সম্মানিত ভিজিটর! গাজওয়াতুল হিন্দ ওয়েবসাইটের আইপি এড্রেস- 82.221.136.58, ব্রাউজিং করতে সমস্যা হলে আইপি দিয়ে প্রবেশ করুন!
Home / বিষয় / আকিদা-মানহাজ / উম্মাহর হারানো আকীদা || আকীদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা -শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফিজাহুল্লাহ || pdf/word
উম্মাহর হারানো আকীদা || আকীদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা -শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফিজাহুল্লাহ || pdf/word

উম্মাহর হারানো আকীদা || আকীদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা -শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফিজাহুল্লাহ || pdf/word

আন নাসর মিডিয়া
পরিবেশিত
আকিদা সম্পর্কিত খুবই
গুরুত্বপূর্ণ একটি কিতাব


উম্মাহর হারানো আকীদা
আকীদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা
-শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফিজাহুল্লাহ
PDF (1.90 MB)
https://www.mediafire.com/file/lib8lyqmpegkjgl/AlWalaWalBara-ShayekhZawahiri.pdf/file
https://www.sendspace.com/file/kmq5e8
https://files.fm/u/d9ajs3pg
https://upload.ac/3jjgth0dn6g9
https://ia601500.us.archive.org/1/items/alwalawalbarashayekhzawahiri/AlWalaWalBara-ShayekhZawahiri.pdf
https://mega.nz/#!INdUgabJ!QpMUchZTIXTndzXCa3ForovbhpHVOSyr3Lb_KsmsQn0 DOC (972 KB)
https://www.sendspace.com/file/rkz2rn
https://www.mediafire.com/file/0p64t9ui45movci/AlWalaWalBara-ShayekhZawahiri.docx/file
https://files.fm/u/txrqr9hn
https://upload.ac/mfqaoki23mjg
https://mega.nz/#!RNMCiAJL!MRnrwzl22lM9vLqqbR8gEKY4ee4oe1rWCiHOceHZHNU
https://archive.org/details/alwalawalbarashayekhzawahiri_202002
==================

উম্মাহর হারানো আকীদা

আকীদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা

-শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফিজাহুল্লাহ

 

ভূমিকা

ইসলামী ইতিহাসের এ দশকগুলো অবাধ্য-অহংকারী কুফরীশক্তি আর মুসলিম উম্মাহ ও তাদের নেতৃত্বদানকারী বীর মুজাহিদগণের মাঝে চলমান এক প্রচণ্ড যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছে। ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্কের দু’টি বরকতময় হামলা এবং পরবর্তীতে ইসলামের বিরুদ্ধে বুশের নব্য ক্রুসেডযুদ্ধ বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে যা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ইসলামে আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার আকীদার গুরুত্ব অনুধাবন করা কতটা প্রয়োজন- তা এ যুদ্ধের বাস্তবতা ও ঘটনাবলি থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে ইসলামী আকীদার এ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির আমানত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি সম্পর্কেও আমাদের জানা থাকা একান্ত কর্তব্য। আকীদার এ সুদৃঢ় স্তম্ভটির নিদর্শনকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে মুসলিম উম্মাহর সাথে ইসলামের দুশমন ও তাদের অনুসারী-সহযোগীরা যে ব্যাপক প্রতারণা করছে, তাও আমাদের জানতে হবে।

এরাই সেই শত্রু, যারা সামরিক ক্রুসেড আক্রমণের সাথে সাথে (ইসলামের বিরুদ্ধে) এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এরাই আন্তর্জাতিক যায়নবাদী ইয়াহুদী ও ক্রুসেড শক্তির জরাজীর্ণ বাস্তবতাকে ঢেকে রাখার জন্য (মুসলিম উম্মাহর মাঝে) বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা, বিকৃতকরণ ও গোলামিপূর্ণ মানসিকতার অবমাননাকর ধ্যান-ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে এক হীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের সরকারগুলোই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এটি সেই আক্রমণ, হক্ব-বাতিলের মধ্যকার সীমারেখা মুছে দেওয়াই যার একান্ত লক্ষ্য। যাতে শত্রু-মিত্র একাকার হয়ে যায় (এবং শত্রুকে মিত্র ভাবা হয়)। এমনকি ক্রমবর্ধমান ইসলামী জিহাদী শক্তিকে প্রতিহত করার অপকৌশল হিসেবে- লাঞ্ছনা, গোলামি, গাইরুল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানবরচিত আইনে শাসন করা ইত্যাদি অপকর্মকে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করা যায়। আর এর পাশাপাশি উম্মাহর বীর মুজাহিদীন, তাঁদের সাহায্যকারী ও তাঁদের পতাকাতলে সমবেত তাওহীদী জনতা ইজ্জত, জিহাদ ও হক্বের দাওয়াতের যে পতাকা উত্তোলন করছেন, সেটাকে বিকৃত করাও তাদের লক্ষ্য।

সত্য, সম্মান ও জিহাদের দাওয়াত যতই শক্তিশালী হচ্ছে, তার মোকাবেলায় বাতিলের চেঁচামেচি, লাঞ্ছনা, কাপুরুষতা ও নিষ্ফল কার্যক্রম ততই বেড়ে চলছে। এমনকি বাতিলপন্থীরা নিজদেরকে সোনালী যুগের সালাফদের আকীদা-বিশ্বাসের রক্ষক বলে অবিরাম চিল্লাচিল্লি করলেও, নিজেরা পূর্বেকার সেই উগ্র মুরজিয়াদের দাওয়াতকে লালন-পালন করতে কোনো দ্বিধাবোধ করে না। নিজেদেরকে শরীয়াহর অতন্দ্র প্রহরী ও প্রতিরক্ষাকারী দাবি করলেও পাপাচারী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের স্লোগান আওড়াতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করে না। তাই তো তাদের মতে, সে ব্যক্তি ক্ষতিকর নয়; যে সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা বিভাগ, গণমাধ্যম বা বিচারক পদে চাকুরি করে সরকারের প্রতিরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে, কুফরী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রতি দাওয়াত দেয়, ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে প্রচারণা চালায় এবং তাদের প্রতি আনুগত্য করে। অথচ সে একই সময়ে নামায পড়ে, রোযা রেখে, হাজ্ব করে এবং যাকাত দিয়ে আল্লাহভীরু পরহেজগার মুসলমান হিসেবেও গণ্য হয়!

এমনকি আমরা দেখি- সবচেয়ে অভিজাত রাজপরিবারটিও আমেরিকার স্বার্থরক্ষায় সদা ব্যস্ত থাকে; অথচ নিজদেরকে তারা তাওহীদের রক্ষক বলে দাবি করে। আমরা দেখি- সে সব কুফরের নেতাকে, যারা ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান পালন করতে বাধ্য করে, মানবরচিত আইন দ্বারা দেশ পরিচালনা করে এবং পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত- ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণে; অথচ তারাই আবার হিজাব নিষিদ্ধ করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আমরা দেখি- সে সব জল্লাদ শাসককে, যারা মুসলমানদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি প্রদান করে; অথচ তারাই আবার মহাআড়ম্বরে হাজ্ব-উমরাও পালন করে। আমরা দেখি- আফগানিস্তানের একদল ডাকাতকে, যারা আমেরিকা থেকে বেতন গ্রহণ করে, আর আমেরিকা তাদেরকে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সামনের সারিতে ঠেলে দেয়। তারপর তারা তাদের কথিত সেই শহীদ ভাইদের কাপড়-চোপড় ও তাঁদের কবরের মাটি থেকে বরকত হাসিল করে!

যেমন তাতারদের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন, এমনকি মানুষ তাদেরকে ভূমিদখল এবং সম্পদলুট করতে দেখে। তারা কোনো মানুষকে বশে এনে তার কাছ থেকে ফায়দা লুটে নেয়, তার সব কাপড়-চোপড় ছিনিয়ে নেয় এবং তার স্ত্রীকে গালিগালাজ করে (সম্মান হরণ করে)। তাকে এমন সব শাস্তি প্রদান করে, যা একমাত্র নিকৃষ্টতর জালিম এবং পাপাচারী ব্যক্তিদের দ্বারাই সম্ভব। সেই (জুলুমবাজিকে) আবার শরীয়াহ কর্তৃক বৈধতাও দেয়, যেন দ্বীনের বিরোধিতার কারণেই তারা শাস্তি প্রদান করে থাকে। দ্বীনের দোহাই দিয়ে তাদেরকে আবার বিরোধীদের বশে আনার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তারা দাবি করে, তারাই দ্বীনের সবচেয়ে অনুগত। এমন পরিস্থিতিতে তাদের ব্যাপারে কী আর বলার থাকে?

এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই। এটাই তো বাতিলের সেই ফেনাতুল্য অস্ত্র, যার মাধ্যমে তারা সর্বশক্তি এক করে আমাদের বুকের উপর অধোমুখী ফাসাদ নিরন্তর চালু রাখতে চায় এবং উম্মাহর পবিত্র ভূমির উপর প্রতিনিয়ত দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখতে চায়। বিশেষত, পবিত্রতম তিনটি ভূখণ্ড- মক্কা, মদীনা ও বাইতুল মুকাদ্দাস এর উপর।

প্রত্যেক চিন্তাশীল ও বিবেকবান মানুষের কাছে এটিই তাদের দাওয়াতের সার কথা। শরীয়াহ বহির্ভূত বিশৃঙ্খল আইন-কানুন দেশে অব্যাহত রাখা এবং নব্য ক্রুসেডারদের জন্য আমাদের ভূমিগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়াই তাদের বক্তৃতা-ভাষণ ও প্রকাশিত-সম্প্রচারিত প্রতিটি শব্দের অভিষ্ট লক্ষ্য।

এরাই সেই সম্প্রদায়- কুরআনে কারীম যাদের পূর্বপুরুষদেরকে অপদস্থ করেছে এবং তাদের মুখোশ উন্মোচন করে বর্ণনা করে দিয়েছে যে, মুসলমানদের মাঝে এরাই ফেতনা অন্বেষণ করে। এরাই ফেতনাকে দ্রুততম সময়ে লুফে নেয়। এরাই পার্থিব হীনস্বার্থ আর ব্যক্তিগত ফায়দার জন্য কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً وَلَٰكِن كَرِهَ اللَّهُ انبِعَاثَهُمْ فَثَبَّطَهُمْ وَقِيلَ اقْعُدُوا مَعَ الْقَاعِدِينَ ﴿التوبة: ٤٦﴾ لَوْ خَرَجُوا فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ ﴿التوبة: ٤٧﴾

আর যদি তারা বের হবার সংকল্প নিত, তবে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করতো। কিন্তু তাদের উত্থান আল্লাহর পছন্দ নয়, তাই তাদের নিবৃত রাখলেন এবং আদেশ হল বসা লোকদের সাথে তোমরা বসে থাক। যদি তোমাদের সাথে তারা বের হত, তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করতো না, আর অশ্ব ছুটাতো তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। বস্তুতঃ আল্লাহ যালিমদের ভালভাবেই জানেন।” (সূরা তাওবা: ৪৬-৪৭)

وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا ﴿الأحزاب: ١٢﴾ وَإِذْ قَالَت طَّائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا ﴿الأحزاب: ١٣﴾ وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِم مِّنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا ﴿الأحزاب: ١٤﴾

এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ ও রসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ নয়। এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরেববাসী, এটা টিকবার মত জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চল। তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ী-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা। যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হত, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না।” (সূরা আহযাব: ১২-১৪)

অতএব, আমরা মনে করি, তাওহীদ ও ইসলামী আকীদার জন্য মারাত্মক হুমকি এবং এ যুগের সবচেয়ে বড় ফেতনা হলো, আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার আকীদা থেকে সরে যাওয়া। অর্থাৎ মু’মিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ এবং কাফেরদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করার নীতি থেকে সরে যাওয়ার ফেতনা। তাই মুসলিম উম্মাহর প্রতি ইয়াহুদী জায়নবাদী ও মার্কিন ক্রুসেড আক্রমণের মোকাবেলায়, আল্লাহর ইচ্ছায় যে সাহায্যপ্রাপ্ত জিহাদ ও বরকতময় প্রতিরোধ আন্দোলন চলছে, সে ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করে এ কয়েক পৃষ্ঠা লেখার মনস্থ করেছি।

আর বিষয়টিকে আমরা দুটি অনুচ্ছেদ ও একটি উপসংহারে বিন্যস্ত করেছি।

প্রথম অনুচ্ছেদ: ইসলামে আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার রোকনসমূহ।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার আকীদা থেকে সরে যাওয়ার ধরনসমূহ।

উপসংহার:  যেসব বিষয়ে আমরা গুরুত্বারোপ করতে চাই।

এ আলোচনায় যা কিছু কল্যাণকর, তা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার তাওফীকেই হয়েছে। আর যা কিছু এর বিপরীত, তা আমাদের ও শয়তানের পক্ষ থেকে হয়েছে।

وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ ﴿هود: ٨٨﴾

“আল্লাহর মদদ দ্বারাই কিন্তু কাজ হয়ে থাকে, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি এবং তাঁরই প্রতি ফিরে যাই।” (সূরা হুদ: ৮৮)

 

——————————————————

 

আবু মুহাম্মাদ আইমান আয-যাওয়াহিরী

শাওয়াল ১৪২৩

 

 

 

প্রথম অনুচ্ছেদ: ইসলামে আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার রোকনসমূহ

০১. কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা:

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

لَّا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ ﴿آل‌عمران: ٢٨﴾

মুমিনগন যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কেন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কেন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাই কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।” (সূরা আলে-ইমরান: ২৮)

ইমাম ত্ববারী রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-

ومعنى ذلك لا تتخذوا أيها المؤمنون الكفار ظهراً وأنصاراً، توالونهم على دينهم، وتظاهرونهم على المسلمين من دون المؤمنين، وتدلونهم على عوراتهم، فإنه من يفعل ذلك فليس من الله في شيء، يعني بذلك فقد برىء من الله وبرىء الله منه بارتداده عن دينه ودخوله في الكفر.

“এর অর্থ হচ্ছে, হে মু’মিনগণ! তোমরা কাফেরদেরকে সাহায্য ও সহায়তাকারীরূপে গ্রহণ করো না; এভাবে যে তোমরা মু’মিনদের ব্যতিরেকে তাদেরকে তাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে ভালোবাসবে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করবে, মু’মিনদের দুর্বলতা তাদের নিকট প্রকাশ করবে। কেননা যে এ ধরনের কাজ করবে, সে আল্লাহর জিম্মা থেকে মুক্ত। অর্থাৎ উপরোক্ত কর্মের কারণে তার সাথে আল্লাহ তা‘আলার এবং আল্লাহ তা‘আলার সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কেননা সে দ্বীন থেকে রিদ্দাহ করেছে (মুরতাদ হয়ে গেছে) এবং কুফরে প্রবেশ করেছে।” (তাফসীরে ত্ববারী, ৩/২৭৭)

মহান আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন-

بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا ﴿النساء: ١٣٨﴾ الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا ﴿النساء: ١٣٩﴾

সে সব মুনাফেককে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য।” (সূরা নিসা: ১৩৮-১৩৯)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَن تَجْعَلُوا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُّبِينًا ﴿النساء: ١٤٤﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা কাফেরদেরকে বন্ধু বানিও না মুসলমানদের বাদ দিয়ে। তোমরা কি এমনটি করে নিজের উপর আল্লাহর প্রকাশ্য দলীল কায়েম করে দেবে?” (সূরা নিসা: ১৪৪)

ইমাম ত্ববারী রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-

يقول لهم جل ثناؤه يا أيها الذين آمنوا بالله ورسوله لا توالوا الكفار فتوازروهم من دون أهل ملتكم ودينكم من المؤمنين فتكونوا كمن أوجب له النار من المنافقين.

‘আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বলেন, ওহে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নকারী লোকসকল! কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তোমাদের স্বজাতি ও দ্বীনি ভাই মু’মিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করো না। যদি কর, তবে মুনাফিকদের মতো তোমাদের জন্যও জাহান্নাম অবধারিত হবে।’(তাফসীরে ত্ববারী, ৫/৩৩৭)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿المائدة: ٥١﴾ فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَىٰ أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا أَسَرُّوا فِي أَنفُسِهِمْ نَادِمِينَ ﴿المائدة: ٥٢﴾ وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَاسِرِينَ ﴿المائدة: ٥٣﴾ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ﴿المائدة: ٥٤﴾ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ ﴿المائدة: ٥٥﴾ وَمَن يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ ﴿المائدة: ٥٦﴾ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴿المائدة: ٥٧﴾ وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ اتَّخَذُوهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُونَ ﴿المائدة: ٥٨﴾

হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। বস্তুতঃ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলেঃ আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দুরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন-ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্যে অনুতপ্ত হবে। মুসলমানরা বলবেঃ এরাই কি সে সব লোক, যারা আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা করত যে, আমরা তোমাদের সাথে আছি? তাদের কৃতকর্মসমূহ বিফল হয়ে গেছে, ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে। হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী। তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী। হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা ঈমানদার হও। আর যখন তোমরা নামাযের জন্যে আহবান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ, তারা নিবোর্ধ।” (সূরা মায়িদা: ৫১-৫৮)

ইমাম ত্ববারী রহ. বলেন- ‘আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ [আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত] অর্থাৎ

ومن يتول اليهود والنصارى دون المؤمنين {فإنه منهم}، يقول: فإن من تولاهم ونصرهم على المؤمنين فهو من أهل دينهم وملتهم، فإنه لا يتولى متول أحداً إلا وهو به وبدينه وما هو عليه راض، وإذا رضيه ورضي دينه فقد عادى ما خالفه وسخطه وصار حكمه حكمه.

যে মুসলমানদেরকে ব্যতিরেকে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করবে, সে তাদের দ্বীন ও মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ, কেউ কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে পারে না; যতক্ষণ না সে উক্ত ব্যক্তির দ্বীন ও অবস্থার উপর সন্তুষ্ট হয়। যখন সে তার উপর ও তার দ্বীনের উপর সন্তুষ্ট হবে, তখন তার বিপরীত সবকিছুর ব্যাপারে বিরোধিতা ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং দু’জনের হুকুম একই হবে।” (তাফসীরে ত্ববারী, ৬/২৭৭)

হাদীস শরীফে হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِقَوْمٍ عَذَابًا أَصَابَ الْعَذَابُ مَنْ كَانَ فِيهِمْ ثُمَّ بُعِثُوا عَلَى أَعْمَالِهِمْ.

আল্লাহ তাআলা যখন কোন জাতির উপর আযাব অবতীর্ণ করেন, তখন সেখানে বসবাসরত সকলের উপরই সেই আযাব নিপতিত হয় অবশ্য পরে (কিয়ামতের দিন) প্রত্যেককে তার আমল অনুসারে উঠানো হবে।”(সহীহ বুখারী, হাদীস নং৬৬২৩, .ফা.)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন-

ويستفاد من هذا مشروعية الهرب من الكفار ومن الظلمة لأن الإقامة معهم من إلقاء النفس إلى التهلكة، هذا إن لم يعنهم ولم يرض بأفعالهم، فإن أعان أو رضي فهو منهم.

“এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, কাফের ও জালিমেদের কাছ থেকে পালানো বৈধ। কারণ, তাদের সাথে বসবাস করা মানে নিজেকে ধ্বংসের মাঝে নিক্ষেপ করা। যদি তাদেরকে সাহায্য না করা হয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট না হয়, তখন এ কথা প্রযোজ্য হবে। যদি তাদেরকে সাহায্য করা হয় অথবা তাদের প্রতি সন্তুষ্টি পাওয়া যায়; তবে সে তাদেরই একজন (বলে গণ্য হবে)।”(ফাতহুল বারী, ৩১/৬১)

তাই তো আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম অবধারিত করে রেখেছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

تَرَىٰ كَثِيرًا مِّنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنفُسُهُمْ أَن سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ ﴿المائدة: ٨٠﴾ وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَٰكِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ ﴿المائدة: ٨١﴾

আপনি তাদের অনেককে দেখবেন, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে। যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও রসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচার।” (মায়িদা: ৮০৮১)

মহান আল্লাহ তা‘আলা আরও ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿التوبة: ٢٣﴾ قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ ﴿التوبة: ٢٤﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী। বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।” (সূরা তাওবা: ২৩২৪)

ইবনে কাসীর রহ বলেন, ইমাম বায়হাকী রহ. আব্দুল্লাহ ইবনে শাওযাব রাযি. এর রেওয়ায়াতে বর্ণনা করেন, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি. এর পিতা বদর যুদ্ধের দিন প্রতিমাসমূহের গুণকীর্তন করতে লাগল। আবু উবায়দা রাযি. বারবার সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে লাগলেন। যখন পিতা জাররাহ মাত্রাতিরিক্ত করে ফেলল, তখন সন্তান আবু উবায়দা পিতাকে লক্ষ্যস্থল বানালেন এবং হত্যা করলেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ সকল আয়াত অবতীর্ণ করেন।

সহীহ হাদীসে হযরত আবু হুরাইরাহ রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ.

