জড়ানোর ‘নির্বাহী ক্ষমতা’ (Executive powers) কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে এই ধরনের যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য কংগ্রেসের অনুমতি নিতে বাধ্য করা হয়।[3]

ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকেই মূলত মার্কিন জনগণ, প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাত এবং সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়।[4] ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগকেই বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হতে থাকে। আর যদি সামরিক সংঘাত অনিবার্যই হয়ে পড়ে, তবে বিমান ও নৌ শক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়। এই বিষয়গুলো উপসাগরীয় যুদ্ধে (Gulf War) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখাও গেছে।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের বরকতময় হামলা আমেরিকাকে এক চরম কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমেরিকা যদি সত্যিই সরাসরি সংঘাতের জন্য কোনো অজুহাত খুঁজত, তবে ১৯৯৮ সালে কেনিয়ার নাইরোবি এবং তানজানিয়ার দারুস সালামে মার্কিন দূতাবাসে হওয়া হামলা, এবং ২০০০ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল (USS Cole)-এর ওপর হওয়া হামলাই তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ওপরে বর্ণিত পুরো ইতিহাস থেকে এ বিষয়টি একদম স্পষ্ট যে, সরাসরি যুদ্ধে নামা আমেরিকার মূল নীতি ছিল না। বরং তারা উপর্যুক্ত নীতিগুলো অনুসরণ করেই নিজেদের দাবি আদায়ের চেষ্টায় মগ্ন ছিল, আর ঠিক তখনই ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলাগুলো ঘটে যায়। এরপর এটি সম্পূর্ণ আমেরিকার মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সে মুহূর্তে তারা যদি সরাসরি সংঘাতে না নামত, তবে পুরো বিশ্বেই তাদের সম্মান ধুলোয় মিশে যেত।

কিন্তু এরপরও আমেরিকার আচরণ ঠিক এমন ছিল না, যেমনটা যুদ্ধকামী কোনো দেশের হওয়া উচিত। আমেরিকার কাছে এত বিপুল সৈন্য এবং এত অস্ত্র মজুত ছিল যে, তারা অন্য কারও সাহায্য ছাড়াই একাই আফগানিস্তান দখল করে ইমারতে ইসলামিয়ার পতন ঘটাতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তারা তা করেনি। আমেরিকা যুদ্ধের পুরো বোঝা নিজে বহন করার পরিবর্তে সারা বিশ্বের দেশগুলোকে এর মধ্যে টেনে আনে এবং যুদ্ধের সার্বিক বোঝা সবার ওপর ভাগ করে দেয়। তবুও আমেরিকার মনে এই অহংকার ছিল যে, এটি হবে কেবল একটি সীমিত পরিসরের যুদ্ধ। তাদের পরিকল্পনা ছিল, ইমারতে ইসলামিয়ার পতন ঘটানোর পর ক্ষমতা নর্দান অ্যালায়েন্সের (Northern Alliance) হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং তাদের নিয়ে একটি সেনাবাহিনী গঠন করা হবে। সেই সেনাবাহিনীকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে যাবে। আর আল-কায়েদার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কার্যক্রম চালানোর জন্য সীমিত কিছু বিশেষ বাহিনী এবং কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি তারা পেছনে রেখে যাবে। কিন্তু আমেরিকার এই স্বপ্নও বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি। যাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল, তারা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণিত হয়। আর যে সেনাবাহিনী তৈরি করা হয়েছিল, তারাও চরম অযোগ্য প্রমাণিত হয়। আমেরিকা আফগানিস্তানে নিজেদের পছন্দমতো সরকার ও সেনাবাহিনী গঠনের এই চেষ্টায় বিশটি বছর পার করে দেয় এবং শেষমেশ সেখান থেকেও তাদের চরম লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হয়েই বের হতে হয়।

এই পুরো ইতিহাস থেকে এ বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমেরিকা তো ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পরও সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে রীতিমতো ইতস্তত করছিল। সেখানে যুদ্ধে জড়ানোর জন্য তারা নিজে থেকে অজুহাত খুঁজবে, এটা তো অনেক দূরের কথা! তবে যেখানে এই আপত্তির কথা আসে যে, ‘আমেরিকা যুদ্ধে জড়ানোর কারণে আফগান জনগণের ওপর যে কঠিন পরীক্ষা ও বিপদ নেমে এসেছিল, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা না হলে তা আসত না’, ইনশাআল্লাহ, এর উত্তর সংশ্লিষ্ট শিরোনামের অধীনে সামনে বিস্তারিত আসবে।

২. আমেরিকা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দখল নেওয়ার জন্য যুদ্ধ চেয়েছিল

আমেরিকা যুদ্ধ চাচ্ছিল এবং এর জন্যই তারা ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা ঘটিয়েছে, এমন দাবিটি যদিও এতক্ষণের আলোচনায় পুরোপুরি খণ্ডিত হয়ে গেছে; তবুও এর একটি উপ-দাবি নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব। আর তা হলো, যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দখল কায়েম করা।