সেই পবিত্র সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতামাতা  সন্তানের চেয়ে বেশী প্রিয় হই” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং১৩)

অনুরূপভাবে হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ 

তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) মু’মিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান এবং সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় হব।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং১৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং৪৪)

ক. বন্ধুত্ব ও সাবধানতা অবলম্বনের (তুকিয়া) মাঝে পার্থক্য:

কাফেরদের সাথে শরীয়াহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বন্ধুত্ব করা এবং তাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচা- এ দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য ইসলাম সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

لَّا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ ﴿آل‌عمران: ٢٨﴾

মুমিনগন যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন এবং সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।” (সূরা আলে-ইমরান: ২৮)

ইবনে কাসীর রহ বলেন, আল্লাহ তা‘আলার বাণী إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً [তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টতার আশঙ্কা কর] তথা কোনো ব্যক্তি কোনো জনপদে কোনো সময় তাদেরকে ভয় করলে তার জন্য বাহ্যিকভাবে তাদের সাথে তোষামোদ/তুকিয়া করার অনুমতি আছে। তবে এ তোষামোদ অভ্যন্তরীণ ও আন্তরিকভাবে না হতে হবে। যেমন ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আবু দারদা রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

إنَّا لَنَكْشرُ فِي وُجُوهِ أقْوَامٍ وَقُلُوبُنَا تَلْعَنُهُمْ

“নিশ্চয় আমরা অনেক জাতিকে মুখের হাসি উপহার দিলেও আমাদের অন্তর তাদেরকে অভিশাপ দেয়।”

সুফিয়ান সাওরী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. এর সূত্রে বর্ণনা করেন-

ليس التقية بالعمل إنما التقية باللسان

তোষামোদ মুখেই হয়, কাজেকর্মে নয়। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১/৫৭)

কাশর (الكَشْر) শব্দের অর্থ দাঁত কেলিয়ে মুচকি হাসা। (লিসানুল আরব, ৫/১৪২)

ইমাম ইবনে কাসীর রহ. তাঁর তাফসীর গ্রন্থে বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ ﴿التحريم: ١١﴾

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য ফেরাউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন। যিনি প্রার্থনা করছেন, হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করুন। আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।”(সূরা তাহরীম: ১১)

মু’মিনদের জন্য আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করে বুঝাতে চান যে, যদি মু’মিনগণ কাফেরদের প্রতি মুখাপেক্ষী থাকে; তবে তাদের সাথে মিশে থাকাতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন-

لَّا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً ﴿آل‌عمران: ٢٨﴾

মুমিনগন যেন মুমিনদেরকে ছেড়ে কোনো কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা কর; তাহলে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে ।”(সূরা আলে-ইমরান: ২৮)

সূত্র: তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪/৩৯৪

 

 

ইমাম কুরতুবী রহ বলেন-

قال معاذ بن جبل ومجاهد: “كانت التقية في جدة الإسلام قبل قوة المسلمين، فأما اليوم فقد أعز الله الإسلام أن يتقوا من عدوهم

হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল রাযি. ও মুজাহিদ রহ. বলেন, ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের শক্তি অর্জনের পূর্বে এই তোষামোদ নীতি ছিল। আর এখন তো আল্লাহ তাআলা ইসলামকে দুশমন থেকে সুরক্ষা পাওয়ার শক্তি দান করে সম্মানিত করেছেন।

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন,

هو أن يتكلم بلسانه وقلبه مطمئن بالإيمان ولا يقتل ولا يأتي مأثماً

তুকিয়া হলো মৌখিক সম্পর্ক রাখা; তবে তার অন্তর ঈমান-বিশ্বাসে প্রশান্ত থাকতে হবে, সে (তাদের জন্য কোনো মুসলিমকে) হত্যা করবে না, কোনো অপরাধও করবে না।

ইমাম হাসান রহ. বলেন, মানুষের জন্য তুকিয়া বা তোষামোদ নীতি কিয়ামত অবধি চালু থাকবে। তবে (কোনো মুসলিমকে) হত্যা তোষামোদ নীতির অন্তর্ভুক্ত নয়।

এবং বলা হয়, মু’মিন যখন কাফেরদের মাঝে অবস্থান করে এবং নিজের জানের ব্যাপারে আশঙ্কা করে, তখন কাফেরদের সাথে মৌখিক তোষামোদ বৈধ; তবে অন্তর ঈমানের উপর প্রশান্ত থাকতে হবে। আর তোষামোদ একমাত্র তখনই বৈধ হবে, যখন হত্যা, অঙ্গহানি বা কঠিন শাস্তির আশঙ্কা করবে। আর যে ব্যক্তিকে কুফরী করতে বাধ্য করা হবে, তখন করণীয় হবে- সে এ ক্ষেত্রে কঠোর হবে এবং কিছুতেই কুফরী বাক্য উচ্চারণ করার প্রতি সাড়া দেবে না; তবে তা করা তার জন্য জায়েয আছে। (তাফসীরে কুরতুবী, ৪/৫৭)

ইমাম ত্ববারী রহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন, إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً [তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টতার আশঙ্কা কর] তবে তোমরা যদি তাদের অধীনে থাক এবং তোমাদের প্রাণনাশের আশঙ্কা কর, তখন তোমরা মৌখিকভাবে তাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রকাশ করবে এবং অন্তরে শত্রুতা পোষণ করবে।

لا تشايعوهم على ما هم عليه من الكفر، ولا تعينوهم على مسلم بفعل

তারা যে কুফরের উপর অবস্থান করছে, তাকে সমর্থন করবে না। কোনোভাবেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করবে না। (তাফসীরে ত্ববারী, ৩/২৭৭)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মতও এটাকে শক্তিশালী করে। তাতারদের আমলে যেসব মুসলমানকে তাতারদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধে বের হওয়ার জন্য জোরজবরদস্তি করা হয়েছিল, তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন, “এবং জিহাদ যখন ওয়াজিব, আল্লাহর ইচ্ছায় যুদ্ধে অনেক মুসলমানই শহীদ হয়। জিহাদের প্রয়োজনে কাফেরদের মাঝে অবস্থানকারী কোনো মুসলমান যদি মারা পড়ে, তা বড় কোনো ব্যাপার নয়।”

বরং এ রকম বাধ্য মুসলমানকে ফেতনার যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তলোয়ার ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাকে হত্যা করা হলেও তার জন্য এমতবস্থায় যুদ্ধ করা জায়েয হবে না।

যেমনটি সহীহ মুসলিমের হাদীসে আবু বাকরাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

إِنَّهَا سَتَكُونُ فِتَنٌ أَلَا ثُمَّ تَكُونُ فِتْنَةٌ الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنْ الْمَاشِي فِيهَا وَالْمَاشِي فِيهَا خَيْرٌ مِنْ السَّاعِي إِلَيْهَا أَلَا فَإِذَا نَزَلَتْ أَوْ وَقَعَتْ فَمَنْ كَانَ لَهُ إِبِلٌ فَلْيَلْحَقْ بِإِبِلِهِ وَمَنْ كَانَتْ لَهُ غَنَمٌ فَلْيَلْحَقْ بِغَنَمِهِ وَمَنْ كَانَتْ لَهُ أَرْضٌ فَلْيَلْحَقْ بِأَرْضِهِ قَالَ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ مَنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ إِبِلٌ وَلَا غَنَمٌ وَلَا أَرْضٌ قَالَ يَعْمِدُ إِلَى سَيْفِهِ فَيَدُقُّ عَلَى حَدِّهِ بِحَجَرٍ ثُمَّ لِيَنْجُ إِنْ اسْتَطَاعَ النَّجَاءَ اللَّهُمَّ هَلْ بَلَّغْتُ اللَّهُمَّ هَلْ بَلَّغْتُ اللَّهُمَّ هَلْ بَلَّغْتُ قَالَ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ أُكْرِهْتُ حَتَّى يُنْطَلَقَ بِي إِلَى أَحَدِ الصَّفَّيْنِ أَوْ إِحْدَى الْفِئَتَيْنِ فَضَرَبَنِي رَجُلٌ بِسَيْفِهِ أَوْ يَجِيءُ سَهْمٌ فَيَقْتُلُنِي قَالَ يَبُوءُ بِإِثْمِهِ وَإِثْمِكَ وَيَكُونُ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ.

অদূর ভবিষ্যতে অনেক ফেতনা হবে। জেনে রেখ, এরপরও অনেক ফেতনা হতেই থাকবে। তখন পদচারীর চেয়ে বসা ব্যক্তিই উত্তম হবে। দৌঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে পদচারীই উত্তম হবে। যখন সেই ফেতনা এসে পড়বে বা সংঘটিত হবে, তখন যার উট আছে; সে যেন উট নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যার ছাগল আছে; সে যেন তার ছাগল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যার জায়গা-জমি আছে, সে যেন তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। রাবী বলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যার উট, ছাগল কিংবা জমি নেই, সে কী করবে? তিনি বললেন, সে তার তলোয়ারটা নিয়ে ধারালো দিকটা পাথরে আঘাত করবে এবং ফেতনাকে এড়িয়ে যেতে পারলে এড়িয়ে যাবে। আল্লাহ! আমি কি পৌঁছিয়েছি? আল্লাহ! আমি কি পৌঁছিয়েছি? আল্লাহ! আমি কি পৌঁছিয়েছি?

তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমাকে বাধ্য করে দুসারি বা দুদলের কোনো একটির সাথে নিয়ে যায়। অতঃপর সেখানে তলোয়ার বা তীর নিক্ষেপ করে আমাকে কেউ আঘাত করে এবং আমি নিহত হই, এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? তিনি বললেন, সে আল্লাহর কাছে তার গোনাহ এবং তোমার গোনাহ দুটো নিয়েই প্রত্যাবর্তন করবে এবং জাহান্নামের অধিবাসী হবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৭৪৩২)

এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফেতনার সময় যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন; বরং এড়িয়ে যাওয়া বা হাতিয়ার নষ্ট করে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার জন্য অপারগতা প্রদর্শন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশে বাধ্য করা হয়েছে বা হয়নি এমন উভয় ব্যক্তিরই আলোচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অতঃপর বলা হয়েছে, বাধ্যগত মুসলমান যদি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, তখন হত্যাকারীই নিজের গোনাহ এবং তার গোনাহর দায় বহন করবে। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা আদম আ. এর দুই সন্তানের কাহিনীতে বর্ণনা করেছেন।

উদ্দেশ্য হলো: ফেতনার সময় যদি যুদ্ধ করতে কাউকে বাধ্য করা হয়, তার জন্য যুদ্ধ করা জায়েয হবে না। বরং তার উপর ওয়াজিব হবে অস্ত্র ভেঙে ফেলা এবং অন্যায়ভাবে নিহত হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করা। সুতরাং ইসলামী শরীয়াহ থেকে বের হয়ে যাওয়া সেনাবাহিনীর সাথে মিলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করা ব্যক্তির জন্য কীভাবে জায়েয হবে?? যেমন, যাকাত অস্বীকারকারী ও মুরতাদ প্রমুখদের সাথে মিলে। অতএব, সন্দেহাতীতভাবে তার জন্য ওয়াজিব হলো, সে ময়দানে উপস্থিত হতে বাধ্য হলেও যেন কিছুতেই যুদ্ধ না করে; যদিও মুসলমানগণ তাকে হত্যা করে। যেমনিভাবে কাফেররা যদি কাউকে ময়দানে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে। এমনিভাবে কোনো মুসলিমকে অপর মুসলিমকে হত্যা করতে বাধ্য করে, সমস্ত মুসলমানের ঐকমত্যে তার জন্য তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না। কারণ, একজন নিষ্পাপ ব্যক্তিকে হত্যা করে নিজেকে বাঁচানো তার জন্য জায়েয নয়।” (মাজমূউল ফাতাওয়া, ২৮/৩৩৮-৩৩৯ পৃ.)

সারকথা: কোনো মুসলমান যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় যে, তাকে হত্যা করা হবে বা অঙ্গহানি করা হবে বা কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে; তাহলে কাফেরদের নির্যাতন এড়ানোর জন্য কিছু তোষামোদি বাক্য বলা তার জন্য বৈধ। তবে এমন কোনো কাজ করা তার জন্য বৈধ নয়, যা তাদের সহযোগিতা হয় বা কোনো গোনাহের কাজ হয় অথবা কোনোভাবে কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করা, হত্যা করা বা যুদ্ধ করা হয়। বরং উত্তম হলো, নির্যাতন সয়ে যাওয়া; যদিও এটা তার হত্যা পর্যন্ত গড়ায়।

০২. কাফেরদের সাথে শত্রুতা পোষণ এবং তাদের বন্ধুত্ব বর্জন:

ক. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা:

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَٰئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَٰئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿المجادلة: ٢٢﴾

যাঁরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাঁদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাঁদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাঁদের অন্তরে আল্লাহ ঈমানকে সুদৃঢ় করে দিয়েছেন এবং তাঁদেরকে তাঁর পক্ষ হতে রূহ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। তিনি তাঁদেরকে জান্নাতে দাখিল করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তাঁরা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তাঁরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।”(সূরা মুজাদালা: ২২)

ইবনে কাসীর রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর বাণী وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ “যদিও তারা তাঁদের পিতা হয়” এ ব্যাপারে বলা হয়, এ আয়াতের এ অংশটি নাযিল হয়েছে সাহাবী আবু উবায়দা রাযি. এর ব্যাপারে, যিনি বদর যুদ্ধে তাঁর পিতাকে হত্যা করেছিলেন। أَوْ أَبْنَاءَهُمْ “অথবা তাঁদের পুত্র হয়” নাযিল হয়েছে আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এর ব্যাপারে, যিনি সেদিন তাঁর পুত্র আব্দুর রহমানকে হত্যা করতে মনস্থ করেছিলেন। أَوْ إِخْوَانَهُمْ “অথবা তাঁদের ভ্রাতা হয়” নাযিল হয়েছে মুসআব ইবনে উমাইর রাযি. এর ব্যাপারে, যিনি সেদিন তাঁর ভাই উবাইদ ইবনে উমাইরকে হত্যা করেছিলেন। أَوْ عَشِيرَتَهُمْ “অথবা তাঁদের গোষ্ঠী হয়” নাযিল হয়েছে উমর রাযি. এর ব্যাপারে, যিনি সেদিন তাঁর এক আত্মীয়কে হত্যা করেছিলেন। এবং হামযা, আলী ও উবায়দা ইবনে হারিস রাযি. এর ব্যাপারে, যারা সেদিন উতবা, শায়বা ও ওয়ালীদ ইবনে উতবাকে হত্যা করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলাই সর্বজ্ঞ।

(ইবনে কাসীর রহ. বলেন) আমার মতে, বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের সাথে যে পরামর্শ করেছিলেন, সেই পরামর্শও এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। তখন আবু বকর রাযি. মুক্তিপণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন; যেন সম্পদের মাধ্যমে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি করা যায়। বন্দীরা ছিল তাঁদের ভাই-বেরাদার ও আত্মীয়স্বজন। হতে পারে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হিদায়াত দিয়ে দেবেন। উমর রাযি. বললেন, “আবু বকর যে মত ব্যক্ত করেছেন, তার সাথে আমি একমত নই। আপনি অমুককে (উমর রাযি. এর আত্মীয়) আমার হাতে উঠিয়ে দিন, আমি তাকে হত্যা করি। আর আলীর হাতে আকীলকে দিন। অমুকের হাতে অমুককে দিন। যাতে আল্লাহ তা‘আলা জানতে পারেন যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের জন্য কোনো সহানুভূতি নেই।…” এভাবে পুরো ঘটনা।

ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, আল্লাহ তাঁদেরকে জিবরাঈল এর মাধ্যমে সাহায্য করেছেন। অর্থাৎ তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন। আল্লাহর বাণী- رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ “আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট, তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট” এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এটির গূঢ় রহস্য হলো, তারা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আত্মীয়স্বজনের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন, আল্লাহ তা‘আলাও তার বিনিময়ে তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন এবং তাঁদেরকেও সন্তুষ্ট করলেন।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/৩৩০-৩৩১)

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَن تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِن كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنتُمْ وَمَن يَفْعَلْهُ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ ﴿الممتحنة: ١﴾ إِن يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَأَلْسِنَتَهُم بِالسُّوءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ ﴿الممتحنة: ٢﴾ لَن تَنفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ﴿الممتحنة: ٣﴾ قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ ﴿الممتحنة: ٤﴾ رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ﴿الممتحنة: ٥﴾ لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيهِمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ﴿الممتحنة: ٦﴾ عَسَى اللَّهُ أَن يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُم مِّنْهُم مَّوَدَّةً وَاللَّهُ قَدِيرٌ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿الممتحنة: ٧﴾ لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الممتحنة: ٨﴾ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَىٰ إِخْرَاجِكُمْ أَن تَوَلَّوْهُمْ وَمَن يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿الممتحنة: ٩﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও; অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসূলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এবং আমার পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়ে থাক; তবে কেন তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনোরূপে তোমরাও কাফের হয়ে যাও। তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্তুতি কিয়ামতের দিন কোনো উপকারে আসবে না। তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন। তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তাঁরা তাঁদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। কিন্তু ইবরাহীমের উক্তি তাঁর পিতার উদ্দেশ্যে এর ব্যতিক্রম, তিনি বলেছিলেন, আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তোমার উপকারের জন্য আল্লাহর কাছে আমার আর কিছু করার নেই। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তোমারই উপর ভরসা করেছি, তোমারই দিকে মুখ করেছি এবং তোমারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন। হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি আমাদেরকে কাফেরদের জন্য পরীক্ষার পাত্র করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের ক্ষমা কর। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা কর, তোমাদের জন্য তাদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জানা উচিত যে, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ। যারা তোমাদের শত্রু, সম্ভবত আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালিম।” (সূরা মুমতাহিনা: ১-৯)

ইবনে কাসীর রহ. বলেন, পবিত্র এ সূরার প্রথমাংশ অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিল হাতিব ইবনে আবী বালতাআ রাযি. এর ঘটনা। ইমাম আহমাদ রহ. বলেন, ওবায়দুল্লাহ ইবনে আবী রাফি তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আলী রাযি. কে বলতে শুনেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে, জুবাইর ও মিকদাদকে পাঠালেন এবং বললেন- “এখনই রওয়ানা হয়ে রওজায়ে খাখে পৌঁছে যাও। সেখানে একজন উষ্ট্রারোহী নারীকে পাবে, যার কাছে একটি চিঠি আছে। তার কাছ থেকে তা নিয়ে এস।”

আমরা ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত বেগে রওয়ানা হলাম এবং রওজায়ে খাখে পৌঁছলাম। সেখানে সেই উষ্ট্রারোহী নারীকে পেয়ে গেলাম।

আমরা বললাম, “চিঠি বের কর।”

সে বলল, “আমার কাছে কোনো চিঠি নেই।”

আমরা বললাম, “হয় চিঠি বের কর, নয়তো আমরা কাপড় খুলে তল্লাশি করব।”

আলী রাযি. বলেন, তখন সে তার মাথার ঝুঁটি থেকে চিঠিটি বের করে দিল। আমরা চিঠি নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে ফিরে এলাম। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, “হাতিব ইবনে আবী বালতাআ এর পক্ষ থেকে মক্কার কয়েকজন মুশরিকের প্রতি।” তাতে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু ব্যাপার তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, “হাতিব এটি কী?”

তিনি বললেন, “আমার ব্যাপারে জলদি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি কুরাইশ বংশের ঘনিষ্ঠ ছিলাম; তবে আসল কুরাইশ ছিলাম না। আপনার সাথে যে সকল মুহাজির আছেন, মক্কায় তাঁদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে, যারা তাঁদের পরিবার পরিজনকে সুরক্ষা দেয়। যেহেতু তাদের সাথে আমার কোনো বংশীয় সম্পর্ক নেই, তাই আমি চাইছিলাম যে, পরিবার পরিজনকে বাঁচানোর জন্য তাদের সাথে এমন সম্পর্ক করি। আমি কুফরী কিংবা আমার দ্বীন পরিত্যাগ করে এ কাজ করিনি আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি।”

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “নিশ্চয়ই সে তোমাদেরকে সত্য বলেছে।”

উমর রাযি. বললেন, “আমাকে অনুমতি দিন। এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সে নিশ্চয়ই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বদরী সাহাবীদের ব্যাপারে অবগত রয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলে দিয়েছেন, তোমরা যা-ই ইচ্ছা কর। কারণ আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।”

এভাবেই ইবনে মাজাহ ব্যতীত মুহাদ্দিসীনে কেরাম বর্ণনা করেছেন। তবে ইবনে মাজাহ রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা ব্যতীত অন্য সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

সূত্র: সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০০৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৪৯৪, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৬৫০, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩৩০৫, সুনানে কুবরা, হাদীস নং-১১৫৮৫

ইমাম বুখারী রহ. মাগাযী অধ্যায়ে বৃদ্ধি করেছেন যে, এ (ঘটনার) প্রেক্ষিতে সূরাটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪২৭৪)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ

হে মুমিনগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মু’মিন বান্দাদেরকে কাফেরদের বয়কট করা, শত্রুতা পোষণ করা, তাদের সাথে বৈরী হওয়া ও তাদের থেকে মুক্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন; তিনি বলেছেন-

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ

তোমাদের জন্য রয়েছে ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীদের মাঝে উত্তম আদর্শ। যখন তাঁরা স্বীয় জাতিকে বললেন, আমরা তোমাদের থেকে পবিত্র।

অর্থাৎ আমরা তোমাদের থেকে পবিত্রতা ঘোষণা করছি।

وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ

এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাদের উপাসনা কর, তাদের থেকেও। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি।অর্থাৎ তোমাদের ধর্ম ও মতবাদকে।

وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا

আর আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরকাল শত্রুতা ও বিদ্বেষ থাকবে।

অর্থাৎ, এখন থেকে তোমাদের ও আমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ শুরু হয়েছে, যতদিন তোমরা কুফরীর উপর অটল থাকবে, ততদিন এ শত্রুতা ও বিদ্বেষ থাকবে। আমরা সর্বদা তোমাদের থেকে মুক্ত থাকব এবং তোমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব।

حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ

যতদিন পর্যন্ত এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করবে।

অর্থাৎ যতদিন তোমরা একত্ববাদী হয়ে এক আল্লাহর ইবাদত না করবে, যাঁর কোনো শরীক নেই এবং যতদিন আল্লাহর সাথে মূর্তি-প্রতিমা যাদের ইবাদত কর, তাদের থেকে পৃথক না হবে।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪/৩৪৫-৩৪৯ পৃ.)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا مِنَ الْآخِرَةِ كَمَا يَئِسَ الْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَابِ الْقُبُورِ

হে মুমিনগণ! আল্লাহ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে, যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।

ইমাম কুরতুবী রহ বলেন, আল্লাহর বাণী-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ

হে মুমিনগণ! আল্লাহ যে জাতির প্রতি রুষ্ট তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না।

অর্থাৎ ইয়াহুদীদের সাথে তোমরা বন্ধুত্ব করো না।

মূল ব্যাপারটি হলো, কিছু গরীব মুসলমান ইয়াহুদীদেরকে মুসলমানদের তথ্য জানিয়ে তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখত। বিনিময়ে তারা কিছু শস্য পেত। এখানে তাদেরকে এ কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।

বলা হয়, আল্লাহ তা‘আলা উক্ত সূরা একই বিষয় দিয়ে শুরু করে সে বিষয় দিয়েই শেষ করেছেন। আর তা হলো কাফেরদের বন্ধুত্ব বর্জন করা। এখানে হাতিব ইবনে আবী বালতাআ এবং অন্যদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন-

} يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا } أي لا توالوهم ولا تناصحوهم، رجع تعالى بطوله وفضله على حاطب بن أبي بلتعة

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا “হে মু’মিনগণ! তোমরা বন্ধুত্ব করো না।” অর্থাৎ, তাদের সাথে অন্তরঙ্গ হয়ো না এবং তাদের কল্যাণকামী হয়ো না। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে হাতিব ইবনে আবী বালতাআকে ক্ষমা করেছেন।” (তাফসীরে কুরতুবী, ১৮/৭৬)

খ. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, “কাফেররা সর্বদা মুসলমানদের প্রতি শত্রুতাপরায়ণ হয়ে থাকে।”

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

مَّا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَلَا الْمُشْرِكِينَ أَن يُنَزَّلَ عَلَيْكُم مِّنْ خَيْرٍ مِّن رَّبِّكُمْ  ﴿البقرة: ١٠٥﴾

আহলে-কিতাবদের মধ্যে যারা কাফের ও মুশরিকরা চায় না যে, তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি কোনো কল্যাণ অবতীর্ণ হোক।” (সূরা বাকারা: ১০৫)

وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم  ﴿البقرة: ١٠٩﴾

আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশত চায় যে, তোমরা মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে যদি কোনো রকমে কাফের বানিয়ে দিতে পারত।” (সূরা বাকারা: ১০৯)

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন-

هَا أَنتُمْ أُولَاءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتَابِ كُلِّهِ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمُ الْأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ ﴿آل‌عمران: ١١٩﴾ إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ ﴿آل‌عمران: ١٢٠﴾

দেখ, তোমরাই তাদের ভালবাসো। কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস কর; অথচ তারা যখন তোমাদের সংস্পর্শে আসে তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের উপর বিদ্বেষবশত আঙুল কামড়াতে থাকেবলুন, তোমাদের আক্রোশে তোমরাই মর। আর অন্তরে যা কিছু আছে, আল্লাহ তা ভালোই জানেন। তোমাদের যদি কোনো মঙ্গল হয়; তাহলে তা তাদেরকে কষ্ট দেয়। আর তোমাদের যদি অমঙ্গল হয়; তাহলে তারা আনন্দিত হয়। তোমরা যদি ধৈর্যশীল হও এবং মুত্তাকী হও; তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছুই করতে পারবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে, সে সমস্তই আল্লাহর আয়ত্তে রয়েছে।” (সূরা আলেইমরান: ১১৯১২০)

আল্লামা কুরতুবী রহ. বলেন,

والمعنى في الآية: أن من كانت هذه صفته من شدة العداوة والحقد والفرح بنزول الشدائد على المؤمنين لم يكن أهلاً لأن يتخذ بطانة، لاسيما في هذا الأمر الجسيم من الجهاد الذي هو ملاك الدنيا والآخرة

“আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, যার মধ্যে শত্রুতা, বিদ্বেষ, মু’মিনরা বিপদে পড়লে খুশি হওয়া- এসব থাকবে, সে কখনো অন্তরঙ্গ বন্ধু হওয়ার যোগ্য নয়। বিশেষত জিহাদের মতো এ গুরুত্বপূর্ণ কাজে, যেটি দুনিয়া-আখিরাতের খুঁটি স্বরূপ।” (তাফসীরে কুরতুবী, ৪/১৮১-১৮৩ পৃ.)

গ. তেমনিভাবে আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, “যতদিন মু’মিনগণ ঈমানের উপর থাকবেন, ততদিন তারা মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হবে না।”

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ قُلْ إِنَّ هُدَى اللَّهِ هُوَ الْهُدَىٰ وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءَهُم بَعْدَ الَّذِي جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ اللَّهِ مِن وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ ﴿البقرة: ١٢٠﴾

ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা কখনোই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রদর্শিত পথই প্রকৃত পথ। যদি আপনি তাদের আকাক্সক্ষাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে; তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী থাকবে না।” (সূরা বাকারা: ১২০)

ঘ. বরং তারা ঈমান আনার পর মু’মিনদেরকে আবার কাফের বানিয়ে ফেলতে চায়:

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تُطِيعُوا فَرِيقًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ ﴿آل‌عمران: ١٠٠﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোনো দলের আনুগত্য কর; তাহলে তোমাদের ঈমান আনার পর তারা তোমাদেরকে কাফেরে পরিণত করে ছাড়বে।” (সূরা আলেইমরান: ১০০)

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ فَتَنقَلِبُوا خَاسِرِينَ ﴿آل‌عمران: ١٤٩﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা যদি কাফেরদের আনুগত্য কর; তাহলে তারা তোমাদেরকে পেছনে ফিরিয়ে দেবে; তাতে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।” (সূরা আলেইমরান: ১৪৯)

ইবনে জারীর ত্ববারী রহ. বলেন, এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্য হলো, হে লোকসকল! যারা আল্লাহর অঙ্গীকার, তাঁর শাস্তি ও আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সত্যবাদী জেনেছ, إِن تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا “তোমরা যদি কাফেরদের আনুগত্য কর” অর্থাৎ, যেসব ইয়াহুদী ও নাসারা তোমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতকে অস্বীকার করে, তারা তোমাদেরকে যা আদেশ-নিষেধ করে; তোমরা যদি সে ক্ষেত্রে তাদের মতামতকে গ্রহণ কর এবং যে বিষয়ে তোমরা ধারণা কর যে, তারা তোমাদের কল্যাণকামী, উক্ত ব্যাপারে যদি তাদের কাছ থেকে কল্যাণ কামনা কর; তবে يَرُدُّوكُمْ عَلٰى أَعْقَابِكُمْ  “ওরা তোমাদেরকে পেছনে ফিরিয়ে দেবে” অর্থাৎ আল্লাহ বলেন, তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর মুরতাদ বানিয়ে ছাড়বে। ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহ, তাঁর নিদর্শনাবলি এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করিয়ে ছাড়বে। ফলে فَتَنقَلِبُوا خَاسِرِينَ “তাতে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে” অর্থাৎ তোমাদেরকে যে ঈমান ও দ্বীনের প্রতি আল্লাহ তাআলা পথ প্রদর্শন করেছেন, তা থেকে তোমরা সরে যাবে। خَاسِرِينَ “ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে” অর্থাৎ তোমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে, নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করেছ এবং নিজেদের দ্বীন থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছ। খুইয়েছ তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাত। এ আয়াতের মাধ্যমে মু’মিনদেরকে কাফেরদের মতের আনুগত্য করতে এবং তাদের ধর্মের কল্যাণ কামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে।” (তাফসীরে ত্ববারী, ৪/১২২-১২৩ পৃ.)

ঙ. আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসা, মু’মিনদের সাথে অন্তরঙ্গতা এবং জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর মাঝে সম্পর্ক:

মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব এবং কাফেরদের সাথে শত্রুতা পোষণের ব্যাপারে শরীয়াহর হুকুম বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মুহব্বত ও জিহাদের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক বিষয়ক শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কথাটি হুবহু উল্লেখ করাই শ্রেয় মনে করছি।

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-

واسم المحبة فيه إطلاق وعموم، فإن المؤمن يحب الله ويحب رسله وأنبياءه وعباده المؤمنين وإن كان ذلك من محبة الله، وإن كانت المحبة التي لله لا يستحقها غيره، فلهذا جاءت محبة الله مذكورة بما يختص به سبحانه من العبادة والإنابة إليه والتبتل له ونحو ذلك، فكل هذه الأسماء تتضمن محبة الله سبحانه وتعالى.

ثم إنه كان بيَّن أن محبته أصل الدين فقد بيَّن أن كمال الدين بكمالها، ونقصه بنقصها، فإن النبي صلى الله عليه وسلم قال” رأس الأمر الإسلام، وعموده الصلاة، وذروة سنامه الجهاد في سبيل الله”، فأخبر أن الجهاد ذورة سنام العمل، وهو أعلاه وأشرفه.

‘মুহব্বত শব্দটি আরবিতে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। কারণ, মু’মিন আল্লাহকে ভালোবাসে, তাঁর নবী-রাসূলগণ ও মু’মিন বান্দাদেরকে ভালোবাসে; যদিও হোক না তা আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসারই অংশ। যদিও যে ভালোবাসার হকদার আল্লাহ তা‘আলা, সেই ভালোবাসার হকদার আল্লাহ ছাড়া কেউ হতে পারে না। তাই তো যেগুলো আল্লাহর সাথে খাস বা নির্দিষ্ট সে সব স্থানে আল্লাহর ভালোবাসার কথা এসেছে। যেমন, ইবাদত, তাওবা, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা ইত্যাদি। এসব শব্দ আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসার পরিচায়ক। এরপর তিনি বলেন, আল্লাহর ভালোবাসা দ্বীনের মূলভিত্তি। এ ভালোবাসা পূর্ণ হলেই দ্বীন পূর্ণ হয়। এ ভালোবাসার অপূর্ণ হলে দ্বীন অপূর্ণ হয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

رَأْسُ الْأَمْرِ الْإِسْلَامُ، وَعَمُودُهُ الصَّلَاةُ ، وَذِرْوَةُ سَنَامِهِ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

“ইসলাম হলো শির। নামাজ হলো তার খুঁটি। আর তার সফলতার চূড়া হলো জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ।” বলা হয়েছে, কাজের শীর্ষ-চূড়া হলো জিহাদ। এটাই উত্তম ও সম্মানজনক কাজ।’

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِندَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿التوبة: ١٩﴾ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ ﴿التوبة: ٢٠﴾

তোমরা কি হাজ্বীদের পানি সরবরাহ ও মাসজিদুল হারাম রক্ষণাবেক্ষণকে সেই লোকের সমান মনে কর, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে? আল্লাহর কাছে তারা সমান নয়। আর আল্লাহ জালিম লোকদের পথপ্রদর্শন করেন না। যাঁরা ঈমান এনেছে, হিজরত করে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে; আল্লাহর কাছে তাঁরা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ আর তাঁরাই সফলকাম। তাঁদের প্রতিপালক সুসংবাদ দিচ্ছেন, স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, সেখানে আছে তাঁদের জন্য স্থায়ী শান্তি। তথায় তারা চিরদিন থাকবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে আছে মহাপুরস্কার।” (সূরা তাওবা: ১৯২০)

জিহাদ ও মুজাহিদের ফযীলত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীস অসংখ্য। এটা প্রমাণিত যে, জিহাদই বান্দার জন্য সবচেয়ে উত্তম ইবাদত। আর জিহাদই হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসার প্রমাণ। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿التوبة: ٢٣﴾ قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ ﴿التوبة: ٢٤﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পিতা ও ভাই যদি ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালোবাসে; তবে তাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না। আর তোমাদের যারা তাদের অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করে, তারা সীমালংঘনকারী। বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা- যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান- যাকে তোমরা পছন্দ কর; যদি এসব তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর রাহে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।” (সূরা তাওবা: ২৩২৪)

আল্লাহ তাঁর প্রিয় ও প্রেমিক বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ﴿المائدة: ٥٤﴾

হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরেই আল্লাহ এমন সম্প্রদায় আনবেন, যাঁদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তাঁরা তাঁকে ভালোবাসবে। তাঁরা মুমিনদের প্রতি কোমল এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে; তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।” (সূরা মায়িদা: ৫৪)

কারণ, জিহাদ করার জন্য ভালোবাসা আবশ্যক। কারণ, প্রিয়তম যা ভালোবাসে প্রেমিক তা-ই ভালোবাসে। সে তা-ই ঘৃণা করে, যা তার প্রিয়তম ঘৃণা করে। তার সাথেই বন্ধুত্ব করে, যার সাথে তার প্রিয়তম বন্ধুত্ব করে। তার সাথেই শত্রুতা পোষণ করে, যার সাথে প্রিয়তম শত্রুতা পোষণ করে। তার প্রতিই সন্তুষ্ট হয়, যার প্রতি প্রিয়তম সন্তুষ্ট হয়। তার প্রতিই রুষ্ট হয়, যার প্রতি প্রিয়তম রুষ্ট হয়। তা-ই আদেশ করে, যা প্রিয়তম আদেশ করে। তা-ই নিষেধ করে, যা প্রিয়তম নিষেধ করে। সুতরাং সে তাঁর অনুগামী হয়ে যায়।

মুজাহিদীন তাঁরাই, যাঁদের সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন। যাঁদের রুষ্টতায় আল্লাহ রুষ্ট হোন। কারণ, তাঁরাই তো আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট হোন। আবার তাঁর রুষ্টতায় রুষ্ট হোন। যেমন, সুহাইব ও বিলাল রাযি. ছিলেন। এমন একটি দলের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাযি. কে বলেছিলেন-

لَعَلَّكَ أَغْضَبْتَهُمْ لَئِنْ كُنْتَ أَغْضَبْتَهُمْ لَقَدْ أَغْضَبْتَ رَبَّكَ فَقَالَ لَهُمْ يَا إِخْوَتي هلْ أَغْضَبْتُكُمْ قَالُوا لَا يَغْفِرُ اللَّهُ لَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ

“হয়তো তুমি তাদেরকে রাগিয়ে দিয়েছ। যদি তুমি তাদেরকে রুষ্ট করে থাক; তাহলে তুমি তোমার রবকেও রুষ্ট করেছ। তিনি বললেন, ভাইয়েরা! আমি কি তোমাদেরকে রুষ্ট করেছি? তাঁরা বললেন, আবু বকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন না।”

তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আবু সুফিয়ান ইবনে হারব। তাঁরা বললেন, তলোয়ারটা জায়গা মতো পৌঁছল না। তখন আবু বকর রাযি. তাঁদেরকে বললেন, কুরাইশ সর্দারকে তোমরা এমন কথা বলছ? আবু বকর রাযি. ঘটনাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আগে বেড় না। কারণ, তাঁরা আল্লাহর জন্য রুষ্ট হয়েই এমনটি বলেছে। তাঁরা যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং তাঁদের শত্রুদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে শুধুমাত্র সেটার পূর্ণতার জন্যই এমনটি করেছে। তাই তো বিশুদ্ধ বর্ণনায় হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন-

لاَ يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا  فبي يَسْمَعُ ، وَبِيْ يُبْصِرُ ، وَبِيْ يَبْطِشُ ، وَبِيْ يَمْشِي ، وَلَئِنِ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِي عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ وَأَنَا أَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ وَلَا بُدَّ مِنْهُ

আমার বান্দা নফল কাজের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হয়, এমনকি এক সময় আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যেটা দিয়ে সে শুনতে পায়আমি তার চোখ হয়ে যাই, যেটা দিয়ে সে দেখতে পায়। আমি তার হাত হয়ে যাই, যেটা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যেটা দিয়ে সে হাঁটে। সে শুধু আমার জন্যই শোনে। আমার জন্যই দেখে। আমার জন্যই ধরে। আমার জন্যই হাঁটে। সে আমার কাছে চাইলে আমি তাকে দিই। সে আশ্রয় চাইলে আমি আশ্রয় দিই। কোনো ব্যাপারেই আমি তাঁকে ফেরত দিইনি। আমিই দিয়েছি সবকিছু। আমার মুমিন বান্দার রুহ কবজা করতে আমার ইতস্তত লাগে। সে যে মৃত্যুযন্ত্রণা অপছন্দ করে, আমিও তাকে কষ্ট দিতে চাই না। তবে তা ছাড়া যে কোনো উপায় নেই।” (আত-তুহফাতুল ইরাকিয়্যাহ, ১/৬৩-৬৪ পৃ.)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ইয়াহুদী-নাসারাদের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্কে বলেন, পার্থিব বিষয়াদিতে সাদৃশ্য থাকলে ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সুতরাং ধর্মীয় বিষয়াদিতে সাদৃশ্য থাকলে কী পরিণাম হবে?? কারণ, তা-ই গভীর থেকে গভীরতর বন্ধুত্বের দিকে নিয়ে যায়।

আর তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা ঈমানের বিপরীত। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿المائدة: ٥١﴾ فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَىٰ أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا أَسَرُّوا فِي أَنفُسِهِمْ نَادِمِينَ ﴿المائدة: ٥٢﴾ وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَاسِرِينَ ﴿المائدة: ٥٣﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে; সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না। বস্তুত যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন; ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য অনুতপ্ত হবে। মুমিনরা বলবে, এরাই কি সে সব লোক, যারা আল্লাহর নামে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করত যে, আমরা তোমাদের সাথেই আছি? তাদের কৃতকর্মসমূহ নষ্ট হয়ে গেছে; ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে।” (সূরা মায়িদা: ৫১-৫৩)

আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাবের দুর্নাম করে বলেছেন-

لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَىٰ لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَٰلِكَ بِمَا عَصَوا وَّكَانُوا يَعْتَدُونَ ﴿المائدة: ٧٨﴾ كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ ﴿المائدة: ٧٩﴾ تَرَىٰ كَثِيرًا مِّنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنفُسُهُمْ أَن سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ ﴿المائدة: ٨٠﴾ وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَٰكِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ ﴿المائدة: ٨١﴾

বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা ছিল অবাধ্য এবং সীমালঙ্ঘনকারী। তারা যেসব মন্দ কাজ করত, পরস্পরকে সে সব মন্দ কাজে নিষেধ করত না। তারা যা করত, তা কতই না নিকৃষ্ট ছিল। আপনি তাদের অনেককে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন। কত নিকৃষ্ট তাদের কৃতকর্ম। যে কারণে তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল শাস্তিভোগ করতে থাকবে। যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও নবীর প্রতি এবং তাঁর উপর অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত; তবে কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচার।” (সূরা মায়িদা: ৭৮-৮১)

আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, আল্লাহর প্রতি, নবীর প্রতি এবং তাঁর উপর অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি ঈমান আনার জন্য তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ আবশ্যক। সুতরাং তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা আল্লাহর প্রতি ঈমান না থাকাই প্রমাণ করে। কারণ লাযেমের অনুপস্থিতি মালযুমের অনুপস্থিতিকে প্রমাণ করে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন-

لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَٰئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ  ﴿المجادلة: ٢٢﴾

যাঁরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাঁদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না; যদিও তারা তাঁদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাঁদের অন্তরে আল্লাহ ঈমানকে সুদৃঢ় করে দিয়েছেন এবং তাঁদেরকে তাঁর পক্ষ হতে রূহ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন।” (সূরা মুজাদালা: ২২)

আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন, এমন কোনো মুমিন নেই, যে কোনো কাফেরের সাথে বন্ধুত্ব করে। সুতরাং যে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে, সে মুমিন নয়। আর বাহ্যিক সাদৃশ্য থেকেই বন্ধুত্বের অনুমান করা যায়। তাই তাও হারাম হবে। যে সম্পর্কে পূর্বে আলোচিত হয়েছে।” (ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ১/২২১-২২২ পৃ.)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. আরও বলেন, মু’মিনের উপর কর্তব্য হলো: আল্লাহর জন্য শত্রুতা করা এবং আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব করা। মু’মিনকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতেই হবে; যদিও সে তাকে অত্যাচার করুক। কারণ, অত্যাচার ঈমানী বন্ধন ছিন্ন করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الحجرات: ٩﴾ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ﴿الحجرات: ١٠﴾

যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে; তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। আর তাদের একদল যদি অপর দলের উপর চড়াও হয়; তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে; তবে তাদের মধ্যে ন্যায়সম্মত পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং সুবিচার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন। মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে-যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও” (সূরা হুজুরাত: ৯-১০)

পারস্পরিক যুদ্ধ-বিদ্রোহ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ভাই আখ্যা দিচ্ছেন এবং সংশোধন করার আদেশ দিচ্ছেন।

এ দু’টি প্রকারের পার্থক্য প্রত্যেক মু’মিনকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। অনেকেই এ দু’টি প্রকারে একটিকে অন্যটির সাথে ঘুলিয়ে ফেলেন। আরও জানতে হবে যে, মুমিন জুলুম-অত্যাচার করলেও তার সাথে বন্ধুত্ব আবশ্যক। আর কাফের দয়া-দাক্ষিণ্য করলেও তার সাথে শত্রুতা আবশ্যক। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছেন; যাতে দ্বীন পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। অতএব, তাঁর বন্ধুদেরকে ভালোবাসতে হবে এবং তাঁর শত্রুদের সাথে শত্রুতা পোষণ করতে হবে। তাঁর বন্ধুদেরকে সম্মানিত করতে হবে এবং শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত করতে হবে। তাঁর বন্ধুদেরকে পুরস্কৃত করতে হবে এবং শত্রুদেরকে শাস্তি দিতে হবে।

একই ব্যক্তির মাঝে যদি ভালো-মন্দ, আনুগত্য-অবাধ্যতা, সুন্নাত-বিদআতের সন্নিবেশ ঘটে, সে তার ভালো কাজের পরিমাণে বন্ধুত্ব ও পুরস্কারের অধিকারী হবে। আর মন্দ কাজের পরিমাণে শাস্তি ও শত্রুতা প্রাপ্ত হবে। সুতরাং একই ব্যক্তির মাঝে সম্মান ও অপমান দু’টোর কারণ পাওয়া যেতে পারে; ফলে তার পরিণামও দুই ধরনের হবে। যেমন, অসহায় চোরের হাত কাটা হবে চুরি করার অপরাধে এবং অসহায়ত্বের কারণে তাকে বায়তুল মাল থেকে প্রয়োজন মতো ভরণ পোষণ দেওয়া হবে। এটি এমন এক নীতি, যার উপর আহলুস সুন্নাহর সমস্ত আলেম একমত।” (মাজমূউল ফাতাওয়া, ২৮/২০৭-২০৯ পৃ.)