এখানেও প্রথমেই যে প্রশ্নটি জাগে তা হলো, আমেরিকা আফগানিস্তান যুদ্ধে প্রতিদিন ৩০ কোটি (৩০০ মিলিয়ন) ডলার খরচ করছিল। সেখানে এমন কী প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যা পাওয়ার জন্য প্রতিদিন ৩০ কোটি ডলার খরচ করার পরও তা তাদের জন্য লাভজনক থাকবে? দ্বিতীয় কথা হলো, এই দীর্ঘ বিশ বছরে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে কী এমন প্রাকৃতিক সম্পদ হাসিল করেছে? এই বিশ বছরে এমন কোনো প্রমাণই পাওয়া যায় না যে, আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে বিশেষ কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করেছে এবং বিপুল পরিমাণে তা নিজেদের দেশে নিয়ে গেছে। এমন কোনো নজির নেই যা দেখে বলা যেতে পারে যে, এটাই তাদের যুদ্ধের মূল কারণ ছিল।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আফগানিস্তান তো অনেক দূরের কথা, পুরো বিশ্ব থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য আমেরিকার কবেই-বা যুদ্ধের প্রয়োজন পড়েছে? যদি যুদ্ধই এর একমাত্র সমাধান হতো, তবে তারা এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে (Multinational companies) কী উদ্দেশ্যেই বা পুষে রেখেছে?

বর্তমানে পুরো বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের ৭৪ শতাংশই আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, সারা বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কেবল আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নই গিলে খাচ্ছে। আর এর প্রায় পুরোটাই তারা কোনো রকম যুদ্ধ ছাড়াই হাসিল করেছে। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব মূলত এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে অসংখ্য আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি দাপটের সাথে কাজ করছে, যারা বিভিন্ন চুক্তি এবং ছলচাতুরীর মাধ্যমে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ হাতিয়ে নিয়ে তা আমেরিকায় পাচার করছে। উদাহরণস্বরূপ:

  • এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো আরামকো (ARAMCO)। আমেরিকান কোম্পানি ‘স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অফ ক্যালিফোর্নিয়া’ [বর্তমান শেভরন (Chevron)] সৌদি আরব থেকে তেল উত্তোলনের জন্য এই কোম্পানিটি তৈরি করেছিল। এই কোম্পানিটি কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব থেকে তেল উত্তোলনের কেবল পারিশ্রমিক হিসেবেই মোট তেলের ষাট শতাংশ নিয়ে যেত। বাকি ৪০ শতাংশ তেলের ক্ষেত্রেও মার্কিন সরকার সৌদি সরকারের সাথে এমন এক অসম চুক্তি করে রেখেছিল, যার অধীনে আমেরিকা এই তেল একেবারে পানির দরে কিনত। ১৯৮৮ সালে সৌদি সরকার এই কোম্পানিটিকে নিজেদের মালিকানায় নিয়ে নেয় এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সৌদি আরামকো’।[5]
  • ইন্দোনেশিয়ার গ্রাসবার্গ মাইন (Grasberg mine) হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা ও তামার খনি। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই খনি থেকে ছয় লাখ আশি হাজার টন তামা এবং ৫৩ টন সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই খনির সমস্ত স্বত্ব আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ‘Freeport-McMoRan’-এর কাছেই ছিল। ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকার এই কোম্পানির সাথে একটি নতুন চুক্তি করে। যার ফলে এখন তাদের কাছে এই খনির ৪৯ শতাংশ স্বত্ব রয়েছে। এই খনি থেকে তামা ও সোনা উত্তোলনের কাজ শুরু হয় ১৯৭২ সালে। তখন থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর ধরে এই কোম্পানিটি নিরঙ্কুশ আধিপত্যের সাথে সমস্ত তামা ও সোনা হাতিয়ে আমেরিকায় পাঠিয়েছে। আর এ বিষয়ে তাদের জিজ্ঞেস করার মতো কেউ ছিল না। এখন নতুন চুক্তির অধীনেও তারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত এই খনির প্রায় অর্ধেক সোনা ও তামার মালিক হয়ে বসে আছে।
  • কাজাখস্তানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত টেঙ্গিজ অয়েল ফিল্ড (Tengiz oil field) বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং গভীরতম তেলক্ষেত্র। এই তেলক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুত অনুমান করা হয় ৬ থেকে ৯ বিলিয়ন ব্যারেল। ১৯৯৩ সালে এই ক্ষেত্র থেকে তেল উত্তোলন শুরু হয় এবং দুটি আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি শেভরন (Chevron) এবং এক্সনমোবিল (ExxonMobil) এর সূচনা করে। এই তেলক্ষেত্রে শেভরনের শেয়ার ৫০ শতাংশ এবং এক্সনমোবিলের শেয়ার ২৫ শতাংশ। এভাবেই এই দুটি কোম্পানি এই তেলক্ষেত্রের ৭৫ শতাংশ উৎপাদন অনায়াসে আমেরিকায় নিয়ে যায়।

এই তিনটি উদাহরণ থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমেরিকা আজও কীভাবে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই মুসলিম ভূখণ্ডগুলো থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে। তাই এই কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন যে, আমেরিকা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দখল নেওয়ার জন্যই যুদ্ধ শুরু করতে চেয়েছিল।

৩. অস্ত্র নির্মাণকারী কারখানাগুলো যুদ্ধ চাচ্ছিল

এমন দাবিও করা হয় যে, অস্ত্র নির্মাণকারী কারখানাগুলো ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ (Military-Industrial Complex)[6] -এর সাহায্যে সরকারকে যুদ্ধ করতে প্ররোচিত করেছিল, আর মূলত এ কারণেই ১১ই সেপ্টেম্বরের নাটক সাজানো হয়।

যদিও আমরা বিশেষভাবে ১১ই সেপ্টেম্বরের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি আগেই খণ্ডন করে এসেছি, তবুও এই অনুমানের ওপর একটু বিশদ আলোচনা করা যাক যে, মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স কি সত্যিই চাইবে আমেরিকা আফগানিস্তানে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক এবং এর অজুহাত তৈরি করার জন্যই তারা ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলাগুলো ঘটাক?

এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, আমেরিকায় প্রতিরক্ষা নীতি এবং যুদ্ধ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের ব্যাপক প্রভাব ও প্রতিপত্তি রয়েছে। মূলত সর্বোচ্চ মুনাফা লোটার উদ্দেশ্যেই এই অশুভ আঁতাতটি গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই জোট এতটা প্রভাবশালীও নয়, তাছাড়া তারা নিজেরাও কখনো চাইবে না যে, নিজেদের তাৎক্ষণিক ও দ্রুত মুনাফার জন্য আমেরিকাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিক। নিজেদের দেশেই ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা ঘটিয়ে অর্থনীতির ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করা এবং তারপর এর কারণে আমেরিকাকে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধে ঠেলে দেওয়াটা এই জোটের জন্যও খুব একটা লাভজনক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যগুলো ‘ডিটারেন্স থিওরি’ অর্থাৎ ভীতি প্রদর্শন তত্ত্বের মাধ্যমেই হাসিল করে নিচ্ছিল।[7]

এই জোটের সবসময় এটাই চেষ্টা থাকে যে, আমেরিকায় যেন একটি স্থায়ী বিপদের অনুভূতি বা জুজু বজায় থাকে। কারণ এর ফলেই প্রতিরক্ষা বাজেট প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে এবং সরকারও বেশি বেশি অস্ত্র কিনতে বাধ্য হয়। এই জোট লবিং, প্রোপাগান্ডা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে এটা নিশ্চিত করে যে, বিপদের এই অনুভূতি যেন কোনোভাবেই কমে না যায়, বরং দিন দিন বাড়তেই থাকে, যাতে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে মুনাফা লুটতে পারে। এর পাশাপাশি, এই জোট মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নাক গলাতে এবং কোনো এক পক্ষকে সামরিক সহায়তা দিতে প্ররোচিত করে। এর নেপথ্য উদ্দেশ্য হলো, সামরিক সহায়তার নামে মার্কিন সরকার যেন তাদের অস্ত্র সরবরাহ করে এবং এই জোট তা থেকে বিপুল মুনাফা কামাতে পারে। তবুও যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে, এই জোটের কেবল নিজেদের মুনাফা নিয়েই মাথাব্যথা এবং আমেরিকার স্বার্থের কোনো পরোয়া তাদের নেই; তাহলেও আমেরিকাকে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার মতো অনেক সুযোগ ও পদ্ধতি তাদের হাতে ছিল। গত কয়েক বছরে এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছিল, যেগুলোকে পুঁজি করে এই জোট অনায়াসেই আমেরিকাকে বড় কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে দিতে পারত। শুধু তাই নয়, ‘স্বাধীনতা’, ‘গণতন্ত্র’, ‘সমতা’, ‘মানবাধিকার’-এর মতো চটকদার স্লোগানগুলোই মার্কিন সরকারকে রাজি করানোর জন্য যথেষ্ট ছিল যে, আফগানিস্তানে ইমারতে ইসলামিয়ার ‘রক্ষণশীল’ ও ‘উগ্রপন্থী’ সরকারের পতন ঘটাতে এবং সেখানকার জনগণকে ‘গণতন্ত্র’, ‘স্বাধীনতা’, ‘সমতা’ এবং ‘মানবাধিকার’ (বিশেষ করে ‘নারী অধিকার’) উপহার দেওয়ার জন্য তারা যেন আফগানিস্তানে হামলা করে বসে। বস্তুত এই জোটও নিজেদের মুনাফার লোভে এতটা অন্ধ হতে পারে না যে, এর জন্য তারা নিজেদের পায়েই কুড়াল মারবে।

১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার বিষয়ে মুসলিম বিশ্বের আপত্তি ও তার খণ্ডন

১. এই হামলাগুলো শরীয়তসম্মত ছিল না

মুসলিম বিশ্বে এই হামলাগুলোর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে আপত্তিটি তোলা হয় তা হলো, এই হামলাগুলো শরীয়তসম্মত ছিল না। তাদের দাবি, এতে নিরপরাধ সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছে, যার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