চ. একটি সংশয়:

যদি বলা হয়, আল্লাহর বাণী:

لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الممتحنة: ٨﴾

দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনা: ০৮)

এই আয়াতের ব্যাখ্যা কী হবে? এটি কি কাফেরদের সাথে ভালোবাসা ও তাদের বন্ধুত্ব গ্রহণকে প্রমাণ করে না??

সংশয় নিরসন:

আরবি البر  শব্দের অর্থ কল্যাণ পৌঁছানো। আর القسط শব্দের অর্থ ন্যায়পরায়ণতা। এ দু’টি সেই হারাম বন্ধুত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়; যাতে রয়েছে ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতা, কথা-কাজে সাহায্য করা, বিশ্বাস-কর্মে অনুসরণ করা, গোপন বিষয়ে কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা এবং মুসলমানদের গোপন তথ্য তাদের কাছে ফাঁস করে দেওয়া থেকে নিষিদ্ধতা।

এ আয়াত সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الممتحنة: ٨﴾ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَىٰ إِخْرَاجِكُمْ أَن تَوَلَّوْهُمْ وَمَن يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿الممتحنة: ٩﴾

“ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেছে এবং বহিস্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালেম।” (সূরা মুমতাহিনা: ৮-৯)

বলা হয়ে থাকে, (আল্লাহই অধিক জ্ঞাত) কিছু মুসলমান মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক রাখা থেকে বিরত থাকলেন। সম্ভবত, জিহাদ ফরয হওয়ার হুকুম নাযিল হওয়ার পর এমনটি হয়েছিল। তারা পরস্পরের মধ্যকার বন্ধুত্ব ছিন্ন করল। আরও অবতীর্ণ হলো-

لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَٰئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَٰئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿المجادلة: ٢٢﴾

যাঁরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাঁদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাঁদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাঁদের অন্তরে আল্লাহ ঈমানকে সুদৃঢ় করে দিয়েছেন এবং তাঁদেরকে তাঁর পক্ষ হতে রূহ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। তিনি তাঁদেরকে জান্নাতে দাখিল করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তাঁরা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তাঁরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।” (সূরা মুজাদালা: ২২)

তাঁরা ভয় করলেন যে, অর্থনৈতিক সম্পর্কও বন্ধুত্বের মধ্যে পড়ে কিনা? তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন-

لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الممتحنة: ٨﴾ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَىٰ إِخْرَاجِكُمْ أَن تَوَلَّوْهُمْ وَمَن يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿الممتحنة: ٩﴾

ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেছে এবং বহিস্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালেম।” (সূরা মুমতাহিনা: ৮-৯)

ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, অর্থনৈতিক, মানবিক, ন্যায়সম্মত, ভদ্রতাপূর্ণ ও আল্লাহর হুকুম পৌঁছানোর সম্পর্ক কাফেরদের সাথে ছিল। তবে মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে যাদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা হয়েছিল। মুশরিকদের মধ্য থেকে যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ করে না, তাদের সাথে মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যারা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদের সাথেও এ মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ সম্পর্ক হারাম করা হয়নি; বরং বলা হয়েছে, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে। বন্ধুত্ব আর মানবিক- ন্যায়নিষ্ঠ সম্পর্ক এক নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের কিছু বন্দীকে মুক্তিপণ নেওয়া ব্যতীতই ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের মাঝে একজন ছিল আবু ইজ্জাহ আল-জুমাহী। এ ব্যক্তি রাসূলের প্রতি শত্রুতা ও ঘৃণা ছড়ানোতে বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। বদরের পরে আবার ছুমামা ইবনে উছালের প্রতি তিনি অনুগ্রহ করলেন। যিনি তাঁর শত্রুতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। প্রথমে তাকে হত্যার হুকুম দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে গ্রেফতার হওয়ার পর অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন ছুমামা মুসলমান হয়ে যান। তিনি সরবরাহ পথে কুরাইশদের রসদ আটকে দিলেন। কুরাইশগণ রসদ ছাড়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুমতি প্রার্থনা করল। তিনি অনুমতি দিলেন এবং তারা নিরাপদে রসদ নিয়ে গেল।

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন-

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا ﴿الانسان: ٨﴾

তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে” (সূরা দাহর: ০৮)

সূত্র: ইমাম শাফেয়ী রহ. প্রণিত আহকামুল কুরআন, ২/১৯১-১৯৪)

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. স্পষ্টভাবে বলেছেন, দরিদ্র জিম্মিদেরকে ওয়াকফ ও নফল সাদাকাহ দেওয়া বৈধ। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الممتحنة: ٨﴾ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَىٰ إِخْرَاجِكُمْ أَن تَوَلَّوْهُمْ وَمَن يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿الممتحنة: ٩﴾

ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেছে এবং বহিস্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালেম।” (সূরা মুমতাহিনা: ৮-৯)

আল্লাহ তা‘আলা যখন সূরার প্রথমাংশে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব এবং অন্তরঙ্গ সম্পর্ক করা থেকে মুসলমানদেরকে নিষেধ করেছেন; ফলে তাদের মধ্যকার ভালোবাসা ছিন্ন হয়ে গেল। অনেকেই মনে করেছেন যে, তাদের সাথে মানবিক আচরণ করা এবং অনুগ্রহ করাও বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এটি নিষিদ্ধ বন্ধুত্বের মধ্যে পড়ে না। এটি থেকে নিষেধও করা হয়নি; বরং এটি ভালো কাজ, যা আল্লাহ ভালোবাসেন এবং যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন। তার জন্য নেকী লেখেন। আর তাদের সাথে হৃদ্যতা ও অন্তরঙ্গতাকে নিষেধ করা হয়েছে।” (আহকামু আহলিজ-জিম্মাহ, ১/৬০২)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন, আল্লাহর বাণী-

لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ

“ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি” অর্থাৎ যেসব কাফের দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছে না। وَلَمْ يُظَاهِرُوا এবং যারা তোমাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেনি অর্থাৎ তোমাদেরকে দেশান্তর করতে সাহায্য করেনি। যেমন তাদের মহিলা ও অসহায়রা। أَن تَبَرُّوهُمْ তাদের প্রতি সদাচরণ করা অর্থাৎ তাদের প্রতি সদয় আচরণে নিষেধ নেই। وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ইনসাফ করা অর্থাৎ তাদের প্রতি ন্যায়বান হতে নিষেধ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বানদেরকে ভালোবাসেন।

ইমাম আহমাদ রহ. (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ৬৩৪৫) বলেন, হিশাম বিন উরওয়া ফাতেমা বিনতুল মুনজির থেকে, তিনি আসমা বিনতে আবি বকর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, “কুরাইশদের সাথে যখন চুক্তি হয়, তখন আমার মুশরিক মা আমার কাছে এলেন। আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে গিয়ে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা এসেছেন আর তিনি ইসলামের প্রতি বিরাগভাজন। আমি কি তার সাথে সম্পর্ক রাখব? তিনি বললেন- হ্যাঁ, তোমার মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫২১৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২১৩০)

সূত্র: তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪/৩৫১-৩৫২ পৃ.)

০৩. তাদেরকে ঘনিষ্ঠ বানানো এবং মুসলমানদের গোপন তথ্য ফাঁস করা থেকে নিষেধাজ্ঞা:

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ ﴿آل‌عمران: ١١٨﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোনো ক্রটি করে না; তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখ থেকেই প্রকাশিত হয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরও অনেক বেশি জঘন্য। তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করে দেওয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও।” (সূরা আলেইমরান: ১১৮)

আল্লামা কুরতুবী রহ. বলেন, البطانة শব্দটি মাসদার। একবচন ও বহুবচন দু’টোর জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থ হলো, মানুষের এমন সব ঘনিষ্ঠজন; যারা তার কথা গোপন রাখে। আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে কাফের, ইয়াহুদী ও প্রবৃত্তিপূজারিদেরকে এমন অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুপ্রবেশকারী বানানো থেকে নিষেধ করেছেন, যাদেরকে পরামর্শে শরীক করা হয়, নিজেদের ধন-সম্পদ তাদের নিকট গচ্ছিত রাখা হয়। বলা হয়, যে ব্যক্তি তোমার দ্বীন ও নীতিবিরোধী তার সাথে কোনো কথা ভাগাভাগি করতে নেই। কবি বলেন-

عن المرء لاتسأل وسل عن قرينه    فكل قرين بالمقارن يقتدى

ব্যক্তি সম্পর্কে নয়; বরং তার বন্ধু সম্পর্কে শোধাও।

প্রত্যেক বন্ধু তার বন্ধুরই অনুগামী হয়।

সুনানে আবু দাউদে আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلْ.

মানুষ তার বন্ধুর নীতির উপর থাকেসুতরাং দেখ, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং৪৮৩৫)

ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- اعْتَبِرُوا النَّاسَ بِإِخْوَانِهِمْ “মানুষকে তার বন্ধু দেখে মাপ।” এরপরে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বলার কারণ আল্লাহ তা‘আলা এভাবে বর্ণনা করছেন, لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا “তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোনো ত্রুটি করবে না।” অর্থাৎ তোমাদেরকে ফাসাদে না ফেলে ছাড়বে না। তারা বাহ্যত যদিও তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে, তোমাদেরকে ধোঁকা-প্রতারণায় ফেলতে চেষ্টার কমতি করবে না। وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ তোমরা কষ্টে থাক; তাতেই তাদের আনন্দ। এটি মাসদারিয়্যাহ। অর্থাৎ, তারা তোমাদের কষ্ট চায়। যা তোমাদের কষ্ট দেয়। আর العنت অর্থ কষ্ট।” (তাফসীরে কুরতুবী, ৪/১৭৮-১৮১)

০৪. গুরুত্বপূর্ণ পদে কাফেরদেরকে বসানো থেকে নিষেধাজ্ঞা:

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-

فروى الإمام أحمد بإسناد صحيح عن أبي موسى الأشعري رضي الله عنه قال: قلت لعمر رضي الله عنه: إن لي كاتبا نصرانياً ، قال: “مالك قاتلك الله، أما سمعت الله يقول: { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصارٰى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ} ألا اتخذت حنيفاً” قال: قلت يا أمير المؤمنين لي كتابته وله دينه، قال: “لا أكرمهم إذ أهانهم الله، ولا أعزهم إذ أذلهم الله، ولا أدنيهم إذ أقصاهم الله

‘ইমাম আহমাদ রহ. বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করেন, আবু মুসা আশআরী রাযি. বলেন, “আমি উমর রাযি.কে বললাম, আমার একজন খ্রিস্টান কেরাণী আছে। উমর রাযি. বললেন, আল্লাহ তোমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিন। কেন? আল্লাহ তা‘আলা কি কুরআন মাজীদে বলেননি?-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصارٰى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ

“হে মু’মিনগণ, তোমরা ইয়াহুদী-খ্রিস্টানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না। তারা পরস্পর বন্ধু।” তবুও তুমি কি তাকে বন্ধু বানিয়েছ? আমি বললাম, আমীরুল মুমিনীন! তার লেখালেখি আমার জন্য আর তার ধর্ম তার জন্য। তিনি বললেন, আল্লাহ যখন তাদেরকে অপমানিত করেছেন, আমি তাদেরকে সম্মান দেব না। আল্লাহ যখন তাদেরকে লাঞ্ছিত করেছেন, আমি তাদেরকে মর্যাদা দেব না। আল্লাহ যখন তাদেরকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন, আমি তাদেরকে কাছে টানব না।” (ইকতিজাউস সিরাতিল ‍মুস্তাকীম, ১/৫০)

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন-

وعن عمر رضي الله عنه قال: “لا تستعملوا أهل الكتاب فإنهم يستحلون الرشا، واستعينوا على أموركم وعلى رعيتكم بالذين يخشون الله تعالى” ، وقيل لعمر رضي الله عنه: إن ههنا رجلا من نصارى الحيرة لا أحد أكتب منه ولا أخط بقلم، أفلا يكتب عنك؟ فقال: “لا آخذ بطانة من دون المؤمنين”. فلا يجوز استكتاب أهل الذمة ولا غير ذلك من تصرفاتهم في البيع والشراء والاستنابة إليهم.

قلت: وقد انقلبت الأحوال في هذه الأزمان باتخاذ أهل الكتاب كتبة وأمناء، وتسودوا بذلك عند الجهلة الأغبياء من الولاة والأمراء.

“উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো আহলে কিতাবকে (ইয়াহুদী-নাসারা) সরকারি পদে বসাবে না। কারণ, তারা ঘুষকে বৈধ মনে করে। তোমরা তাদেরকে নিজেদের এবং জনকল্যাণমুখী কাজে বসাও, যারা আল্লাহকে ভয় করে। উমর রাযি.কে বলা হলো, এখানে হীরার জনৈক খ্রিস্টান আছে। সে লেখালেখি ও কলম চালনায় বেশ পারঙ্গম। সে কি আপনার লেখার কাজ করতে পারে না? তিনি বললেন, আমি কোনো অমুসলিমকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করব না। সুতরাং জিম্মিকে কেরাণী পদে নিয়োগ দেওয়া কিংবা ব্যবসায়ের পরিচালক ও অফিসার পদে নিয়োগ দেওয়া জায়েয নেই।

আমি বলি, এ যুগে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। আহলে কিতাবকে রেজিস্টার ও আমানতদার বানানো হচ্ছে। এ কারণে একদল মূর্খ গবেটের নিকট তারা নেতৃত্বদানকারী ও অভিভাবকে পরিণত হচ্ছে।” (তাফসীরে কুরতুবী, ৪/১৭৯)

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, জিম্মিকে প্রশাসনিক বা রেজিস্টারি দায়িত্বে রাখা যাবে না। কারণ, তাতে সমস্যা হতে পারে অথবা সমস্যার পথ তরান্বিত হতে পারে। আবু তালিবের একটি বর্ণনায় জানা যায়, ইমাম আহমাদ রহ. কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, খারাজ উসুল করার দায়িত্বে কি বসানো যাবে? তিনি বললেন, না। কোনো ব্যাপারেই তাদের মদদ নেওয়া হবে না। তাদের কেউ যদি কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পায়, তার চুক্তি কি ভেঙে যাবে? যার কর্মকাণ্ডে মুসলমানরা কষ্ট পায় বা যে কোনো ধরনের দুর্নীতি করে তাকে দায়িত্ব দেওয়া জায়েয নেই। তাহলে অন্যদেরকে তো আরও অধিকভাবে দায়িত্ব দেওয়া জায়েয হবে না। কারণ, আবু বকর রাযি. অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তিনি কোনো মুরতাদকে সরকারি পদে নিয়োগ দেবেন না; যদিও তারা ইসলামে ফিরে আসুক। কারণ, তাদের দ্বীনদারী নিয়ে আশঙ্কা আছে।” (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, আল-ইখতিয়ারাতুল ইলমিয়্যাহ, কিতাবুল জিহাদ, ৪/৬০৭)

০৫. কাফেরদের নিদর্শন ও কুসংস্কারসমূহকে সম্মান জানানো, কাফের-মুরতাদদের সাথে তাদের ভ্রষ্টতায় একমত পোষণ করা এবং সেগুলোর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা:

 

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-

فصل فى الولاية والعداوة؛ فإن المؤمنين أولياء الله، وبعضهم أولياء بعض، والكفار أعداء الله وأعداء المؤمنين، وقد أوجب الموالاة   بين المؤمنين وبين أن ذلك من لوازم الإيمان، ونهى عن موالاة الكفار، وبين أن ذلك منتف فى حق المؤمنين وبين حال المنافقين فى موالاة الكافرين.

وقال: (إن الذين ارتدوا على أدبارهم من بعد ما تبين لهم الهدى الشيطان سول لهم وأملى لهم، ذلك بأنهم قالوا للذين كرهوا ما نزل الله سنطيعكم فى بعض الأمر والله يعلم إسرارهم)، وتبين أن موالاة الكفار كانت سبب ارتدادهم على أدبارهم.

ولهذا ذكر فى سورة المائدة أئمة المرتدين عقب النهى عن موالاة الكفار؛ قوله : {ومن يتولهم منكم فإنه منهم} ، وقال : {يا أيها الرسول لا يحزنك الذين يسارعون فى الكفر من الذين قالوا آمنا بأفواهم ولم تؤمن قلوبهم ومن الذين هادوا سماعون للكذب سماعون لقوم آخرين لم يأتوك يحرفون الكلم من بعد مواضعه يقولون إن أوتيتم هذا فخذوه وإن لم تؤتوه فاحذروا}، فذكر المنافقين والكفار المهادنين، وأخبر أنهم يسمعون لقوم آخرين لم يأتوك وهو استماع المنافقين والكفار المهادنين للكفار المعلنين الذين لم يهادنوا.

كما أن فى المؤمنين من قد يكون سماعاً للمنافقين، كما قال: {وفيكم سماعون لهم}، وبعض الناس يظن أن المعنى سماعون لأجلهم بمنزلة الجاسوس أى يسمعون ما يقول وينقلونه اليهم.

وإنما المعنى فيكم من يسمع لهم أى يستجيب لهم ويتبعهم، كما فى قوله سمع الله لمن حمده استجاب الله لمن حمده أى قبل منه، يقال فلان يسمع لفلان أى يستجيب له ويطيعه.

فمن كان من الأمة موالياً للكفار من المشركين أو أهل الكتاب ببعض أنواع الموالاة ونحوها -مثل إتيانه أهل الباطل واتباعهم فى شئ من مقالهم وفعالهم الباطل- كان له من الذم والعقاب والنفاق بحسب ذلك.

والله تعالى يحب تمييز الخبيث من الطيب والحق من الباطل، فيعرف أن هؤلاء الأصناف منافقون أو فيهم نفاق، وإن كانوا مع المسلمين، فإن كون الرجل مسلماً فى الظاهر لا يمنع أن يكون منافقاً فى الباطن.

فإن المنافقين كلهم مسلمون فى الظاهر، والقرآن قد بين صفاتهم وأحكامهم، واذا كانوا موجودين على عهد رسول الله -صلى الله عليه وسلم- وفى عزة الاسلام مع ظهور أعلام النبوة ونور الرسالة، فهم مع بعدهم عنهما أشد وجوداً، لاسيما وسبب النفاق هو سبب الكفر وهو المعارض لما جاءت به الرسل.

“বন্ধুত্ব ও শত্রুতা অধ্যায়: মু’মিনগণ আল্লাহর বন্ধু। তারা পরস্পরের বন্ধু। আর কাফেররা আল্লাহরও শত্রু, মু’মিনদেরও শত্রু। মু’মিনদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধুত্ব আবশ্যক। এটি ঈমানের আবশ্যকীয় শর্ত। কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ। মুমিনদের মাঝে এটি পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে, মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থাই হলো কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব।

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَىٰ أَدْبَارِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَىٰ لَهُمْ ﴿محمد: ٢٥﴾ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لِلَّذِينَ كَرِهُوا مَا نَزَّلَ اللَّهُ سَنُطِيعُكُمْ فِي بَعْضِ الْأَمْرِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِسْرَارَهُمْ ﴿محمد: ٢٦﴾

 নিশ্চয়ই যারা তাদের নিকট সৎপথ ব্যক্ত হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এজন্য যে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে; তারা তাদেরকে বলে, আমরা কোনো কোনো ব্যাপারে তোমাদের কথা মান্য করব। আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি অবগত আছেন।” (সূরা ‍মুহাম্মাদ: ২৫২৬)

এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করা তাদের পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে মুরতাদ হওয়ার কারণ ছিল।

তাই সূরা মায়েদায় কাফেরদের সাথে বন্ধুত্বে নিষেধাজ্ঞার পর মুরতাদ সর্দারদের আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ﴿المائدة: ٥١﴾

তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।”(সূরা মায়িদা: ৫১)

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَٰذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا  ﴿المائدة: ٤١﴾

হে রাসূল! তাদের জন্য দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে, আমরা মুমিন; অথচ তারা অন্তরে ঈমান আনেনি এবং যারা ইয়াহুদী, মিথ্যা বলার জন্য তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্য দলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও; তবে কবুল করে নিও এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো”(সূরা মায়িদা: ৪১)

এরপর মুনাফিক ও চুক্তিবদ্ধ কাফেরদের আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা অন্যদের কথা শোনে। আপনার কাছে আসে না। অর্থাৎ, মুনাফিক ও চুক্তিবদ্ধ কাফেররা চুক্তির বাহিরে গিয়ে প্রকাশ্য কাফেরদের কথা মান্য করে।

যেমন, মু’মিনদের মধ্যে অনেকেই মাঝে মধ্যে মুনাফিকদের কথা শোনে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ ﴿التوبة: ٤٧﴾

আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের অনুগতরা।” (সূরা তাওবা: ৪৭)

অনেকে মনে করেন, এখানে سَمَّاعُونَ অর্থ গুপ্তচর। যে শোনে এবং তাদের কাছে বলে দেয়।

বরং সঠিক অর্থ হলো, তোমাদের মাঝে তাদের কথা শ্রবণকারী আছে। অর্থাৎ, তাদের ডাকে সাড়া দেয় এবং আনুগত্য করে। যেমন, سمع الله لمن حمده  বাক্যে سمع শব্দের অর্থ সাড়াপ্রদান। যে আল্লাহর প্রশংসা করে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। অর্থাৎ তার দুআ কবুল করেন।

আরবিতে বলা হয়, فلان يسمع لفلان أى يستجيب له ويطيعه অর্থাৎ, অমুক অমুকের কথা শোনে। তথা তার ডাকে সাড়া দেয় এবং আনুগত্য করে।

সুতরাং মুসলমানদের কেউ যদি কাফের-মুশরিকদের বন্ধু হয়, বন্ধুত্বের ধরন যা-ই হোক না কেন, (যেমন বাতিলের কাছে আসা এবং তাদের বাতিল কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডে আনুগত্য করা) সে সে-মতে শাস্তি, তিরস্কার ও মুনাফেকীর অধিকারী হবে।

আল্লাহ তা‘আলা ভালোকে মন্দ থেকে পৃথক করতে চান, হক্বকে বাতিল থেকে পৃথক করতে চান। যদিও এসব লোক মুসলমানদের সাথে থাকুক, এরা মুনাফিক হিসেবে চিহ্নিত হবে অথবা বুঝা যাবে তাদের মাঝে নিফাক রয়েছে। কারণ, কেউ বাহিরে মুসলমান হলেও অভ্যন্তরীণভাবে মুনাফিক হতে কোনো বাধা নেই।

কারণ, সমস্ত মুনাফিকই বাহ্যত মুসলমান হয়ে থাকে। কুরআন মাজীদ তাদের বৈশিষ্ট্য ও বিধান বলে দিয়েছে। যদি রাসূলের যুগে, নবুওয়াতের নিদর্শনাদি এবং রিসালাতের আলো প্রকাশিত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ইসলামের বিজয়ের সময়ে মুনাফিক থাকতে পারে, এর পরের যুগে তো এদের অস্তিত্ব আরও বাড়বে। বিশেষত, নিফাকের যে কারণ কুফরের একই কারণ। তা হলো, রাসূলগণ যা এনেছেন তার বিরোধিতা করা।” (মাজমূউল ফাতাওয়া, ২৮/১৯০-২০২ পৃ.)

০৬. মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা:

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿المائدة: ٥١﴾ فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَىٰ أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا أَسَرُّوا فِي أَنفُسِهِمْ نَادِمِينَ ﴿المائدة: ٥٢﴾ وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَاسِرِينَ ﴿المائدة: ٥٣﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে; সে তাদেরই অন্তর্ভুক্তনিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না। বস্তুত যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, আপনি তাদেরকে দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন; ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য অনুতপ্ত হবে। মুমিনগণ বলবে, এরাই কি সে সব লোক, যারা আল্লাহর নামে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করত যে, আমরা তোমাদের সাথেই আছি? তাদের কৃতকর্মসমূহ নষ্ট হয়ে গেছে; ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে।” (সূরা মায়িদা: ৫১৫৩)

এ আয়াতের শানে নুযুলের ব্যাপারে ইমাম ত্ববারী রহ. বলেন-

والصواب من القول في ذلك عندنا أن يقال إن الله -تعالى ذكره- نهى المؤمنين جميعاً أن يتخذوا اليهود والنصارى أنصاراً وحلفاءً على أهل الإيمان بالله ورسوله، وأخبر أنه من اتخذهم نصيراً وحليفاً وولياً من دون الله ورسوله والمؤمنين فإنه منهم في التحزب على الله وعلى رسوله والمؤمنين، وأن الله ورسوله منه بريئان.

“আমাদের মতে, এ ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত মু’মিনকে নিষেধ করেছেন, তারা যেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে ইয়াহুদী-নাসারাদেরকে সাহায্যকারী ও মিত্র না বানায়। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ, রাসূল ও মুমিনদেরকে বাদ দিয়ে তাদেরকে মিত্র ও সাহায্যকারী বানাবে; সে আল্লাহ, রাসূল ও মুমিনদের বিরোধী শিবিরের লোক। আর আল্লাহ ও রাসূল তার থেকে মুক্ত” (তাফসীরে ত্ববারী, ৬/২৮৬)

ইবনে তাইমিয়া রহ. তাতারদের ব্যাপারে বলেন, যে সব সামরিক ব্যক্তিবর্গ তাদের সাথে যোগ দেবে, তারা তাদেরই বিধানের অন্তর্ভুক্ত হবে। ইসলামী শরীয়াহ থেকে যতটুকু তারা ফিরে গেছে, এর মাধ্যমেই তাদের মাঝে ইসলামী শরীয়াহ থেকে রিদ্দাহ সাব্যস্ত হয়েছে। সালাফগণ যদি যাকাত অস্বীকারকারীদেরকে মুরতাদ ঘোষণা করতে পারেন; অথচ তারা রোজা রাখত, নামাজ পড়ত, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করত না। তো যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুসলমানদেরকে হত্যা করে তাদেরকে কী বলা হবে??? (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ৪/৩৩২)

ইবনে হাযম রহ. বলেন,

وقد علمنا أن من خرج عن دار الإسلام إلى دار الحرب فقد أبق عن الله تعالى وعن إمام المسلمين وجماعتهم، ويبين هذا حديثه صلى الله عليه وسلم أنه: “أَنَا بريء من كل مسلم يقيم بين أظهر المشركين”، وهو عليه السلام لا يبرأ إلا من كافر، قال الله تعالى: {والمؤمنون والمؤمنات بعضهم أولياء بعض{

‘আমরা জানি- যে ব্যক্তি দারুল ইসলাম ত্যাগ করে দারুল কুফরে চলে গেল, সে আল্লাহ তা‘আলা, মুসলমানদের আমীর ও তাদের জামাআত থেকে পালিয়ে গেল। এ হুকুমটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী থেকে প্রমাণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ. 

“প্রত্যেক ঐ মুসলমান থেকে আমি মুক্ত-পবিত্র, যে মুশরিকদের সাথে বসবাস করে।” আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কাফের ছাড়া অন্য কারো ব্যাপারে দায়িত্ব মুক্ত নন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ﴿التوبة: ٧١﴾

মুমিন নর-নারীগণ একে অপরের বন্ধু।’ (সূরা তাওবা: ৭১)

আবু মুহাম্মাদ রহ. বলেন-

فصح بهذا أن من لحق بدار الكفر والحرب مختاراً محارباً لمن يليه من المسلمين فهو بهذا الفعل مرتد، له أحكام المرتد كلها من وجوب القتل عليه متى قدر عليه ومن إباحة ماله وانفساخ نكاحه وغير ذلك، لأن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يبرأ من مسلم.

وكذلك من سكن بأرض الهند والسند والصين والترك والسودان والروم من المسلمين، فإن كان لا يقدر على الخروج من هنالك لثقل ظهر أو لقلة مال أو لضعف جسم أو لامتناع طريق فهو معذور، فإن كان هناك محارباً للمسلمين معيناً للكفار بخدمة أو كتابة فهو كافر.

ولو أن كافراً مجاهداً غلب على دار من دور الإسلام، وأقر المسلمين بها على حالهم، إلا أنه هو المالك لها المنفرد بنفسه في ضبطها وهو معلن بدين غير دين الإسلام لكفربالبقاء معه كل من عاونه وأقام معه وإن ادعى أنه مسلم لما ذكرنا.

“সুতরাং এ কথা প্রমাণিত যে, যে ব্যক্তি নিকটবর্তী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্বেচ্ছায় দারুল কুফরে যোদ্ধা হিসেবে চলে যায়, সে তার এই অপরাধের কারণে মুরতাদ হয়ে যায়। তার উপর মুরতাদের সব হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেমন, গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে তাকে হত্যা করা, তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো মুসলমান থেকে দায়িত্ব মুক্তির ঘোষণা করেননি।

তেমনি যেসব মুসলমান ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, তুরস্ক, সুদান, ইতালি ইত্যাদি রাষ্ট্রে বসবাস করে, সে যদি বৃদ্ধ হওয়া বা দরিদ্র হওয়া বা অসুস্থতা বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি কারণে চলে আসতে সক্ষম না হয়, তাকে মাযুর বা অক্ষম হিসেবে গণ্য করা হবে। সে যদি সেখানে কাফেরদেরকে খেদমত, লেখালেখি ইত্যাদির মাধ্যমে মদদ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সেও কাফের বলে গণ্য হবে।

কোনো প্রকাশ্য কাফের যদি দারুল ইসলামের কোনো এলাকা দখল করে নেয় এবং মুসলমানদেরকে তাদের আপন অবস্থায় বহাল রাখে, সে উক্ত এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি বনে বসে এবং নিজেকে অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করে; তাহলে তাতে অবস্থানকারী যারাই তাকে সাহায্য করবে এবং তার সাথে থাকবে, সে কাফের হিসেবে গণ্য হবে; যদিও সে নিজকে মুসলমান দাবি করুক।” (আল-মুহাল্লাহ, ১১/১৯৯-২০০ পৃ.)

(মূল আরবিতে كافراً مجاهداً বলা হয়েছে। সম্ভবত লেখা বিকৃত হয়ে গেছে বা মুদ্রণ প্রমাদ ঘটেছে, আল্লাহু আলাম। এখানে كافراً مجاهراً ই শুদ্ধ।)

এবার চিন্তা করুন, ইরাকী মুসলমানদেরকে মারার জন্য আমেরিকা ও তার মিত্রদের জঙ্গীবিমান ও সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে চলাচল করে। এমনটা যদি ইমাম ত্ববারী, ইবনে হাযম ও ইবনে তাইমিয়া রহ. প্রত্যক্ষ করতেন; তবে তাঁরা এ ব্যাপারে কী ফতোয়া দিতেন?

তাঁরা যদি আমেরিকার সে সব জঙ্গীবিমান দেখতেন, যেগুলো আফগানিস্তানের মুসলমানদেরকে হত্যা করার জন্য পাকিস্তান থেকে উড়ে যায়; তবে তাঁরা কী ফতোয়া জারি করতেন?

তাঁরা যদি পশ্চিমা সে সব জাহাজ, রণতরী ও জঙ্গীবিমান দেখতেন, যা ইসরাইলকে নিরাপত্তা দিতে, জাযিরাতুল আরবে জবরদখল করতে এবং ইরাক অবরোধ করতে মধ্যপ্রাচ্য, ইয়েমেন ও মিশর হয়ে জ্বালানী, রসদ ও খনিজ লুট করে, এ ব্যাপারে তারা কী ফতোয়া দিতেন?

তাঁরা যদি দেখতেন, আমাদের শাসকগোষ্ঠীর পরম বন্ধু আমেরিকার অস্ত্রে ফিলিস্তিনী মুসলমানগণ সপরিবারে নিজ বাড়িতে নিহত হোন; তাহলে তারা কী বলতেন???

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সাথে মিলে মার্কিন জঙ্গীবিমানগুলির মুজাহিদদের উপর মুহুর্মুহু বিমান হামলা যদি তারা প্রত্যক্ষ করতেন, কী মূল্যায়ন করতেন? ভেবে দেখুন!

০৭. কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করা, তাদের ভ্রষ্টতার মুখোশ উম্মোচন করা, তাদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখা এবং তাদের থেকে দূরে থাকার নির্দেশ:

আল্লাহ তা‘আলা শুধু কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেননি; বরং আমাদেরকে আসলী, মুরতাদ ও মুনাফিক; সকল প্রকার কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ক. আসলী কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা এবং কাফেররা ইসলামী রাষ্ট্র দখল করে নিলে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরযে আইন 

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

وإذا دخل العدو بلاد الإسلام فلا ريب أنه يجب دفعه على الأقرب فالأقرب إذ بلاد الإسلام كلها بمنزلة البلدة الواحدة، وأنه يجب النفير إليه بلا إذن والد ولا غريم، ونصوص أحمد صريحة بهذا.

وقال أيضاً: وأما قتال الدفع فهو أشد أنواع دفع الصائل عن الحرمة والدين فواجب إجماعاً، فالعدو الصائل الذي يفسد الدين والدنيا لا شيء أوجب بعد الإيمان من دفعه، فلا يشترط له شرط بل يدفع بحسب الإمكان، وقد نص على ذلك العلماء أصحابنا وغيرهم، فيجب التفريق بين دفع الصائل الظالم الكافر وبين طلبه في بلاده.

“শত্রুবাহিনী যখন কোনো ইসলামী রাষ্ট্রে ঢুকে পড়ে, তখন তাদেরকে প্রতিহত করা সন্দেহাতীতভাবে ফরয হয়ে যায়। সে দেশের মুসলমানদের উপর, তারপর তারা না পারলে তাদের পার্শ্ববর্তী দেশের মুসলমানদের উপর। কারণ, সমস্ত ইসলামী রাষ্ট্র একটি দেশের ন্যায়। পিতা-মাতা ও ঋণ প্রাপকের অনুমতি ছাড়াই সে যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। এ ব্যাপারে আহমাদ রহ. কর্তৃক উদ্ধৃতিগুলো স্পষ্ট।

তিনি আরও বলেন, আত্মরক্ষামূলক জিহাদ হলো: ইজ্জত ও দ্বীন রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকার। তা উম্মাহর ঐকমত্যে ফরয। দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয়ে ফাসাদ সৃষ্টিকারী হানাদার বাহিনীকে প্রতিহত করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঈমান আনার পরে আর কোনো ফরয নেই। তাই এতে কোনো শর্ত নেই; বরং সবার জন্য সাধ্যানুযায়ী প্রতিহত করা আবশ্যক। আমাদের আসহাব ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট বলেছেন, এখানে জালিম কাফের হানাদার বাহিনী এবং তাদেরকে উক্ত দেশে আহ্বানকারীদের মাঝে পার্থক্য করতে হবে।” (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, আল-ইখতিয়ারাতুল ইলমিয়্যাহ, কিতাবুল জিহাদ, ৪/৬০৭)

ইসলামী রাষ্ট্রে আক্রমণকারী কাফেরদেরকে প্রতিহত করার ব্যাপারে ঐকমত্য হওয়ার দলিল সম্বলিত মুজাহিদে আজম শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কঠোর ফতোয়াটি একটু ভেবে দেখুন। ঈমানের পর তাদেরকে প্রতিহত করার চেয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। এটির উপর সমস্ত আলেম একমত হয়েছেন- তার এ তাকীদটিও লক্ষ্য করুন। এরপর কথাটিকে বর্তমান যুগের দরবারি আলেম ও মডারেট দাঈদের কথার সাথে মিলিয়ে দেখুন, যারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে মুসলমানদেরকে জিহাদ থেকে বিরত রাখতে চায়; যাতে আমাদের ভূখণ্ডে হানাদার কাফেরদেরকে নিরাপদে রাখা যায় এবং তাদের মনোবাসনা সহজ শান্তভাবে পূর্ণ করতে পারে।

খ. ইসলামী রাষ্ট্রের মুরতাদ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা 

ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মতবাদে দেশ পরিচালনাকারী এবং ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের বন্ধু মুরতাদ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বর্তমান যুগের ফরযে আইন জিহাদের অন্যতম একটি রূপ। এ বিষয়টি সে সকল বিষয়ের অন্তর্গত একটি বিষয়, যার উপর উলামায়ে কেরাম একমত রয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তাঁরা ফতোয়া দিয়েছেন। আমরা তার কিয়দাংশ এখানে উল্লেখ করব। মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿النساء: ٦٥﴾

কিন্তু না, আপনার পালনকর্তার কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক মানবে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।” (সূরা নিসা: ৬৫)

০১. ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, রাসূলের আনুগত্য অধ্যায়: আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ  ﴿المائدة: ٩٢﴾

তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।” (সূরা মায়িদা: ৯২)

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ  ﴿النساء: ٦٤﴾

বস্তুত আমি একমাত্র এ উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।” (সূরা নিসা: ৬৪)

مَن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ﴿النساء: ٨٠﴾

যে ব্যক্তি রাসূলের হুকুম মান্য করে, সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল।” (সূরা নিসা: ৮০)

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿النساء: ٦٥﴾

কিন্তু না, আপনার পালনকর্তার কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক মানবে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।” (সূরা নিসা: ৬৫)

উক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা এ কথা তাকীদ দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করা ওয়াজিব এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করা মানে আল্লাহরই আনুগত্য করা। সুতরাং তাঁর অবাধ্য হওয়ার মানে স্বয়ং আল্লাহরই অবাধ্য হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿النور: ٦٣﴾

অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” (সূরা নূর: ৬৩)

এ আয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধী এবং তাঁর আনীত ধর্ম মেনে নেওয়া থেকে বিরতদেরকে এবং তাতে সন্দেহকারীদেরকে ঈমান থেকে বহির্ভূত বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿النساء: ٦٥﴾

কিন্তু না, আপনার পালনকর্তার কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক মানবে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।” (সূরা নিসা: ৬৫)

আয়াতে حرج শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়, মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত, حرج এর অর্থ সন্দেহ। তবে حرج এর আসল অর্থ সংকীর্ণতা। সুতরাং আয়াতের অর্থ এও হতে পারে যে, সন্দেহাতীত ভাবে মেনে নেওয়া, এ ক্ষেত্রে মনে কোনো সংকীর্ণতা না রাখা; বরং খোলা মনে, জেনে-শুনে এবং বিশ্বাসের সাথে মেনে নেওয়া।

এ আয়াত প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো আদেশ প্রত্যাখ্যান করে, সে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যায়। চাই সন্দেহ করে প্রত্যাখ্যান করুক বা গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকে প্রত্যাখ্যান করুক বা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রত্যাখ্যান করুক।

সাহাবায়ে কেরাম যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদেরকে মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে তাদেরকে হত্যা করা এবং স্ত্রী-সন্তানকে গ্রেফতার করার হুকুম দিয়েছিলেন, এ আয়াতে তাঁদের কাজের বৈধতার প্রমাণ করে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ করেছেন, যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ ও রায় মানবে না, সে ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (ইমাম শাফেয়ী রহ. প্রণীত আহকামুল কুরআন, ৩/১৮০-১৮১)

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ ﴿المائدة: ٥٠﴾

তবে কি তারা জাহেলী যুগের ফায়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্য উত্তম ফায়সালাকারী কে?”(সূরা মায়িদা: ৫০)

আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন,

ينكر تعالى على من خرج عن حكم الله المحكم، المشتمل على كل خير، الناهي عن كل شر، وعدل إلى ما سواه من الآراء والأهواء والاصطلاحات التي وضعها الرجال بلا مستند من شريعة الله، كما كان أهل الجاهلية يحكمون به من الضلالات والجهالات بما يضعونها بآرائهم وأهوائهم، وكما يحكم به التتار من السياسات الملكية المأخوذة عن ملكهم جنكز خان الذي وضع لهم الياسق، وهو عبارة عن كتاب مجموع من أحكام قد اقتبسها عن شرائع شتى من اليهودية والنصرانية والملة الإسلامية وغيرها، وفيها كثير من الأحكام أخذها من مجرد نظرة وهواه، فصارت في بنيه شرعاً متبعاً، يقدمونها على الحكم بكتاب الله وسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، فمن فعل ذلك فهو كافر يجب قتاله حتى يرجع إلى حكم الله ورسوله، فلا يحكم سواه في قليل ولا كثير.