এ বিষয়ে প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। আর তা হলো, মুসলিম বিশ্বের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আলেম এই হামলাগুলোর বৈধতার পক্ষে ফতোয়া দিয়েছিলেন। ফতোয়া প্রদানকারীদের মাঝে পাকিস্তানেরও অনেক উলামায়ে কেরাম রয়েছেন, যাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নামটি হলো মুফতী নিজামুদ্দিন শামজায়ী রহিমাহুল্লাহ। এছাড়া আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের মধ্যে শায়খ হামুদ বিন আব্দুল্লাহ বিন উকলা আশ-শুয়াইবির নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য, যিনি ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পক্ষে ফতোয়া দেন। তাঁদের পাশাপাশি শায়খ সুলাইমান আল-উলওয়ান, শায়খ নাসির আল-ফাহাদ এবং শায়খ আবু কাতাদা আল-ফিলিস্তিনিও এই হামলাগুলোর সপক্ষে ফতোয়া জারি করেছিলেন।

স্বয়ং শায়খ উসামা রহিমাহুল্লাহ তাঁর একাধিক বয়ানে এই হামলাগুলোর শরঈ অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। ২০০১ সালের অক্টোবরে আল-জাজিরার প্রতিনিধি তাইসির আল্লুনিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই হামলাগুলোর শরঈ বৈধতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।[8]

২. ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার খেসারত আফগানিস্তানকে দিতে হয়েছে

যারা এই আপত্তিটি তোলেন, তাদের কাছে প্রথমেই একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন। যদি ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলাটি না-ও হতো, তবে সে সময়কার বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি এবং ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রবক্তা আমেরিকা কি ইমারতে ইসলামিয়ার মতো একটি খাঁটি ইসলামী ও আধুনিক বিশ্বব্যবস্থাকে অস্বীকারকারী সরকারের অস্তিত্ব সহজে মেনে নিত? যে আমেরিকা আজ চরম শোচনীয় পরাজয় বরণ করে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হওয়ার পরও ইমারতে ইসলামিয়ার অস্তিত্ব সহ্য করতে পারছে না; চরম আক্রোশ ও অসহায়ত্বে যারা নিজেদের আঙুল কামড়াচ্ছে এবং ইমারতকে বদনাম করার জন্য চরম নির্লজ্জতার সাথে কিছুদিন পরপরই নিজেদের চামচাদের দিয়ে ডাহা মিথ্যা রিপোর্টের পর রিপোর্ট প্রকাশ করাচ্ছে; সেই আমেরিকা কি নিজেদের অহংকার ও দাপটের চূড়ান্ত শিখরে থাকা অবস্থায় ইমারতে ইসলামিয়ার অস্তিত্ব আদৌ সহ্য করে নিত?

তারা কখনোই তা করত না! তবে তখন হয়তো ঘটনাটি এমন দাঁড়াত যে, তারা সরাসরি মাটিতে নিজেদের সৈন্য না নামিয়ে অন্যান্য কূটকৌশল ব্যবহার করে ইমারতকে ধ্বংস করার চেষ্টা করত। ইরাকের ওপর অবরোধ আরোপ করে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে দশ লাখ শিশুকে হত্যা করতে যাদের মনে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ জাগেনি, তাদের জন্য আফগানিস্তানে এর সমান বা এর চেয়েও বহুগুণ বড় কোনো জঘন্য অপরাধ সংঘটন করা কি খুব কঠিন কিছু ছিল? তারা নিশ্চিতভাবেই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করত, ইরাকের মতো খাদ্য ও ওষুধের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিত এবং ক্রুজ মিসাইল ও বিমান হামলার মাধ্যমে টার্গেটেড কিলিং চালাত। আর এসব কিছুর মাধ্যমে তারা মূলত ইমারতে ইসলামিয়াকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করারই চেষ্টা করত।

এর বিপরীতে, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলাগুলো কেবল আমেরিকার বুকেই মোক্ষম আঘাত হেনে তাদের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার এবং হাজার হাজার মানুষের ক্ষতি করেনি; বরং এই হামলাগুলোই তাদেরকে তাড়িয়ে এনে সিংহের গুহায় ঢুকিয়েছে। আর এই শিকারে আমেরিকা একা আসেনি, বরং তার সমস্ত চামচা ও গোলামদেরও সাথে করে টেনে এনেছে। এরপর দীর্ঘ বিশ বছরে তাদের সবার যে কী করুণ দশা হয়েছে, তা আজ আর কারও অজানা নেই। ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা যদি না-ও হতো, তবুও খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বিমান হামলার কারণে শাহাদাতের ঘটনা ঘটতই। কিন্তু সেই শাহাদাতগুলো হতো চরম মজলুমিয়াত ও অসহায়ত্বের সাথে, আর তাতে আমেরিকার টিকিটিও ছোঁয়া যেত না। ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা হয়েছে, শাহাদাতও হয়েছে; কিন্তু তা হয়েছে চরম আত্মমর্যাদা ও বীরত্বের সাথে, বুক চিতিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে করতে এবং শত্রুর কল্পনাতীত জানমালের ক্ষতি সাধন করে। তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, এই যে ক্ষতিটা হলো, তা কি কেবল ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার কারণেই হলো, নাকি হামলা না হলেও এই ক্ষতি হতোই?

কথা কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায় না। ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার ফলে যে মহাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তার আগের ইমারত এবং পরের ইমারতের একটু তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখুন।

তখন বিশ্বের সামনে ইমারতে ইসলামিয়ার পরিচয় ছিল ‘মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে গঠিত একটি দল, যারা দেশে ফাসাদ সৃষ্টিকারী স্থানীয় সাবেক জিহাদি সংগঠনগুলোকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করেছে’। কিন্তু আজকের ইমারতে ইসলামিয়া হলো এমন এক অপরাজেয় শক্তি, যারা কেবল আমেরিকার মতো একমাত্র পরাশক্তিকেই নয়, বরং তাদের নেতৃত্বে পুরো বিশ্বের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল বৈশ্বিক জোটকে পরাজিত করে ক্ষমতা লাভ করেছে।

সে যুগে আফগানিস্তান দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের কারণে পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তখন অবকাঠামো বলতে দেশটিতে কিছুই ছিল না; শহরগুলো উজাড় হয়ে বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছিল, আয়ের উৎস ছিল না বললেই চলে এবং বাইতুল মাল ছিল একেবারেই শূন্য। যদি ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা না হতো এবং আমেরিকা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু না করে অর্থনৈতিক অবরোধ ও অন্যান্য কূটকৌশলের আশ্রয় নিত, তবে আফগানিস্তান সেই অবরুদ্ধ পরিস্থিতি আর কতদিন সহ্য করতে পারত? এর বিপরীতে, এই বিশ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আজ আফগানিস্তান কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং ইমারতে ইসলামিয়া কোন অভাবনীয় অবস্থানে পৌঁছেছে, তা আজ সবার চোখের সামনেই জ্বলজ্বল করছে।

এ কথা ধ্রুব সত্য যে, এই দীর্ঘ বিশ বছরে অসংখ্য শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছে এবং অনেক কিছু কুরবানী করতে হয়েছে। তবে মনে রাখবেন, বড় কোনো মর্যাদা, দৃঢ়তা, বিজয় এবং সাফল্য কখনোই কুরবানী ছাড়া অর্জিত হয় না। আর যদি কখনো কুরবানী ছাড়াই তা অর্জিত হয়েও যায়, তবে তার কোনো কদর থাকে না এবং তা বেশিদিন টিকে থাকতেও পারে না। আজ যদি ইমারতে ইসলামিয়া উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যায়, প্রতিদিন যদি নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়, অর্থনীতি যদি শক্তিশালী হয়, মুদ্রার মান স্থিতিশীল থাকে এবং কর্মসংস্থানের অভাবনীয় সুযোগ বাড়ে; তবে মনে রাখতে হবে যে এসবই হলো সেই বিশ বছরের অকাতর কুরবানীর সুমিষ্ট ফল। পঁচিশ বছর আগে কারও এমন আপত্তি তোলাটা হয়তো কিছুটা হলেও বোধগম্য ছিল। কারণ সবার তো আর এমন দূরদৃষ্টি থাকে না যে, কোনো ঘটনার সুদূরপ্রসারী ফলাফল আগে থেকেই নির্ভুলভাবে আঁচ করতে পারবে। কিন্তু আজ, যখন এই হামলাগুলোর বরকত, ফলাফল ও সুফলগুলো দিবালোকের মতো সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে, তখন কারও এমন আপত্তি তোলাটা হবে চরম অবিচার।

উপসংহার

একই আপত্তি তুফানুল আকসার ক্ষেত্রেও

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যেভাবে মুসলিম বিশ্বের একটি শ্রেণি ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা নিয়ে সন্দেহ ও সংশয় ছড়াচ্ছিল, ঠিক তেমনি আজও একটি শ্রেণি ‘তুফানুল আকসা’ তথা ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরে ফিলিস্তিনি মুজাহিদদের ইসরাঈলের ওপর চালানো ঐতিহাসিক অভিযানের ব্যাপারেও সন্দেহ ও সংশয় ছড়াচ্ছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার ওপর যে আপত্তি তোলা হয়েছিল, ঠিক একই আপত্তি এখানেও তোলা হচ্ছে যে, এর চড়া খেসারত গাজার সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে। কিন্তু বড়ই আশ্চর্যের বিষয় হলো, গাজার আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ও সাহসী জনগণের মুখ থেকে একবারের জন্যও তাদের মুজাহিদ সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। তাদের যত অভিযোগ, তা তো পুরো মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে, যারা তাদের আজ একা ফেলে রেখেছে। তাদের অভিযোগ ওইসব মানুষের বিরুদ্ধে, যারা নিজেরা তো কিছুই করছে না, এমনকি কিছু করার যোগ্যতাটুকুও রাখে না; অথচ নিজেদের আরামদায়ক ড্রয়িংরুমে বসে যারা ইসরাঈলের ওপর এক ইতিহাস সৃষ্টিকারী মোক্ষম আঘাত হেনেছে, তাদের ওপরই দোষ চাপাচ্ছে।

১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পর শুরুর দিকের বছরগুলোতে যারা আপত্তি তুলেছিল, তাদের হয়তো কোনো অজুহাত দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তুফানুল আকসার ওপর যারা আপত্তি তুলছে, তারা কোনো অজুহাত পাওয়ারই যোগ্য নয়। কারণ, এই বিষয়টি এতটাই স্পষ্ট যে, চোখের অন্ধও তা সহজেই বুঝতে পারবে। হ্যাঁ, কেউ যদি বিবেকের অন্ধ হয়, তবে তার কথা ভিন্ন। যারা আপত্তি তুলছেন, তারা কি গত ৭৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বোমাবর্ষণ, শাহাদাত, নির্বিচার গ্রেফতার, বাস্তুচ্যুতি এবং একের পর এক জনপদ ধ্বংসের দৃশ্যগুলো দেখতে পান না? আজ গাজায় যা কিছু হচ্ছে, তা কি কেবল তুফানুল আকসার পরই শুরু হয়েছে? তুফানুল আকসার আগে মসজিদে আকসার যে অবিরত অবমাননা করা হচ্ছিল, তা কি কারও অজানা ছিল? মসজিদে আকসা শহীদ করে সেখানে দাজ্জালি উপাসনালয় বা ‘থার্ড টেম্পল’ নির্মাণের ইহুদী পরিকল্পনাগুলো কি গোপন কোনো বিষয় ছিল? ইহুদীরা তো প্রকাশ্যে মসজিদে আকসা শহীদ করার স্লোগান দিচ্ছিল। এখন ফিলিস্তিনি মুজাহিদরা যদি আপসকামী হয়ে যেতেন, নিজেদের বিপুল সংখ্যক মানুষের শাহাদাত এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কথা ভেবে যদি তারা থেমে যেতেন, তুফানুল আকসার মতো কোনো মহাকাব্যিক অভিযান যদি না-ই হতো; আর আল্লাহ না করুন, মসজিদে আকসা যদি শহীদ করেই দেওয়া হতো, তখন কী হতো? তখন এই আপত্তিকারীরাই ফিলিস্তিনি মুজাহিদদের কাপুরুষতার, জিহাদ ছেড়ে বসে থাকার এবং শত্রুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসার খোঁটা দিত।

সম্ভবত আপত্তিকারীদের মূল আপত্তিটা এই জায়গায় যে, তুফানুল আকসার আগে যেসব শাহাদাত ও ঘর-বাড়ি ধ্বংসের ঘটনা ঘটছিল, সেগুলো ছিল তাদের কাছে নিতান্তই ‘নিত্যনৈমিত্তিক’ ব্যাপার। সেগুলো মিডিয়ায় বড় কোনো খবর হতো না; সেগুলো এমন কিছুও ছিল না যা জোর করে উম্মাহর বিবেককে গাফিলতির ঘুম থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু তুফানুল আকসা কেবল উম্মাহর নয়, বরং সমগ্র মানবতার বিবেককে প্রবলভাবে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে। আমাদের নিজেদের হাজারো জাগতিক সমস্যা রয়েছে এবং আমরা সেগুলোর বেড়াজাল থেকে বের হতে পারি না; তার ওপর গাজার পরিস্থিতি দেখে আমাদের নিজেদের বিবেকই প্রতিনিয়ত আমাদের দংশন করে। তাই নিজেদের সান্ত্বনা দিতে এই পুরো দোষটা এখন তুফানুল আকসা রচনাকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের যুক্তি হলো, মুজাহিদরা যদি এমনটা না করত, তবে আমাদের বিবেকের এই দহন আর সহ্য করতে হতো না!

ইয়াওমুত তাফরিক থেকে তুফানুল আকসা পর্যন্ত

১১ই সেপ্টেম্বরের বরকতময় হামলাগুলো ছিল বর্তমান যুগে মহান আল্লাহর নুসরাত (সাহায্য) ও বরকতের সবচেয়ে বড় এবং সুস্পষ্ট নিদর্শন। এই পরিকল্পনার পেছনে অসংখ্য নিয়ামক কাজ করছিল; কিন্তু এতসব কিছুর পরও পুরো পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়াটা আল্লাহর সুস্পষ্ট সাহায্যেরই জ্বলন্ত প্রমাণ। এই হামলার ফলে শত্রুর যে অভাবনীয় ক্ষতি হয়েছে, তাতে আল্লাহর সাহায্যের পাশাপাশি তাঁর অসীম বরকতও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। যেভাবে দুটি টাওয়ার ধসে পড়েছিল, তা হয়তো স্বয়ং এই হামলার পরিকল্পনাকারীরাও কখনো কল্পনা করেননি। এরপর এই টাওয়ারগুলোর বিশাল ধ্বংসস্তূপের কারণে আশেপাশের ভবনগুলোর যে ক্ষতি হয়েছে, তা বর্ণনাতীত। টুইন টাওয়ারের সাথেই থাকা ম্যারিয়ট হোটেল ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং ৭ নম্বর ভবনটিও পুরোপুরি ধসে পড়েছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি ভবন এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে সেগুলো সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং পরে সেগুলোকেও গুঁড়িয়ে দিতে হয়। শত্রুর এই বিশাল ক্ষতিগুলো ছিল মূলত মূল হামলার ওপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অতিরিক্ত বরকত।

এই হামলাগুলোর সময় যা কিছু ঘটেছিল তা তো একটি ভিন্ন দিক; কিন্তু এই হামলাগুলোর ফলে পরবর্তী সময়ে যে বিপুল বরকত ও সুফলগুলো অর্জিত হয়েছে এবং আজও হচ্ছে, তা গুণে শেষ করা একেবারেই অসম্ভব। যে জিহাদি আন্দোলন একসময় কেবল আফগানিস্তানের মরুভূমি ও পাহাড়-পর্বতের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ সারা বিশ্বে তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকাকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে ব্যস্ত রাখার একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। এর নেপথ্য উদ্দেশ্য ছিল, যেন মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেসব অঞ্চলে জিহাদি আন্দোলনগুলো সফলতার দিকে নির্বিঘ্নে এগিয়ে যেতে পারে। মূলত সেই কৌশলের সাফল্যের লক্ষণগুলো হামলার মাত্র দশ বছর পরই স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। বিশ বছর পর ইমারতে ইসলামিয়া বিজয়ী ও মর্যাদাবান হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। অন্যদিকে আমেরিকা তার সমস্ত চামচাদের নিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে এবং এখন নিজেদের গর্তে ঢুকে ক্ষত চাটতে বাধ্য হচ্ছে।

শায়খ উসামা রহিমাহুল্লাহর সেই ঐতিহাসিক শপথের প্রতিধ্বনি আজও আমাদের কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকা এবং তার অধিবাসীরা ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তির স্বপ্নও দেখতে পারবে না, যতক্ষণ না আমরা ফিলিস্তিনে প্রকৃত শান্তি দেখতে পাই এবং যতক্ষণ না কাফেররা হারামাইনের পবিত্র ভূমি থেকে চিরতরে বেরিয়ে যায়। গত পঁচিশ বছর ধরে আমরা নিজেদের খোলা চোখে এই শপথকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হতে দেখছি। আর ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরাঈলের ওপর চালানো ১১ই সেপ্টেম্বরের মতোই ইতিহাস সৃষ্টিকারী হামলা ‘তুফানুল আকসা’ পুরো বিষয়টিকে আরও বেশি স্পষ্ট করে দিয়েছে।

‘ইয়াওমুত তাফরিক’ বা পার্থক্যকারী দিন তথা ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে তুফানুল আকসা পর্যন্ত পুরো সময়কালটি হলো মর্যাদা, কুরবানী, বীরত্ব, অবিচলতা এবং সাহসিকতার এক সুদীর্ঘ ও ধারাবাহিক উপাখ্যান। যারা এই অকাতর কুরবানী দিয়েছেন, তারা নিজেদের পবিত্র রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, ‘আল-জিহাদুল মুসাল্লাহ হুওয়াল হাল’ অর্থাৎ, সশস্ত্র জিহাদই হলো একমাত্র প্রকৃত সমাধান। অহিংসা এবং তথাকথিত শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির প্রবক্তারা গত পৌনে এক শতাব্দী ধরে কেবল শূন্যেই হাত-পা ছুঁড়ছেন। নতুন কিছু অর্জন করা তো অনেক দূরের কথা, তারা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেখান থেকেও যোজন যোজন পিছিয়ে গেছেন। কিন্তু সশস্ত্র জিহাদকারীরা নিজেদের দৃঢ় সংকল্প, অবিচলতা এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর সাহায্য ও নুসরাতে মাত্র দুই দশকে এমন কিছু করে দেখিয়েছেন, যা দেখে আজ বন্ধু ও শত্রু সবাই হতবাক হয়ে গেছে।

তবে আজ পুরো উম্মাহর জন্য এক বড় পরীক্ষার সময়! আমরা এখনো আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি। কারণ বৈশ্বিক গুন্ডাদের শরীরে এখনো কিছুটা প্রাণ অবশিষ্ট রয়েছে। চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আমাদের এখনো আরও অনেক ‘ইয়াওমুত তাফরিক’ এবং আরও অনেক ‘তুফানুল আকসা’ সংঘটিত করার তীব্র প্রয়োজন রয়েছে। তবেই কেবল সমগ্র বিশ্বে ‘খিলাফাহ আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ’ বা নবুওয়তের আদলে খিলাফতের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করবে।

ابھی گرانیٔ شب میں کمی نہیں آئی

نجاتِ دیدہ و دل کی گھڑی نہیں آئی

چلے چلو کہ وہ منزل ابھی نہیں آئی

“রাতের আঁধারের ভার এখনো তো কমেনি,

চোখ ও হৃদয়ের মুক্তির সেই ক্ষণ এখনো তো আসেনি;

চলতে থাকো অবিরাম, কারণ সেই কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিল এখনো তো আসেনি!”

[1] এই ডকট্রিনের অধীনে উভয় পক্ষের কাছে এত বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত থাকে, যা অপর পক্ষকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যদি এক পক্ষ কোনো কারণে অপর পক্ষের ওপর পারমাণবিক হামলা চালায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে একই মাত্রার বা তার চেয়েও ভয়াবহ হামলা জবাবে তার ওপরও ধেয়ে আসবে। এর ফলে উভয় পক্ষেরই সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত ধ্বংস নিশ্চিত হবে। এভাবেই মূলত কোনো পক্ষ আগে হামলা করার সাহস করবে না।

[2] পুরো বিশ্বের সমুদ্রগুলোতে মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতির নেপথ্য উদ্দেশ্যও ছিল এই ডিটারেন্স বা ভীতি প্রদর্শন।

[3] এই বিশেষ আইনটির নাম হলো ‘War Powers Resolution 1973’।

[4] এই মানসিকতাকে সাধারণত ‘ভিয়েতনাম সিনড্রোম’ (Vietnam Syndrome) বলা হয়ে থাকে।

[5] উল্লেখ্য যে, ১৯৮৮ সালে আরামকোর জাতীয়করণের পর, ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকা এবং তাদের মিত্রদের পুরো যুদ্ধাভিযানের সময় সৌদি আরব তাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তেল সরবরাহ করেছিল।

[6] ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ পরিভাষাটি মূলত প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, সেনাবাহিনী এবং নির্দিষ্ট সরকারি পদাধিকারীদের একটি অশুভ আঁতাত বা সিন্ডিকেটকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। ১৯৬১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার সরকারি প্রতিরক্ষা নীতিতে এই আঁতাতের ভয়াবহ প্রভাব বিস্তারের কথা উল্লেখ করতে গিয়েই সর্বপ্রথম এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছিলেন।

[7] ডিটারেন্স থিওরি বা ভীতি প্রদর্শনের বিষয়টি কেবল আমেরিকার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো বিশ্বই এটি সানন্দে গ্রহণ করেছে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো (National states) প্রতিষ্ঠার পর, এসব রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেমের আবেগ সবসময় সতেজ রাখার জন্য একটি প্রতিপক্ষ ও শত্রুর অস্তিত্বকে অপরিহার্য মনে করা হয়। শত্রুতা যেন চিরকাল বজায় থাকে, আবার বড় পরিসরে কোনো যুদ্ধও যেন না বাধে, ঠিক এই উদ্দেশ্যেই জাতিরাষ্ট্রগুলোতেও ডিটারেন্স থিওরি প্রয়োগ করা হয়। এই রাষ্ট্রগুলোকে এমন এক পথে পরিচালিত করা হয় যে, শত্রুকে হামলা থেকে বিরত রাখার জন্য বেশি বেশি অস্ত্র মজুত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে শত্রু সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকে। আর এভাবেই জাতিরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এক অঘোষিত অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা হয়। বলাই বাহুল্য, এর সরাসরি ফায়দা ওই অস্ত্র নির্মাণকারী কারখানাগুলো এবং তাদের মালিক বিশ্বশক্তিগুলোরই হয়েছে এবং আজও হচ্ছে।

[8] উক্ত সাক্ষাৎকারটি ‘নাওয়ায়ে গাযওয়ায়ে হিন্দ’ ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর-জুলাই ২০২৪ সংখ্যায় ‘জিহাদকে লিয়ে নেকলো!’ (জিহাদের জন্য বেরিয়ে পড়ো!) শিরোনামে দেখা যেতে পারে। —সম্পাদক

 

***********
پی ڈی ایف
PDF (690 KB)
পিডিএফ ডাউনলোড করুন [৬৯০ কিলোবাইট]

লিংক-১ : https://archive.gnews.to/s/7ooJL5BZyfL4y6m
লিংক-২ : https://banglafiles.net/index.php/s/CAfRwM6njQWpyEB
লিংক-৩ : https://mega.nz/file/vuAzCRJL#1TyzOS0Cgkuy1zENUdUtpxHYxe0QUq6n6RD7Y3wGnwI

ورڈ
WORD (978 KB)
ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন [৯৭৮ কিলোবাইট]

লিংক-১ : https://archive.gnews.to/s/3T3z4bSbDkCbMoQ
লিংক-২ : https://banglafiles.net/index.php/s/esWdwN3TyKx66re
লিংক-৩ : https://mega.nz/file/26A0mRqK#-4CuOzmx7xPoylFq7Z5NQojPyP3HpKe915x7lM9aKCg

غلاف
Cover (871 KB)
কভার ডাউনলোড করুন [৮৭১ কিলোবাইট]

লিংক-১ : https://archive.gnews.to/s/sgntn9FAEd4H6sB
লিংক-২ : https://banglafiles.net/index.php/s/HjYdrSQxcgKojs5
লিংক-৩ : https://mega.nz/file/7vAG1BxY#zK0Er_NmFfpKMgnhErbZkNxWlkeI23Ub6sXwAiIulVE

بينر
banner [867 KB]
ব্যানার [৮৬৭ কিলোবাইট]

লিংক-১ : https://archive.gnews.to/s/NJxiT8Zs6qQPcYq
লিংক-২ : https://banglafiles.net/index.php/s/BDttpRmMKna8zeR
লিংক-৩ : https://mega.nz/file/b6AGyJRC#z1fK0pdccIEHISCcnRcp15qeavac3KV7YU1yQR66j3M

Orginal File PDF- (1.6 MB)

লিংক-১ : https://archive.gnews.to/s/H295K2JnNxY3dXe
লিংক-২ : https://banglafiles.net/index.php/s/4asqAHLjZY95Gaw
লিংক-৩ : https://mega.nz/file/m6ZRRTaK#qGD10gyqEUEioGMKjULu1hbRktAzIrD-GbcKomemUPU

اپنی دعاؤں میں ہمیں یاد رکھيں
اداره النصر براۓ نشر و اشاعت
القاعدہ برِّ صغیر
আপনাদের দোয়ায়
আন নাসর মিডিয়ার ভাইদের স্মরণ রাখবেন!
আল কায়েদা উপমহাদেশ
In your dua remember your brothers of
An Nasr Media
Al-Qaidah in the Subcontinent

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button