“আল্লাহ তা‘আলা তাদের কর্মকাণ্ডকে নিন্দা জানাচ্ছেন, যারা আল্লাহ তা‘আলার অলঙ্ঘনীয় বিধান- যা সব ধরনের কল্যাণ সমৃদ্ধ এবং সব ধরনের অকল্যাণকে প্রতিহতকারী; তা থেকে বের হয়ে প্রবৃত্তি, নিজস্ব ধ্যান-ধারণা, শরীয়াহর বাহিরের মানব রচিত পরিভাষাসমূহের দিকে প্রত্যাবর্তন করে।

যেমন, জাহেলী যুগের মানুষ মানুষের মস্তিষ্ক ও প্রবৃত্তিপ্রসূত মূর্খতা ও ভ্রষ্টতাপূর্ণ চিন্তা দ্বারা নিজেদের পরিচালনা করত। তেমনিভাবে তাতার শাসকগোষ্ঠী চেঙ্গিস খান প্রণীত ইয়াসিক দ্বারা দেশ পরিচালনা করত। ইয়াসিকের সার কথা হলো, এটি এমন একটি আইন সংকলন; যাতে আইন গ্রহণ করা হয়েছে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম থেকে। তাতে এমন কতক আইন আছে, যা শুধুমাত্র প্রবৃত্তি ও চাহিদাপ্রসূত। ফলে সেটি তার উত্তরসূরীদের নিকট অনুসরণীয় শরীয়ায় পরিণত হলো। তারা এটিকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকার দিত। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার সাথে যুদ্ধ করা ওয়াজিব। সামান্য কি বেশি; কোনো বিষয়েই শরীয়াহর বাহিরে গিয়ে হুকুম দেওয়া যাবে না।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২/৬৮)

গ. সংশয় সৃষ্টিকারী মুনাফিকদের সাথে যুদ্ধ করা 

মহান আল্লাহ তা‘আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুনাফিকদের সাথে কঠোরতা, অনমনীয়তা, যুক্তি উপস্থাপন ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে জিহাদ করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ ﴿التحريم: ٩﴾

হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন।”(সূরা তাহরীম: )

 

 

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন,

فيه مسألة واحدة وهو التشديد في دين الله، فأمره أن يجاهد الكفار بالسيف والمواعظ الحسنة والدعاء إلى الله، والمنافقين بالغلظة وإقامة الحجة، وأن يعرفهم أحوالهم في الآخرة وأنهم لا نور لهم يجوزون به الصراط مع المؤمنين ، وقال الحسن: أي جاهدهم بإقامة الحدود عليهم.

“এ আয়াতে একটি মাসআলা স্পষ্ট করা হয়েছে। তা হলো: দ্বীনের ব্যাপারে অনমনীয়তা। তিনি নির্দেশ করেছেন যে, কাফেরদের সাথে অস্ত্রশস্ত্র, উত্তম উপদেশ ও আল্লাহর দিকে আহ্বানের মাধ্যমে যুদ্ধ কর। আর মুনাফিকদের সাথে কঠোরতা ও যুক্তি উপস্থাপন এবং তাদের শেষ পরিণাম কীরূপ হবে এবং মু’মিনদের সাথে চললেও তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এ কথা অবহিত করে বুঝানোর মাধ্যমে যুদ্ধ কর। হাসান রহ. বলেন, অর্থাৎ শাস্তি বাস্তবায়ন করে তাদের সাথে জিহাদ কর।” (তাফসীরে কুরতুবী, ১৮/২০১ পৃ.)

০৮. শরীয়াহর নিকট অগ্রহণযোগ্য কাফেরদের সাথে বন্ধুত্বকারীদের কিছু মিথ্যা অজুহাত:

আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের মিথ্যা অজুহাত গ্রহণ করেননি। তারা কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। যুগের বিপর্যয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের অজুহাতে তাদেরকে সাহায্য করে। কখনো তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে সাহায্য করেছে কাফেরদের নিকট তাদের একটা অবস্থান হওয়ার অজুহাতে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿المائدة: ٥١﴾ فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَىٰ أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا أَسَرُّوا فِي أَنفُسِهِمْ نَادِمِينَ ﴿المائدة: ٥٢﴾ وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَاسِرِينَ ﴿المائدة: ٥٣﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে; সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না। বস্তুত যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, আপনি তাদেরকে দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন; ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য অনুতপ্ত হবে। মুমিনগণ বলবে, এরাই কি সে সব লোক; যারা আল্লাহর নামে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করত যে, আমরা তোমাদের সাথেই আছি? তাদের কৃতকর্মসমূহ নষ্ট হয়ে গেছে; ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে।” (সূরা মায়িদা: ৫১৫৩)

আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন-

}فترى الذين في قلوبهم مرض} أي شك وريب ونفاق، {يسارعون فيهم} أي يبادرون إلى موالاتهم ومودتهم في الباطن والظاهر، {يقولون نخشى أن تصيبنا دائرة} أي يتأولون في مودتهم وموالاتهم أنهم يخشون أن يقع أمر من ظفر الكافرين بالمسلمين، فتكون لهم أياد عند اليهود والنصارى. 

فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন অর্থাৎ সন্দেহ, সংশয় ও মুনাফিকী রয়েছে। يُسَارِعُونَ فِيهِمْ  দৌঁড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে অর্থাৎ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে তাদের বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতার জন্য দৌড়ঝাঁপ করে। يَقُولُونَ نَخْشٰى أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অর্থাৎ, তাদের বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতার কারণ ব্যাখ্যা করে বলে, তারা ভয় করছে যে, কাফেররা যদি মুসলমানদের উপর বিজয় লাভ করে, তখন ইয়াহুদী-নাসারাদের কাছে তাদের একটা অবস্থান হবে।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২/৭১)

০৯. মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করা এবং তাদেরকে সাহায্য করার নির্দেশ:

কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে আলোচনা করার পর সংক্ষিপ্তাকারে মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব করার নির্দেশের বিষয়ে আলোচনা করা সমীচীন মনে করছি। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوا وَّنَصَرُوا أُولَٰئِكَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا مَا لَكُم مِّن وَلَايَتِهِم مِّن شَيْءٍ حَتَّىٰ يُهَاجِرُوا وَإِنِ اسْتَنصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَىٰ قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُم مِّيثَاقٌ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ﴿الأنفال: ٧٢﴾ وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ إِلَّا تَفْعَلُوهُ تَكُن فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ ﴿الأنفال: ٧٣﴾ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوا وَّنَصَرُوا أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ ﴿الأنفال: ٧٤﴾ وَالَّذِينَ آمَنُوا مِن بَعْدُ وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا مَعَكُمْ فَأُولَٰئِكَ مِنكُمْ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَىٰ بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴿الأنفال: ٧٥﴾

যাঁরা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, স্বীয় জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে এবং যাঁরা তাঁদেরকে আশ্রয় ও সাহায্য সহায়তা দিয়েছে, তাঁরা একে অপরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে; কিন্তু হিজরত করেনি তোমাদের জন্য তাদের অভিভাবকত্বের কোনো দায়িত্ব নেই, যতক্ষণ না তারা হিজরত করে। অবশ্য যদি তারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সহায়তা কামনা করে; তবে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কিন্তু তোমাদের সাথে যাদের চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নয়। বস্তুত তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সবই দেখেন। আর যারা কাফের তারা পারস্পরের বন্ধু। তোমরা যদি (উপরোক্ত) ব্যবস্থা কার্যকর না কর; তবে ফেতনা বিস্তার লাভ করবে এবং বড়ই বিপর্যয় দেখা দেবে। আর যাঁরা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে এবং যাঁরা তাঁদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য-সহায়তা করেছে, তাঁরা হলো প্রকৃত মুমিনতাঁদের জন্য রয়েছে, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। আর যাঁরা ঈমান এনেছে পরবর্তী পর্যায়ে এবং হিজরত করেছে এবং তোমাদের সাথে সম্মিলিত হয়ে জিহাদ করেছে, তাঁরাও তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। বস্তুত যারা আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তাঁরা পরস্পর বেশি হকদার। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাবতীয় বিষয়ে সক্ষম ও অবগত।” (সূরা আনফাল: ৮২৮৫)

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন-

قوله تعالى: {وإن استنصروكم في الدين} يريد إن دعوا هؤلاء المؤمنون الذين لم يهاجروا من أرض الحرب عونكم بنفير أو مال لاستنقاذهم فأعينوهم، فذلك فرض عليكم فلا تخذلوهم، إلا أن يستنصروكم على قوم كفار بينكم وبينهم ميثاق فلا تنصروهم عليهم ولا تنقضوا العهد حتى تتم مدته.

قال ابن العربي: إلا أن يكونوا أسراء مستضعفين فإن الولاية معهم قائمة، والنصرة لهم واجبة حتى لا تبقى منا عين تطرف، حتى نخرج إلى استنقاذهم إن كان عددنا يحتمل ذلك، أو نبذل جميع أموالنا في استخراجهم حتى لا يبقى لأحد درهم كذلك قال مالك وجميع العلماء. فإنا لله وإنا إليه راجعون على ما حل بالخلق في تركهم إخوانهم في أسر العدو، وبأيديهم خزائن الأموال وفضول الأحوال والقدرة والعدد والقوة والجلد.

“আল্লাহর বাণী- وَإِنِ اسْتَنصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ “যদি তারা ধর্মীয় ব্যাপারে তোমাদের সহায়তা কামনা করে” এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দারুল হারব থেকে হিজরত করতে না পারা মু’মিনরা যদি তোমাদের কাছে সৈন্য প্রেরণ বা সম্পদ সাহায্য চায়, তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও। এটি তোমাদের উপর ফরয। অতএব, তোমরা তাদেরকে নিরাশ করবে না। তবে তারা যদি এমন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করে, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি আছে, তখন সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি ভঙ্গ করবে না।

ইবনুল আরাবী রহ. বলেন, তবে তারা যদি দুর্বল বন্দী হয়। কেননা তাদের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে এবং তাদেরকে সাহায্য করা ওয়াজিব। আমাদের পক্ষ থেকে যাতে কোনো অবহেলা না পাওয়া যায়। এমনকি আমাদের সংখ্যা বিচারে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে মুক্ত করার সম্ভাবনা থাকলে, তাদেরকে মুক্ত করার জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে বা তাদেরকে মুক্ত করতে যত টাকার প্রয়োজন, তত টাকা খরচ করে হলেও তাদেরকে মুক্ত করতে হবে। এমনকি আমাদের কাছে এক পয়সাও বাকি না থাকুক। ইমাম মালেক ও সমস্ত আলেম এমনটিই বলেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! কত নীচু তাদের চরিত্র, যাদের ভাইয়েরা দুশমনের কারাগারে বন্দী; অথচ তাদের হাতে রয়েছে সম্পদ, তাদের রয়েছে শক্তি-সামর্থ, তারা সংখ্যায় যথেষ্ট, তাদের সেনাবাহিনী রয়েছে, রয়েছে অস্ত্র-শস্ত্র।” (কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করছে না!!) (তাফসীরে কুরতুবী, ৮/৫৭)

আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন-

ذكر تعالى أصناف المؤمنين، وقسمهم إلى مهاجرين خرجوا من ديارهم وأموالهم، وجاءوا لنصر الله ورسوله وإقامة دينه، وبذلوا أموالهم وأنفسهم في ذلك، وإلى أنصار وهم المسلمون من أهل المدينة إذ ذاك، آووا إخوانهم المهاجرين في منازلهم، وواسوهم في أموالهم، ونصروا الله ورسوله بالقتال معهم، فهؤلاء بعضهم أولياء بعض، أي كل منهم أحق بالآخر من كل أحد، ولهذا آخى رسول الله صلى الله عليه وسلم بين المهاجرين والأنصار كل اثنين إخوان .

وقوله تعالى: {والذين آمنوا ولم يهاجروا مالكم من ولايتهم من شيء حتى يهاجروا} هذا هو الصنف الثالث من المؤمنين وهم الذين آمنوا ولم يهاجروا بل أقاموا في بواديهم فهؤلاء ليس لهم في المغانم نصيب ولا في خمسها إلا ماحضروا فيه القتال.

يقول تعالى: {وإن استنصروكم} هؤلاء الأعراب الذين لم يهاجروا في قتال ديني على عدو لهم فانصروهم، فإنه واجب عليكم نصرهم، لأنهم إخوانكم في الدين إلا أن يستنصروكم على قوم من الكفار بينكم وبينهم ميثاق، أي مهادنة إلى مدة فلا تخفروا ذمتكم ولا تنقضوا أيمانكم مع الذين عاهدتم، وهذا مروي عن ابن عباس رضي الله عنه

“আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের প্রকারভেদ বর্ণনা করেন। প্রথম প্রকার: মুহাজিরীন- যাঁরা ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেছেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করা এবং দ্বীন কায়েম করার জন্য চলে এসেছেন। এই পথে নিজেদের জান-মাল কুরবান করেছেন। দ্বিতীয় প্রকার: মদীনার স্থায়ী বাসিন্দা আনসার- যাঁরা তাঁদের বাড়িতে মুহাজির ভাইদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন, নিজেদের সম্পদ তাঁদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন। মুহাজিরদের সাথে যুদ্ধ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করেছেন (অর্থাৎ দ্বীনকে বিজয়ী করেছেন)। সুতরাং তাঁরাই পরস্পরে বন্ধু। অর্থাৎ প্রত্যেকের নিকট অপর ভাই নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয়। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুহাজির-আনসারকে দু’জন দু’জন করে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছেন।

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا مَا لَكُم مِّن وَلَايَتِهِم مِّن شَيْءٍ حَتَّىٰ يُهَاجِرُوا ﴿الأنفال: ٧٢﴾

“যারা ঈমান এনেছে; তবে হিজরত করেনি তাদের সাথে তোমাদের কীসের বন্ধুত্ব- যতদিন না তারা হিজরত করছে??” এটি মুমিনের তৃতীয় প্রকার। যারা ঈমান আনা সত্ত্বেও হিজরত করেনি; বরং তাদের স্ব স্ব স্থানে রয়ে গেছে, তাদের জন্য গনীমতে কোনো অংশ নেই। এক পঞ্চমাংশেও তাদের অংশ নেই। তবে যারা যুদ্ধে অংশ নেবে তারা এর ব্যতিক্রম।

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন- وَإِنِ اسْتَنصَرُوكُمْ “তারা যদি তোমাদের সহায়তা কামনা করে।” যেসব লোক হিজরত করে কাফেরদের সঙ্গ নিয়ে যুদ্ধ করতে যায়নি, তারা যদি সাহায্য কামনা করে, তাদেরকে সাহায্য কর। তাদেরকে সাহায্য করা ওয়াজিব। কারণ, তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। তবে তারা যদি এমন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য চায়, যাদের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদে তোমাদের চুক্তি রয়েছে, তখন তোমরা তোমাদের দায় ও চুক্তি ভঙ্গ করবে না। এটি ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২/৩২৯-৩৩০)

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولٰئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿التوبة: ٧١﴾

ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তাঁরা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে। সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরই উপর আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা: ৭১)

ইবনে কাসীর রহ. বলেন, মুনাফিকদের গর্হিত গুণাবলি বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের প্রশংসার্হ গুণাবলি তুলে ধরেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ

ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধুঅর্থাৎ, একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে।

যেমন সহীহ বুখারীর হাদীসে এসেছে-

الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا ، وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ

মুমিনগণ পরস্পর একটি প্রাসাদের ন্যায়। যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। এই বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাতের আঙুলগুলো অপর হাতের আঙুলে প্রবেশ করালেন” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং৪৮১)

বুখারীর অন্য এক হাদীসে আছে-

مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إذَا اشْتَكَى شَيْئًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى

পরস্পর মহব্বত, দয়া ও অনুগ্রহে মুমিনদের উদাহরণ একটি দেহের ন্যায়। যখন তার এক অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন তার পুরো দেহ বিনিদ্রা ও জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়ে” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬০১১)

সূত্র: তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২/৩৭০)

১০. সারকথা:

ক. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে বন্ধু বানিয়ে কথা-কাজের মাধ্যমে সাহায্য করতে নিষেধ করেছেন। যে ব্যক্তি এমনটি করবে সে তাদেরই মতো কাফের হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি হত্যা, অঙ্গহানি বা কঠিন শাস্তির ভয় করে, শরীয়াহ তার জন্য কাফেরদের সাথে এমন বাক্য উচ্চারণ করা অনুমোদন করে; যা তার থেকে সে কষ্টকে দূর করে দেবে। কোনো ফায়দা লুটার জন্য এমনটা করা যাবে না, আন্তরিকভাবে তাদের সাথে একমত হয়ে এবং কোনো কাজ, হত্যা বা যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সহায়তা করা যাবে না। তবে এমন পরিস্থিতির স্বীকার ব্যক্তির জন্য উত্তম হলো ধৈর্যধারণ করা এবং অটল থাকা।

খ. আল্লাহ তা‘আলা কাফেরদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা ও বন্ধুত্ব বর্জন করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তারা সদা আমাদের সাথে শত্রুতা রাখে, দ্বীনের ব্যাপারে আমাদের সাথে হিংসা করে এবং আমাদেরকে দ্বীন থেকে বিচ্যুত দেখতে চায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা অভিযানের খবর জানিয়ে সামান্য একটি চিঠি পাঠানোর অপরাধে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. হাতিব ইবনে আবি বালতাআ রাযি. কে মুনাফিক গণ্য করেছিলেন এবং তার ওজর কবুল না করে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এ কাজে তাঁকে নিন্দা জানাননি বরং বদর যুদ্ধে হাতিব ইবনে আবি বালতাআ রাযি. এর অংশগ্রহণের বিশাল কাজের দিকে লক্ষ্য করে তার এ জঘন্য অপরাধ ক্ষমা করেছিলেন। আর এ বিধানে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসা, মু’মিনদের বন্ধুত্ব ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর মাঝে এক নিবিড় সম্পর্ক। আরও রয়েছে, যে সব কাফের আমাদের সাথে শত্রুতা রাখে না, তাদের সাথে নিষিদ্ধ বন্ধুত্বের বাহিরে থেকে কোনো কল্যাণ পৌঁছানো এবং ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করা।

গ. কাফেরদেরকে অন্তরঙ্গ ও গোপন তথ্যের ব্যাপারে বন্ধু বানানো থেকে শরীয়াহ আমাদেরকে নিষেধ করেছে।

ঘ. কাফেরদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে শরীয়াহতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ঙ. কাফেরদের বিশ্বাস-মতবাদের অনুসরণ করা, সেগুলোকে সম্মান জানানো থেকে শরীয়াহ আমাদেরকে নিষেধ করেছে।

চ. মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে সাহায্য করা থেকে শরীয়াহ আমাদেরকে নিষেধ করেছে। কাফেরদের পতাকাতলে থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাধ্য হওয়ার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।

ছ. আসলী, মুরতাদ ও মুনাফিক কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে শরীয়াহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রের হানাদার কাফেরদেরকে প্রতিহত করা উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে ঈমান আনার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরয।

জ. প্রেক্ষাপট পরির্তনের ভয়ে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করা মুনাফিকদের এমন অজুহাত শরীয়াহ গ্রহণ করেনি।

ঝ. কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে সহায়তা করা শরীয়াহ আমাদের উপর ফরয করে দিয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: আকিদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা থেকে বিচ্যুতির ধরন:

০১. যে সব শাসক গাইরুল্লাহর বিধান দিয়ে শাসন করে ও ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের বন্ধু বানিয়ে দু’টি অপরাধকে সন্নিবেশিত ঘটিয়েছে-

এ যুগে আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি থেকে সবচেয়ে বেশি বিচ্যুত শ্রেণী হলো: সে সব শাসকশ্রেণী, যারা ইসলামী শরীয়াহ থেকে বের হয়ে ইসলামী দেশগুলোর ক্ষমতা আঁকড়ে আছে। যদিও তারা নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে দাবি করে থাকে।

মুসলিম উম্মাহর উপর এ শাসকগোষ্ঠীর বিপদ দিন-দিন বেড়ে চলছে। এমনকি মুসলমানদেরকে সহীহ আকীদা থেকে বিচ্যুত করা এবং দ্বীন অনুসরণের পথে বাধা হওয়ার মাধ্যমে এরা মুসলিমদের উপর সর্বোচ্চ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, তারা ইসলামী আকীদা থেকে সবচেয়ে বেশি বিচ্যুত, জীবন ও সম্পদসহ মুসলিমদের প্রায় সব বিষয়কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণকারী একটি গোষ্ঠী। তা ছাড়া তারা একই সাথে সব স্থানে ছড়িয়ে আছে; ফলে পৃথিবীর কোনো মুসলিম দেশ তাদের অনিষ্টতা থেকে বাঁচার কল্পনাই করতে পারছে না।

এ শাসকগোষ্ঠীর বিচ্যুতি যৌগিক বিচ্যুতি। একে তো তারা ইসলামী শরীয়াহ মতে শাসনকার্য পরিচালনা করেই না। তার উপর তারা ইসলামের চির শত্রুদের আদেশ-নিষেধ পালন ও তাদের বন্ধুত্ব রক্ষা করে আসছে, বিশেষত ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের।

ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে সখ্যতার প্রতি যখন আমরা নজর বুলাই, তখন দেখতে পাব- ইসলামী বিশ্ব, বিশেষত আরববিশ্বকে তারা ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের রসদ সরবরাহ, সংরক্ষণে যুতসই ঘাঁটিতে রূপ দিয়েছে। জাযিরাতুল আরব, উপ-সাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ, মিশর ও জর্দানের দিকে তাকালে যে কোনো চক্ষুষ্মান ব্যক্তি দেখতে পাবে- ইসলামী বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র আজ ক্রুসেডার বাহিনীর সাংস্কৃতিক ও সামরিক আগ্রাসনের ঘাঁটি ও অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আরও দেখা যাবে যে, এসব শাসক মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নব্য ক্রুসেডযুদ্ধের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে।

আমাদের আধুনিক ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময় থেকে শুরু করে গত শতকের সে সব শাসকদের ইতিহাসে যদি নজর দিই, যারা জোরপূর্বক মুসলিম বিশ্বে চেপে বসে ইসলামী শরীয়াহর বাহিরে দেশ পরিচালনা করেছে, তাহলে দেখতে পাই- মুসলমানদের উপর চেপে বসা এসব শাসকদেরকে ইসলামের চিরশত্রু আমেরিকা, ইসরাইল, ফ্রান্স, ব্রিটেন নিরন্তর ষড়যন্ত্র, গোপন সম্পর্ক, সরাসরি আগ্রাসন, ঋণ প্রদান, অনুদান, গোপন লেনদেন, অরাজকতা ও গোয়েন্দাগিরির মাধ্যমে পুতুল রাজায় পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। এসব ইতিহাস আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। তবে আমরা দেখিয়ে দিতে চাই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসলামের বিরোধীশক্তিগুলো যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার খোলসে এসব শাসককে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। সে ব্যবস্থা হলো জাতিসংঘ; যা যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদেরই অনুবর্তী।

ইসলামী মানদণ্ডে জাতিসংঘের সারকথা হলো, এটি একটি আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদী কুফরী সংঘ। এখানে প্রবেশ করা জায়েয নয়। এর নিকট বিচার কামনা করাও জায়েয নয়; যেটি ইসলামী শরীয়াহকে প্রত্যাখান করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে এ পৃথিবীর পাঁচটি আগ্রাসী মোড়ল কুফরী রাষ্ট্রের পরিচালনার বাহিরে কারো নাক গলানোর ক্ষমতা নেই। তারাই নিরাপত্তা পরিষদের ব্যানারে জাতিসংঘের নেতৃত্ব আঁকড়ে আছে।

আমরা আরও দেখিয়ে দিতে চাই যে, ইসলামের শত্রুরা এসব শাসককে বিভিন্ন সরকারি চুক্তি ও বৈঠকের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে দখলদার ইয়াহুদী রাষ্ট্রকে বৈধতা দিতে রাজি করিয়েছে। সেই ১৯৪৯ সালের অস্ত্র বিরতি চুক্তি থেকে শুরু করে ১৯৯৩ সালের অসলো-চুক্তি পর্যন্ত। সবশেষে ২০০২ সালে বৈরুত-চুক্তিতে আরবলীগ থেকে ইসরাইল রাষ্ট্রের পূর্ণ বৈধতার স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়া হয়েছে।

এখানে আরও উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি- ইসরাইলের সাথে চুক্তি এবং ফিলিস্তিনে তাদের দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া শরীয়াহর ওয়াজিব হুকুম এবং আবশ্যকীয় দ্বীনি বিষয়কে অস্বীকার করার নামান্তর।

তেমনি এটি ইসলামী রাষ্ট্রে হানাদার কাফেরদেরকে প্রতিহত করার যে বিধান মুসলমানদের উপর ফরযে আইন, তাকেও অস্বীকার করার নামান্তর। তেমনি এটি ফিলিস্তিনী মুসলমানদেরকে যে সাহায্য করা ওয়াজিব; তাও অস্বীকার করার নামান্তর। অথচ এটি শরীয়াহ প্রমাণিত ফরযে আইন, দ্বীনের অবশ্য পালনীয় একটি বিধান। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا ﴿النساء: ٧٥﴾

আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করছ না? দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে; যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে এ জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অভিভাবক নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।” (সূরা নিসা: ৭৫)

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, আল্লাহর বাণী-

وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করছ না?” উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আয়াতের সারকথা হলো, সে সব কাফের-মুশরিকদের হাত থেকে দুর্বল মুসলমানদেরকে মুক্ত করতে হবে, যারা তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিচ্ছে এবং দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কালিমা বুলন্দ করা, দ্বীনকে বিজয়ী করা এবং তার দুর্বল বান্দাদেরকে মুক্ত করার জন্য জিহাদ ফরয করে দিয়েছেন। যদিও তাতে জান দিতে হোক না কেন।” (তাফসীরে কুরতুবী, ৫/২৭৯)

তারা শুধু ফরযে আইন ছেড়ে দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি; বরং অধিকাংশ আরব দেশ ১৯৯৬’র শারম আল-শাইখ ষড়যন্ত্রে ইসরাইল, আমেরিকা, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে অংশগ্রহণ করে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, তারা মুজাহিদীনের হামলা থেকে ইসরাইলকে সুরক্ষা দেবে।

কুফরী মোড়লদের কাছে এহেন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের প্রেক্ষিতে ইসলামবিরোধী শক্তি, বিশেষত নব্য ক্রুসেডার (আমেরিকা) তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক আগ্রাসনের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমাদের দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠীকে হাত করে নিয়েছে।

সময়ের পরিবর্তনে আজ আমাদের দেখতে হচ্ছে, তারা পুরোপুরি নব্য ক্রুসেডারদের তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে। তাই তো ফিলিস্তিন টুকরো টুকরো হচ্ছে, আঘাতে আঘাতে বিধ্বস্ত হচ্ছে, প্রতিদিন শহীদ হচ্ছে কত শত ফিলিস্তিনী; কিন্তু প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো নীরব-নির্বিকার বা আঁতাঁত করে আছে ইসরাইলের সাথে। ইরাকী মুসলমানদেরকে হত্যা করা, তাদের ভূমি দখল করা এবং তাদের পেট্রোল ছিনতাই করার জন্য হামলার পর হামলা করা হচ্ছে। আর আরব প্রতিবেশীরা নব্য ক্রুসেডারদেরকে নিয়মিত সব ধরনের সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। আফগানিস্তানে ক্রুসেডার বাহিনী সৈন্য প্রেরণ করে আর প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো আমেরিকার সাথে আঁতাঁত করে আফগান ও আফগান জাতিকে কর্তৃত্বে আনার পাঁয়তারা করে।

শরীয়াহ থেকে নির্বাসিত এসব শাসকের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নির্যাতন, অপরাধসমূহ, কারো কাছে অস্পষ্ট নয়। বিশেষত ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে তাদের বন্ধুত্ব দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।

তাই তো তারা তাদের বিরুদ্ধে উম্মতে মুসলিমাহ ও তার বীর সন্তান মুজাহিদীনের সংগ্রামে ভীত হয়ে, বিশেষত ফিলিস্তিন, ইরাক, চেচনিয়া ও কাশ্মীরে ইসরাইল-আমেরিকার উৎপাত বেড়ে যাওয়ার পর, মুসলমানদেরকে দমন করা, তাদের নিজেদের দুর্বলতা, নেতিবাচকতা ও তাঁবেদারিকে আড়াল করার জন্য বিদেশী প্রভুদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো তারা, যারা ইসলামের পোশাক পরিধান করে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার ঢং করে; যাতে এর মাধ্যমে সহজেই মুসলমানদের আস্থা, বিশ্বাস ও হৃদয়-মননে স্থান করে নিতে পারে। ঠিক জীবনবিধ্বংসী ভাইরাসের মতো, যা হিউম্যান ইমিউন সিস্টেমকে (মানুষের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে) এবং মানুষের শারীরিক কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয় তথা মানবদেহকে ভেতরে ভেতরে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়।

এ বিষয়ে নিচের আলোচনায় সম্প্রসারিত করার প্রয়াস পাব।

০২. শাসকগোষ্ঠীর সহযোগী: সরকারি আলেম, সাংবাদিক, মিডিয়াকর্মী, লেখক, বুদ্ধিজীবী সরকারি গং চাকুরেরা বাতিলকে সাহায্য করা, একে শোভনীয়রূপে ফুটিয়ে তোলা এবং তাদের পক্ষাবলম্বন করার বিনিময়ে বেতন ভোগ করে-

এ গোষ্ঠীটি ইসলামী ভূখণ্ডে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শাসকশ্রেণী, ক্রুসেডার বাহিনী বা (তাদের প্রতারণা মতে) জিম্মিদের (!) সাথে বন্ধুত্ব করার ব্যাপারে সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা পালনকারী।

কিন্তু আফসোস তারা স্পর্শকাতর একটি প্রশ্ন থেকে পালিয়ে বেড়ায় যে, (যদি তারা জিম্মি হয়ে থাকে তবে) কে কাকে জিযিয়া দেয়?

এ গোষ্ঠীটি বিভিন্ন ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকল ইমামগণের স্থিরকৃত আকীদা থেকে বিচ্যুত প্রতারণাপূর্ণ এক পদ্ধতিকে অনুসরণ করে।

এ গোষ্ঠীটি নিজেদের মাঝে সন্নিবেশ ঘটিয়েছে:

০১. মুরজিয়াদের আকীদা- সর্বনিকৃষ্ট পন্থার শৈথিল্য, তাঁবেদারি, ফাসাদ ও মুরতাদ সরকারের সংগঠনগুলো কর্তৃক লুণ্ঠনকে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে শরীয়াহর গণ্ডিতে ঢুকিয়ে পূর্ণমাত্রায় ছাড় দেয় এরা।

০২. খারেজীদের আকীদা- তারা ইসলামের পথে জীবন উৎসর্গকারী মুজাহিদীনের রক্ত ও ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, তাঁদেরকে কাফের, ফাসিক ও বেদআতী আখ্যা দেওয়ার ব্যাপারে খারেজীদের মতো বাড়াবাড়ি করে।

অতএব, মিশরের রাষ্ট্রীয় মুফতী- যিনি মিশর সরকারের চাকুরে, তিনি বেতনের বিনিময়ে তাকে যে কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; সে কাজ নিষ্ঠার সাথে আঞ্জাম দেন। তার কাজ হলো, মুসলমানবিদ্বেষী ইয়াহুদীবান্ধব ধর্মনিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থাকে এমন এক বাড়াবাড়ির মাধ্যমে শরীয়াহর আলোকে বৈধতাপ্রদান করা, যা প্রথম যুগের মুরজিয়াদেরকেও হার মানায়। তিনিই আবার ধর্মনিরপেক্ষ সামরিক আদালতকে ইসলামের সিংহ পাঁচ মিশরী মুজাহিদকে ফাঁসিতে ঝুলানোর পক্ষে ফতোয়া দেন। সে সকল মুজাহিদগণ হলেন যথাক্রমে মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম ফারজ, আব্দুল হামীদ আব্দুস সালাম, খালীদ ইসলামবুলী, হুসাইন আব্বাস ও আতা তায়িল রহ.। তারা সেই আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করেছিলেন, যে ইসরাইলের সাথে চারটি চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। যাতে আছে:

ক. ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদান।

খ. ফিলিস্তিনে তাদের দখলদারিত্ব মেনে নেওয়া।

গ. ইসরাইলে আক্রমণ না করা।

ঘ. ইসরাইল কর্তৃক সীমালঙ্ঘন হয় এমন কোনো রাষ্ট্রকে সাহায্য না করা। সিনাই প্রদেশকে অস্ত্রমুক্ত করে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ অনেক গোপন চুক্তি সে-ই করেছিল।

এসব চুক্তিই ইসরাইলের সাথে ১৯৭৯ সালে মিশরের ‘শান্তিচুক্তি’ নামে প্রসিদ্ধ, যার ফলে মিশর-ইসরাইল যুদ্ধ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ইসরাইলের সাথে যুদ্ধরত কোনো রাষ্ট্রকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করা মিশরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়; বরং সর্বক্ষেত্রে ইসরাইলের সাথে রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতি সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে হয়। অতঃপর জামিয়া আজহার সেই চুক্তিকে মোবারকবাদ জানিয়ে একটি আহামরি ফতোয়া বের করে এবং এটিকে সম্পূর্ণ শরীয়াহসম্মত ঘোষণা দেয়!!!

আরেক শ্রেণীর মুফতী আছে, যারা উলুল আমরকে (শাসকগোষ্ঠীর) আনুগত্য করার আহ্বান করে। সাথে সাথে মুজাহিদীনকে ফেতনাবাজ বলে আখ্যা দেয়। তারা আমেরিকা এবং আদিগন্ত ধ্বংসস্তুপে পরিণতকারী তাদের জালিম সেনাবাহিনী, সাগরপথ সংকীর্ণকারী তাদের অহংকারী নৌবাহিনী, নিরাপত্তা আশ্রয়ী যুদ্ধবাজ সেই লক্ষ লক্ষ সৈন্যকে সাহায্য করার অনুমতি ও বৈধতা প্রদান করে।

আমাদের বুঝে আসে না যে, এখানে কে কাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে?? তারা একত্রে ফতোয়া প্রকাশ করে যে, অনিবার্য কারণে ইরাকী বার্থ পার্টির মোকাবেলায় আমেরিকাকে সাহায্য করা বৈধ। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান হারামাইনের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধবাজ কাফের সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে শরীয়াহসম্মত বলে ঘোষণা দেওয়া হয়!! ইরাক আগ্রাসনের পর আজ বারো বছর পর্যন্ত তারা এখানে উপস্থিত। এরাই তো অবরোধ আরোপ করে প্রায় দেড় মিলিয়ন ইরাকী শিশুকে হত্যা করেছে। কিন্তু তথাকথিত এই মুফতীগুলো এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করল না।

বিষয়টা সাদ্দামের বার্থ পার্টির বিরুদ্ধে কাফের সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং তা জাযিরাতুল আরবের তেলখনিগুলো জবরদখল করা পর্যন্ত গড়িয়েছে। না হলে আমেরিকার উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন এখানে ছিল না। কারণ, কুয়েত স্বাধীন করা এবং তাকে সহায়তা করার জন্য আরববিশ্ব ও মুসলিম দেশসমূহের সেনাবাহিনীই যথেষ্ট ছিল।

কিন্তু এতে এসব শাসকগোষ্ঠীর কোনো আগ্রহ নেই; বরং তারা ব্রিটিশদের বেঁধে দেওয়া সীমানা এবং নির্ধারিত সিংহাসনের গোলাম। এরপর ব্রিটিশের উত্তরাধিকারী হলো আমেরিকা। জাযিরাতুল আরবসহ সমস্ত আরববিশ্বে এখন তাদেরই আধিপত্য ও দাপট।

ফলে এখন অনেক রাজা-বাদশাহ তাদের বিষয়-সম্পদ উদ্ধারে এগিয়ে এল। অথচ জাযিরাতুল আরবের নিরাপত্তাদান ও প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে এসব শাইখ ও রাজার কোনো অবস্থানই নেই।

এখন ইরাক দখল করার পর, তার অর্ধেক ভূমিতে আকাশ সীমায় চলাচল নিষিদ্ধকরণ, বাগদাদ প্রশাসন থেকে উত্তর কুর্দিস্তান স্বাধীনকরণ, সেখানে পর্যবেক্ষক দল প্রেরণ, তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদান- এসবের পরও জাযিরাতুল আরবে ক্রুসেডার বাহিনীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বরং তারা ইরাকে ফের নতুনভাবে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা অপেক্ষায় আছে, কবে লাখ লাখ মুসলমানকে হত্যা করে ইরাকের তেলক্ষেত্রগুলো দখলে নিতে পারবে?

এরপর তারা সৌদি আরবকে ভাগ করার দিকে মনোনিবেশ করবে, যেমনটি কংগ্রেসে স্পষ্ট বলা হয়েছে। এরপর মিশরের দিকে। তাদের মতে এটিই তাদের জন্য মহাপুরস্কার!

এখন ব্যাপারটি আর সহযোগিতার ব্যাপার নেই; বরং তা পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ভূমিতে মুসলমানদেরকে ক্রুসেডারদের দ্বারা দখলকরণ, অপহরণ, লুণ্ঠন, জুলুম ইত্যাদির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন এসব শাসক আমেরিকার অস্তিত্বের দেয়ালে এক বিবর্ণ পালিশ। এরপর সরকারি উলামায়ে কেরাম উপর থেকে পাঠানো ফতোয়ায় স্বাক্ষর করতে আসেন, যে ফতোয়ায় এ দখলদারিত্ব, লুণ্ঠন, ক্রুসেডীয় কর্তৃত্ব নয় শুধু, ইরাকে মুসলমানদের রক্ত প্রবাহিত করাকে পর্যন্ত জায়েয করে দেওয়া হয়েছে।

এরপর সৌদি সরকারের প্রধান মুফতী ফতোয়া প্রদান করবে যে, ইসরাইলের সাথে চুক্তি বৈধ। কারণ, তাদের সাথে চুক্তিকারী ‘ইয়াসির আরাফাত’ মুসলমানদের নেতা ছিলেন!

মুজাহিদগণ যখন ফায়লকায় আমেরিকানদের হত্যা করল, তখন কুয়েতের কিছু তথাকথিত দাঈ চিৎকার করে ওঠল। যাদেরকে এসব দাঈগণ জিম্মি নাম দিয়েছিল। সে সব ক্রুসেডারদের উপর জুলুমবাজির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তবে তারা ভুলে গেলেন যে, জিম্মিরা মুসলিম সরকারের ছায়ায় বসবাস করে এবং জিযিয়া প্রদান করে, তাদের উপর ইসলামের বিধানাবলি বলবৎ হয়। অথচ এখানে এসব শাইখ ও আমিরগণ ক্রুসেডারদের অস্ত্রের ছায়া ও কর্তৃত্বে বসবাস করেন, তাদের কাছে সাহায্য কামনা করেন এবং তাদেরকে সময়ে-অসময়ে প্রচুর সম্পদ দিয়ে তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন, তাদের চুল পরিমাণ বিরোধিতা করার সাহসও তাদের কারো নেই। সুতরাং কে কাকে জিযিয়া দেয়!? কে কার জিম্মায় আছে!? কে কার কর্তৃত্বে আছে!?

তারা এ কথাও ভুলে যান যে, কুয়েত জাযিরাতুল আরবের অন্তর্ভুক্ত এবং তাতে ইয়াহুদী-খৃষ্টানের অবস্থান মোটেও জায়েয নেই।

আল্লাহর পথে বাধাদানকারী এ শ্রেণীটি মানুষকে ফরয জিহাদ ছেড়ে শরীয়াহ থেকে বিচ্যুত শাসকদের আনুগত্য করার হুকুম দেয়। ফলে তারা কয়েকটি বিপদের সম্মুখীন হয়।

ক. মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে কাফেরদের দখলদারিত্ব স্থায়িত্বে সাহায্য করা।

খ. মুসলমানদের উপর ফরযে আইন জিহাদ থেকে তাদেরকে বিরত রাখা।

গ. শরীয়াহ বহির্ভূত বাতিল শাসনকে শরীয়াহর রঙে রঙিন করা।

ঘ. মুজাহিদীনকে গালি দেওয়া এবং তাদেরকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।

তাদের অন্যতম একটি কৌশল হলো, তারা বলে- জিহাদ ফরয ও প্রমাণিত। সেটিই মুক্তির পথ। তবে এখনো সময় হয়নি। এখন প্রস্তুতির সময়। এখন দাওয়াত দেওয়ার সময়।

এ নিয়ে তারা কঠিন ঝগড়া করবে। তবে একটি কঠিন প্রশ্ন থেকে তারা পালিয়ে বেড়ায়। এক শতাব্দী লাঞ্ছনার পরও কেন কোনো ধরনের প্রস্তুতি হয়নি!? এ প্রস্তুতি কখন শেষ হবে!? তাদের কাছে কোনো জবাব নেই। কারণ, তাদের এ প্রস্তুতির কোনো শেষ নেই। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً ﴿التوبة: ٤٦﴾

আর যদি তারা বের হবার সংকল্প করত; তবে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করত।(সূরা তাওবা: ৪৬)

তাদের দায়িত্ব ছিল, মানুষের আকীদা শুদ্ধ করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর যেভাবে বিশুদ্ধ তাওহীদ অবতীর্ণ হয়েছে এবং যেভাবে সালাফগণ বর্ণনা করেছেন, সেভাবে বর্ণনা দেওয়া। কিন্তু আফসোস! তারা কিছু বলে আর কিছু গোপন করে।

তাওহীদ বিষয়ে সাধারণ মানুষ ও দুর্বলদের সংক্রান্ত অংশই থাকে তাদের আলোচনাজুড়ে। তাগুত শাসকদের ইসলাম থেকে বের হওয়া, ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে তাদের সখ্যতা ইত্যাদি তাদের আলোচনায় আসে না।

আশ্চর্য কথা হলো, গত এক শতাব্দীকাল মুসলিমবিশ্ব ভিনদেশী আগ্রাসনের স্বীকার। ক্রুসেডারদের এ সামরিক উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হঠাৎ কিংবা তাৎক্ষণিক ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়; বরং তা একশ’ বছরেরও বেশি সময়ের নিরবিচ্ছিন্ন গোলামির ফল। তবুও আমরা এসব বুদ্ধিজীবী থেকে বিরল দু’একটি ইঙ্গিত-ইশারা ব্যতীত এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিক্রিয়া পাই না।

তারা মাঝে মধ্যে অভিযোগ তোলেন যে, “মুজাহিদগণ জাতিকে কল্যাণকর কিছুই দিতে পারে না। তাদের কল্যাণের তুলনায় তাদের অনিষ্টতার পাল্লাই ভারী।” তবে তারা একটি প্রশ্নের উত্তর দেয় না- ভালো কথা! তো তোমাদের প্রস্তাবিত জিহাদের পদ্ধতি কোনটি? যেখানে ক্ষতি নেই, লাভই লাভ!!

তাদের জবাব হবে, জিহাদ ছেড়ে দাও।

আপনি যখন তাদেরকে প্রশ্ন করবেন, আচ্ছা! আমরা ধরে নিলাম, মুজাহিদগণ জিহাদ থেকে বিরত থাকল, আপনাদের মতো জিহাদ না করে বসে থাকল; তাহলে কি ইসলামের শত্রুরা মুসলিম উম্মাহর উপর সীমালঙ্ঘন করা থেকে বিরত থাকবে?

ফেতনা-ফাসাদ কি উধাও হয়ে যাবে?

ইয়াহুদীরা কি ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যাবে?

ইসরাইল কি ফিলিস্তিনকে ইয়াহুদীকরণ, মসজিদে আকসা ধ্বংসকরণ, গ্রেট ইসরাইল প্রতিষ্ঠাকরণ বন্ধ করবে?

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কি তাদের ভ্রষ্টতা থেকে ফিরে আসবে?

অশ্লীলতার প্রচারকারীরা কি তাওবা করে ভালো মানুষ হয়ে যাবে?

তাগুত শাসকরা কি গদি ছেড়ে দেবে? জেলখানার দরজা খুলে দেবে? তার জল্লাদগুলোকে কি মানুষ হত্যা থেকে বিরত রাখবে??

তারা কি কিছু করবে? কিছুই কি তারা করবে?? করবে কি তারা কিছুই???

অতঃপর এসব প্রশ্নে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে যুবকদেরকে তারা বলে, কেন তোমরা পড়ালেখায় মনোযোগ দিচ্ছ না?

কেন তোমরা কাফেরদের সাথে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা করছ না?

কেন তোমরা মাদরাসা, ইয়াতীমখানা ও হাসপাতাল নির্মাণে ব্রতী হচ্ছ না?

কেনো তোমরা সহীহ আকীদার দাওয়াত দিচ্ছ না?

মনে হবে, তারা আমাদেরকে আকীদাশুদ্ধির দাওয়াত দিচ্ছে। আসলে তাদের দাওয়াতের সারকথা হলো, তোমরা কেন জিহাদ থেকে বিরত থাকছ না???

এটি একটি আকীদাগত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রোগ বিশেষ। এটিকে বেশি ভয় করতে হবে। কারণ, এর পরিণাম হলো শুধু হারানো, ক্ষতি, লাঞ্ছনা ও আত্মসমর্পণ।

তাদের দাওয়াতের সারকথা হলো, মুজাহিদীনকে জিহাদ থেকে বিরত রাখা, ময়দানকে মুজাহিদ শার্দুলদের থেকে মুক্ত রাখা; যাতে হানাদার বাহিনী নিরাপদ থাকতে পারে, তাদের গায়ে একটি কাঁটাও যেন না বিঁধে। তাই তো ইসলামের শত্রুরা এ শ্রেণীকে সুনজরে দেখে এবং সরকারকে তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে ইঙ্গিত দেয়।

০৩. কথিত সমঝোতার আহ্বানকারী

আকীদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা থেকে বিচ্যুত তৃতীয় শ্রেণীটি হলো: সেসব লোক, যারা ইসলামের শত্রুদেরকে বাঁচানোর জন্য শরীয়াহ থেকে বিচ্যুত সরকারগুলোর সাথে সমঝোতার আহ্বান করে।

তাদের দাবির সারাংশ হলো, আমরা চোরকে সহায়তা করব; যেন সে আমাদের কাছ থেকে চুরিকৃত বস্তু আমাদের হাতে ফিরিয়ে দেয়। আমরা পাপিষ্ঠের সাথে সমঝোতা করবো; যে সম্মান সে নষ্ট করেছে সে সম্মান যাতে সে সংরক্ষণ করে। তাদের নীতি মতে যদি বলি- আমরা ইয়াহুদী-নাসারার সাথে সমঝোতা করব; যাতে তারা আমাদের ভূমি থেকে শান্তভাবে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারে!?

তারা চায়, আমরা বাস্তবতাকে মিথ্যা বলে তাদের আওড়ানো বুলিগুলোকে সত্য হিসেবে মেনে নিই।

তাদের দাওয়াতের সারকথা হলো, মুসলমানদেরকে মূল শত্রুকে প্রতিহত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মুজাহিদীন নেতৃত্বকে সে সব দুর্নীতিবাজ শাসকের হাতে তুলে দিতে হবে, যাদের ইতিহাস ইসলামের বিরোধিতায় পরিপূর্ণ; যারা একটি দিনও ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি, যারা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করেনি। বরং ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য আমাদের ভূমিগুলো উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

০৪. আমেরিকান মুজাহিদ

এ যুগে আকীদাতুল ওয়ালা ওয়াল-বারা থেকে বিচ্যুত চতুর্থ শ্রেণী হলো: আফগানিস্তানের সেসব কথিত জিহাদী গ্রুপ (তাগুত সেনাদল); যারা আমেরিকার সাথে বন্ধুত্ব করে। তাদের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করলেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী তাদের পাহারা দিতে আসে, মার্কিন সেনাবাহিনী সুরক্ষা দেয় এবং মার্কিন জঙ্গীবিমানগুলো তাদের উপর ছায়া বিস্তার করে আর তারা দখলদারদের উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো পেয়ে নিজ জাতির ক্ষত-বিক্ষত দেহ ও মুজাহিদীনের রক্তের উপর উল্লাসে ফেটে পড়ে।

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ ﴿محمد: ٢٢﴾ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَىٰ أَبْصَارَهُمْ ﴿محمد: ٢٣﴾ أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا ﴿محمد: ٢٤﴾ إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَىٰ أَدْبَارِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَىٰ لَهُمْ ﴿محمد: ٢٥﴾ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لِلَّذِينَ كَرِهُوا مَا نَزَّلَ اللَّهُ سَنُطِيعُكُمْ فِي بَعْضِ الْأَمْرِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِسْرَارَهُمْ ﴿محمد: ٢٦﴾ فَكَيْفَ إِذَا تَوَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ ﴿محمد: ٢٧﴾ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ ﴿محمد: ٢٨﴾ أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَن لَّن يُخْرِجَ اللَّهُ أَضْغَانَهُمْ ﴿محمد: ٢٩﴾ وَلَوْ نَشَاءُ لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ ﴿محمد: ٣٠﴾ وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّىٰ نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ ﴿محمد: ٣١﴾

ক্ষমতা লাভ করলে, সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন আর তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন। তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? নিশ্চয়ই যারা নিজেদের নিকট সৎপথ ব্যক্ত হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের জন্য তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এ জন্য যে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে, তারা তাদেরকে বলে, আমরা কোনো কোনো বিষয়ে তোমাদের কথা মান্য করব। আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি অবগত আছেন। ফেরেশতা যখন তাদের মুখমণ্ডল ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে প্রাণ হরণ করবে, তখন তাদের কেমন দশা হবে? এটা এ জন্য যে, তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করে, যা আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অপ্রিয় গণ্য করে; ফলে তিনি তাদের কর্মসমূহ ব্যর্থ করে দেন। যাদের অন্তরে রোগ আছে, তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাদের অন্তরের বিদ্বেষ প্রকাশ করে দেবেন না? আমি ইচ্ছা করলে আপনাকে তাদের সাথে পরিচিত করে দিতাম। তখন আপনি তাদের চেহারা দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন এবং আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহের খবর রাখেন। আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যে পর্যন্ত না আমি জেনে নিই- তোমাদের জিহাদকারীদেরকে এবং সবরকারীদেরকে এবং যতক্ষণ না আমি তোমাদের অবস্থানসমূহ যাচাই করি।” (সূরা মুহাম্মাদ: ২২৩১)

 

উপসংহার

পরিশেষে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই।

০১. মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব করা এবং কাফেরদের সাথে শত্রুতা করা ইসলামী আকীদার গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়। তা ছাড়া ঈমান পূর্ণ হবে না। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارٰى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿المائدة: ٥١﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো নাতারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে; সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না।” (সূরা মায়িদা: ৫১)

কাফেরদের সাথে শত্রুতা পোষণ, এটি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার মৌলিক বিষয় এবং এটি তাগুতকে অস্বীকার করা ছাড়া পূর্ণ হয় না। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقٰى لَا انفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿البقرة: ٢٥٦﴾

অতএব, যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নেবে এমন সুদৃঢ় হাতল; যা ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা বাকারাহ: ২৫৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন-

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا ﴿النساء: ٦٠﴾

আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে; তারা তাতে ঈমান এনেছে। (কিন্তু) তারা বিরোধীয় বিষয়ে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়; অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছিল, যাতে তারা তাকে (তাগুত) প্রত্যাখ্যান করে। প্রকৃতপক্ষে, শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।” (সূরা নিসা: ৬০)

সুতরাং তাগুত ও তাদের সহযোগীদেরকে অবশ্যই বর্জন করতে হবে এবং তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتّٰى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ ﴿الممتحنة: ٤﴾

তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তাঁরা তাঁদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। কিন্তু ইবরাহীমের উক্তি তাঁর পিতার উদ্দেশে এর ব্যতিক্রম, তিনি বলেছিলেন, আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তোমার উপকারের জন্য আল্লাহর কাছে আমার আর কিছু করার নেই। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তোমারই উপর ভরসা করেছি, তোমারই দিকে মুখ করেছি এবং তোমারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন।” (মুমতাহিনা: )

০২. এই মৌলিক আকীদার ক্ষেত্রে শিথিলতার কারণে, সেই বিচ্ছেদটি ঘটে; যার মাধ্যমে ইসলামের শত্রুরা মুসলমান জাতিকে খতম করা, তাদের সাথে প্রতারণা করা, ভয় প্রদর্শন করা এবং বিভিন্ন মুসীবত-দুর্যোগে পতিত করার জন্য ঢুকে পড়ার সুযোগ পায়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

لَوْ خَرَجُوا فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ ﴿التوبة: ٤٧﴾

যদি তোমাদের সাথে তারা বের হত; তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করত না, আর অশ্ব ছুটাত তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদেরকে মান্যকারী। বস্তুত আল্লাহ জালিমদের ভালভাবেই জানেন।” (সূরা তাওবা: ৪৭)

০৩. এ মৌলিক আকীদায় শৈথিল্য প্রদর্শন মুসলমানের আকীদাকে ভেঙে দেয় এবং তার থেকে ঈমান ছিনিয়ে নেয়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلٰى أَعْقَابِكُمْ فَتَنقَلِبُوا خَاسِرِينَ ﴿آل‌عمران: ١٤٩﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা যদি কাফেরদের আনুগত্য কর; তাহলে তারা তোমাদেরকে পেছনে ফিরিয়ে দেবে, তাতে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।” (সূরা আলেইমরান: ১৪৯)

০৪. আমাদেরকে এ পার্থক্যটি জানতে হবে- ইসলামের পক্ষে প্রতিরোধকারী ইসলামের বন্ধু, মুসলমানদের উপর জুলুমকারী ইসলামের শত্রু। সেই ইতস্ততকারীকে চিনতে হবে; যারা শুধু নিজের স্বার্থটাই দেখে, উম্মাহর প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে হেয় করা এবং বাস্তব ময়দান থেকে তাদেরকে সরিয়ে দেওয়াই যাদের কাজ। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِن يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُّسَنَّدَةٌ يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنّٰى يُؤْفَكُونَ ﴿المنافقون: ٤﴾

আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। তারা যখন কথা বলে, আপনি সাগ্রহে তাদের কথা শুনেন। যদিও তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠ সদৃশ। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?” (সূরা মুনাফিকুন: )

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন-

مُّذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَٰلِكَ لَا إِلَىٰ هَٰؤُلَاءِ وَلَا إِلَىٰ هَٰؤُلَاءِ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا ﴿النساء: ١٤٣﴾

এরা দোটানায় (ঈমান ও কুফরের মাঝখানে) দোদুল্যমান, এদিকেও নয় ওদিকেও নয়বস্তুত যাকে আল্লাহ গোমরাহ করে দেন, তুমি তার জন্য কোনো পথই পাবে না।” (সূরা নিসা: ১৪৩)

০৫. আমরা কীভাবে মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের সামনে ময়দান খালি করে দিয়ে মডারেটদের আহ্বানে সাড়া দিতে পারি?

মুসলমানদের শত্রুদেরকে প্রতিরোধ করার অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টায় আমরা কীভাবে চুপ থাকতে পারি??

এটি প্রত্যেক মানুষের অধিকার। যে অধিকার প্রত্যেকে পেয়ে থাকে। আমরা কীভাবে তাদেরকে বাধা দানে চুপ থাকতে পারি? অথচ উম্মাহ সত্যিকারের মুজাহিদীনকে যথাসাধ্য সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে।

আমরা কীভাবে তাদের আহ্বান গ্রহণ করতে পারি? অথচ অপরাধীরা সব ধরনের পন্থায় আমাদের উপর জুলুমবাজি করে চলছে?? আমাদের ইজ্জত-সম্মানের কোনো তোয়াজ করা হচ্ছে না।

পূর্বে উল্লিখিত সম্ভাবনাসমূহ থাকা সত্ত্বেও ইসলামের বিজয়কামী কোনো মুসলমানই জিহাদ বন্ধ করা এবং উম্মাহকে তা থেকে বিরত রাখার আহ্বানে সাড়া দিতে পারে না। অথচ শত্রুরা প্রতিদিন আমাদের পবিত্র স্থানসমূহ, আমাদের জান-মাল-সম্পদে আঘাত হানছে।

আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-

لَا يَرْقُبُونَ فِي مُؤْمِنٍ إِلًّا وَلَا ذِمَّةً وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُعْتَدُونَ ﴿التوبة: ١٠﴾

তারা কোনো মুমিনের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার মর্যাদা দেয় না, আর অঙ্গীকারেরও না। আর তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা তাওবা: ১০)

হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-

إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ وَتَرَكْتُمْ الْجِهَادَ سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلًّا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ

যখন তোমরা ঈনা নামক সুদি লেনদেনে জড়াবে, গরুর লেজ ধরে থাকবে, কৃষি কাজে সন্তুষ্ট হবে এবং জিহাদ পরিত্যাগ করবে। আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন, তা ওঠিয়ে নেবেন না, যতক্ষণ না তোমরা দ্বীনের পথে ফিরে আস।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৬২)

০৬. আমরা জিহাদ বন্ধের আহ্বানকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করি না; বরং উম্মাহর সকল দল ও জামাআতকে জিহাদী কাফেলায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাই। জিহাদের পথে তাদেরকে চলতে বলি। জিহাদ প্রতিষ্ঠায় প্রতিযোগিতা করতে বলি। এ পথে অটল থেকে শত্রুদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে বলি। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ ﴿الصف: ١٠﴾ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿الصف: ١١﴾ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿الصف: ١٢﴾ وَأُخْرَىٰ تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِّنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ ﴿الصف: ١٣﴾

হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম; যদি তোমরা বুঝতে পার। তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং এমন জান্নাতে দাখিল করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটা মহাসাফল্য। এবং আরও একটি অনুগ্রহ দেবেন, যা তোমরা পছন্দ কর। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে এ সুসংবাদ দান করুন (সূরা সফ্ফ: ১০১৩)

০৭. তেমনিভাবে আমরা ইসলামের বিজয় প্রত্যাশী যে কোনো মুসলমানের প্রতি আমাদের হাত প্রসারিত করে দেই। এমনকি উম্মাহকে এ কঠিন দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য এমন যে কোনো কাজে আমরা আছি; যে কাজ উম্মাহকে এ যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা থেকে জাগ্রত করা, তাগুতের থেকে মুক্ত হওয়া, কাফেরদের সাথে শত্রুতা পোষণ, মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব এবং জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর উপর ভিত্তি করে হবে।

এমন পরিকল্পনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী প্রত্যেক ব্যক্তি দান করবে এবং ব্যয় করবে মুসলিমদের ভূমিগুলো স্বাধীন করার জন্য, ইসলামী ভূখণ্ডে ইসলামী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য, অতঃপর সারাবিশ্বে ইসলামের দাওয়াত প্রচারে।

০৮. আমরা মুসলিম উম্মাহকে আমাদের বুকের ওপরে চেপে বসা এসব বিপদকে হালকা মনে করা থেকে সতর্ক করছি। ইয়াহুদী ক্রুসেডার বাহিনী বায়তুল মুকাদ্দাস দখলে নিয়েছে। মক্কার হারাম থেকে নব্বই কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে মার্কিন সেনাবাহিনী। পুরো মুসলিম বিশ্বকে ঘেরাও করে রেখেছে তাদের ঘাঁটি, বাহিনী এবং রণতরীগুলো। তাদের নিকট আত্মসমর্পণকারী শাসকদের কাঁধের উপর ভর করে চলছে তাদের আক্রমণ।

আমরা অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে বাস করতে চাই না। বিপদ যেন আমাদের থেকে হাজার বছর এগিয়ে। আমরা একদিন সকালে চোখ খুলে দেখি, যেসব ইসরাইলী ট্যাংক গাজা ও জেনিনে বাড়ি-ঘর আর নিষ্পাপ শিশুদেরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়, তা আমাদের বাড়িটাও ঘেরাও করেছে।

ইরাক আগ্রাসন, ইয়েমেনে আবু আলী আল-হারেসীকে মার্কিন বোমায় হত্যা- সবই আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত যে, ফিলিস্তিনে মুজাহিদীন হত্যার ইসরাইলী এজেণ্ডায় আরব বিশ্বে ঢুকে পড়েছে। আমাদের প্রত্যেকই আমাগীকাল মার্কিন বোমারু বিমানের টার্গেট হবে। আমেরিকার অভিযোগ থেকে রেহাই পাবে এমন মুখলিস দাঈ ও ভদ্র লেখক পৃথিবীতে নেই। তাই আমাদেরকে আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত জেগে ওঠতে হবে।

মুসলিম যুবকরা যেন কারো অনুমতির অপেক্ষায় না থাকে। কারণ, আমেরিকা, ইসরাইল ও তাদের মুনাফিক-মুরতাদ সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরযে আইন হয়ে গেছে। যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। প্রত্যেক যুব সম্প্রদায়কে স্বীয় জাতির দায়িত্ব নিতে হবে। শত্রুকে প্রতিহত করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের ভূখণ্ডে যোদ্ধাদের পায়ের তলায় আগুন জ্বালাতে হবে; তারা যেন অন্যদিকে না হাঁটে।

০৯. পরিশেষে মুসলিম জাতি বিশেষত, মুজাহিদ ভাইদেরকে সবর ও ইয়াকীনের উপর অটল থাকার আহ্বান করছি। দ্বীনি ব্যাপার বিশেষত, দ্বীনের শীর্ষ চূড়া জিহাদের ব্যাপারে সবর করবেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿آل‌عمران: ٢٠٠﴾

হে মুমিনগণ ধৈর্য্যধারণ কর, মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর এবং সীমান্তরক্ষায় স্থিত হয়ে থাক। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক; যাতে তোমরা সফল হতে পার।” (সূরা আলেইমরান: ২০০)

আল্লাহর ওয়াদার প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস করবেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-

كَتَبَ اللَّهُ لَأَغْلِبَنَّ أَنَا وَرُسُلِي إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ ﴿المجادلة: ٢١﴾

আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, আমি এবং আমার রাসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।” (সূরা মুজাদালা: ২১)

উকবা ইবনে আমিরের সূত্রে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-

لَا تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى أَمْرِ اللَّهِ قَاهِرِينَ لِعَدُوِّهِمْ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ عَلَى ذَلِكَ

আমার উম্মতের একটি দল আল্লাহর পথে কিতাল করতে থাকবে। শত্রুদেরকে প্রকম্পিত করতে থাকবে। তাদের বিরোধীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি কিয়ামত এসে যাবে আর তারা এ পথেই অটল থাকবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং৫০৬৬)

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

وصلى الله علي سيدنا محمد وآله وصحبه وسلم.

 

***********************************

২ comments

  1. আল্লাহ আমাদের কবুল করুন আমীন। আল্লাহ আপনাদের কাজগুলোকে কবুল করুন আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জিহাদি আন্দোলন নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি ও জবাব  -রামযি ইউসুফ

জিহাদি আন্দোলন নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি ও জবাব -রামযি ইউসুফ

জিহাদি আন্দোলন নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি ও জবাব রামযি ইউসুফ জিহাদি আন্দোলন সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে ...