আত্মশুদ্ধি- পর্ব-২২ || মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হওয়ার কারণ || মাওলানা সালেহ মাহমুদ হাফিজাহুল্লাহ

مؤسسة الفردوس
আল ফিরদাউস
Al Firdawsتـُــقدم
পরিবেশিত
Presentsفي اللغة البنغالية
বাংলা ভাষায়
In the Bengali Languageبعنوان:
শিরোনাম:
Titled:
تزكية النفس- الحلقة ٢٢
سبب ضياع أخوة المسلمين
আত্মশুদ্ধি- পর্ব-২২
মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হওয়ার কারণ
Self-purification- Episode-22
The reason for the loss of Muslim brotherhood
لمولانا صالح محمود حفظه الله
মাওলানা সালেহ মাহমুদ হাফিজাহুল্লাহ
By Mawlana Saleh Mahmud Hafizahullah
للقرائة المباشرة والتحميل
সরাসরি পড়ুন ও ডাউনলোড করুন
For Direct Reading and Downloading
https://justpaste.it/tazkiah-22
https://archive.vn/OSXon
https://mediagram.me/be654ec8722517f8
https://archive.vn/RIdl6
https://web.archive.org/web/20201231….it/tazkiah-22
https://web.archive.org/web/20201231…654ec8722517f8
روابط بي دي اب
PDF (648 KB)
পিডিএফ ডাউনলোড করুন [৬৪৮ কিলোবাইট]
https://banglafiles.net/index.php/s/pSaQXtBBm7xzxwG
https://archive.org/download/22.-mus…aronsomuho.pdf
https://mega.nz/file/RNcH0abZ#Mgv381…J-htv3sfRKuVhc
روابط ورد
Word (326 KB)
ওয়ার্ড [৩২৬ কিলোবাইট]
https://banglafiles.net/index.php/s/zLgBJ28CLDM7P9H
https://archive.org/download/22.-mus…rchive.torrent
روابط الغلاف- ١
book Banner [198 KB]
বুক ব্যানার ডাউনলোড করুন [১৯৮ কিলোবাইট]
https://banglafiles.net/index.php/s/LpgzWMrttnYoWBz
https://www.mediafire.com/file/1r0ux…iz-22.jpg/file
https://archive.org/download/attosho…i-shriz-22.jpg
روابط الغلاف- ٢
Banner [310 KB]
ব্যানার ডাউনলোড করুন [৩১০ কিলোবাইট]
https://banglafiles.net/index.php/s/6ZwNSG4fxYNd8qg
https://www.mediafire.com/file/jh472…anner.jpg/file
https://archive.org/download/attosud…o%20Banner.jpg
****************
আল-ফিরদাউস মিডিয়া ফাউন্ডেশনের অফিসিয়াল চ্যানেলসমূহ
চারপওয়্যার অ্যাকাউন্ট ফলো করুন-
https://chirpwire.net/profile/alfirdawsmedia
চারপওয়্যার গ্রুপে জয়েন করুন-
https://chirpwire.net/groups/profile/14002/al-firdaws
টেলিগ্রাম চ্যানেল-
https://t.me/alfirdaws3
টেলিগ্রাম বট-
https://t.me/alfirdaws_1_bot
জিওনিউজ চ্যানেল-
https://talk.gnews.bz/channel/al-fir…-mussh-alfrdws
**********
مع تحيّات إخوانكم
في مؤسسة الفردوس للإنتاج الإعلامي
আপনাদের দোয়ায় মুজাহিদ ভাইদের স্মরণ রাখবেন!
আল ফিরদাউস মিডিয়া ফাউন্ডেশন
In your dua remember your brothers of
Al Firdaws Media Foundation
========================
মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হওয়ার কারণ
মাওলানা সালেহ মাহমুদ হাফিজাহুল্লাহ
সূচীপত্র
মুসলিমদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হওয়ার কিছু কারণ 10
এক: অন্যের কল্যাণকামীতার চিন্তা না করা 10
দুই: গীবত ও মিথ্যা অপবাদের প্রচার–প্রসার করা 13
কোনো গীবতকারীকে আমরা প্রশ্রয় দিব না 18
তিন. অন্যের প্রতি কু–ধারণা পোষণ করা 18
১. সুধারণা 21
২. কু–ধারণা 21
৩. বৈধ ধারণা: 21
সুধারণা পোষণের কিছু প্রক্রিয়া 22
১. দো’আ করা: 22
২. মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সর্বাবস্থায় ভাল ধারণা করা: 23
৩. কথা শ্রবণের সাথে সাথে সেটাকে উত্তমভাবে গ্রহণ করা: 23
৪. অপরের ওজর–আপত্তি গ্রহণ করা: 24
৫. মানুষের অন্তঃস্থ নিয়তে হস্তক্ষেপ না করা: 24
৬. মন্দ ধারণার কুফল সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকা: 25
চার. ভুল ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা 32
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন, ওয়াস–সালাতু ওয়াস–সালামু আলা সাইয়্যেদিল আম্বিয়া–ই ওয়াল–মুরসালিন,ওয়া আলা আলিহী, ওয়া আসহাবিহী, ওয়ামান তাবিয়াহুম বি ইহসানিন ইলা ইয়াওমিদ্দীন, মিনাল উলামা ওয়াল মুজাহিদীন, ওয়া আম্মাতিল মুসলিমীন, আমীন ইয়া রাব্বাল আ’লামীন।
আম্মা বা’দ:
মুহতারাম ভাইয়েরা! আমরা সকলেই দুরুদ শরীফ পড়ে নেই–
اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ، وَعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ،كما صَلَّيْتَ عَلٰى إبْرَاهِيْمَ، وَعَلٰي آلِ إبراهيم، إنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ، اَللّٰهُمَّ بَارِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ، وَعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى إبْرَاهِيْمَ، وَعَلٰى آلِ إبْرَاهِيْمَ، إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ.
প্রতি সপ্তাহের ন্যায় আজকে আবারও আমরা তাযকিয়া মজলিসে হাজির হতে পেরেছি, এই জন্য মহান আল্লাহ তা‘আলার দরবারে শুকরিয়া আদায় করি– আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হচ্ছে: কি কি কারণে মুসলিমদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়?
ঐক্য ও একতার গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনের আলোকে এ কথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ঈমানের পর ঐক্য ও একতা মুসলিম জাতির উপর আল্লাহ তা’আলার সবচেয়ে বড় নিয়ামত। আর বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা সবচেয়ে বড় শাস্তি।
কুরআন আমাদেরকে বিভিন্ন দল–উপদলে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছে। এক আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে বলেছে।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে নিজ অনুগ্রহের কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّـهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّـهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿١٠٣﴾
অর্থ: আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখ। এবং বিভেদ করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ রাখ যখন তোমরা একে অন্যের শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহ জুড়ে দিলেন। ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের দ্বার প্রান্তে ছিলে। আল্লাহ তোমাদেরকে সেখান থেকে মুক্তি দিলেন। -(সূরা আল–ইমরান ৩: ১০৩)
পবিত্র কুরআনে আদেশ করা হয়েছে, আমরা যেন বিভেদ সৃষ্টি না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করি।
নতুবা আমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং প্রভাব–প্রতিপত্তি হারিয়ে আমরা শত্রুদের হাতে লাঞ্ছিত হব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে–
وَأَطِيعُوا اللَّـهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ۖ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّـهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴿٤٦﴾
অর্থ: তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং পরস্পর কলহ করো না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্য ধারণ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। -(আল আনফাল ৮: ৪৬)
পবিত্র কুরআনে পারস্পরিক মতভেদ দূর করার উপায়ও বলে দেওয়া হয়েছে। কুরআন আমাদেরকে বলে, কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে তোমরা সমস্যা সমাধানের জন্য তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদালতে পেশ কর। এরপর কুরআন–সুন্নাহ মোতাবেক যে ফায়সালা আসে তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নাও । পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে–
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّـهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّـهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩﴾
অর্থ: হে মুমিনগণ তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, তাঁর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখতিয়ারধারী তাদের। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কোনো বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয় তাহলে তোমরা আল্লাহ ও পরকালে সত্যিকারে বিশ্বাসী হয়ে থাকলে সে বিষয়কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ন্যস্ত কর। এটাই উৎকৃষ্টতর পন্থা এবং এর পরিণামও সর্বাপেক্ষা শুভ। -(সূরা নিসা ৪: ৫৯)
আরো ইরশাদ হয়েছে–
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿٦٥﴾
অর্থ: (হে নবী) তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক ঝগড়া–বিবাদের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক মানে, তারপর তুমি যে রায় দাও সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ না করে এবং অবনত মস্তকে তা গ্রহণ করে নেয়। -(সূরা নিসা ৪: ৬৫)
দুই মুসলমানের মাঝে ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে মনোমালিন্য হলে ইনসাফ ও তাকওয়ার ভিত্তিতে তাদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করে দেয়াটাই অন্যদের প্রতি কুরআনের নির্দেশ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে–
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ﴿١٠﴾
অর্থ: প্রকৃতপক্ষে সমস্ত মুসলিম ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দু ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমাদের প্রতি রহমতের আচরণ করা হয়। -(সূরা হুজুরাত ৪৯: ১০)
আল্লাহ না করুন, এ বিভেদ যদি যুদ্ধের রূপ নেয় এবং মুসলমানরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন কুরআন আমাদেরকে বলে যে, রং ও বর্ণ, দেশ ও জাতীয়তা এবং গোত্র ও আত্মীয়তার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা কর যে, এদের মধ্যে হক ও সত্যের পথে কে আছে? আর কে সীমালঙ্ঘন করছে?
যে পক্ষ সীমালঙ্ঘন করবে তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা আবশ্যক। এবং সীমালঙ্ঘন ছেড়ে আল্লাহর হুকুম মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে কোনো ধরনের সন্ধি করতে কুরআনে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন–
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ۖ فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّـهِ ۚ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا ۖ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿٩﴾
অর্থ: মুসলিমদের দুটি দল আত্মকলহে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিও। অতঃপর তাদের একটি দল যদি অন্য দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তবে যে দল বাড়াবাড়ি করছে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যাবত না সে আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। সুতরাং যদি ফিরে আসে তবে তাদের মাঝে ন্যায়সঙ্গত ভাবে মীমাংসা করে দিও। এবং (প্রতিটি বিষয়ে) ইনসাফ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। -(সূরা হুজুরাত ৪৯: ৯)
ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব
ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
হাদিসের মর্ম: ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, অনুগ্রহ, মায়া–মমতার দৃষ্টিকোণ থেকে তুমি মুমিনদের দেখবে একটি দেহের মতো। যদি দেহের কোনো একটি অংশ আহত হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য অংশও তা অনুভব করে। ‘ (মুসলিম–৬৪৮০)
সুতরাং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের বিকল্প নেই। মুমিন মুসলমান যখনই ঐক্যবদ্ধ জীবন থেকে সরে দাঁড়ায়, তখনই শয়তান সে স্থান দখল করে। তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন–
عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الْجَنَّةِ فَلْيَلْزَمِ الْجَمَاعَةَ
তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শয়তান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দুরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। হাদিসের মান: সহীহ (তিরমিজি: হাদিস নং ২১৬৫)
তিনি আরও বলেছেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ، يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا “. وَشَبَّكَ أَصَابِعَهُ
হাদিসের মর্ম: ‘মুমিনগণ অপর মুমিনের জন্য একটি প্রাচীরের মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে মজবুত করে। এরপর তিনি এক হাতের আঙুল অপর হাতের আঙুলে প্রবেশ করান। ’ (বুখারী–৪৮১)
মুমিন মুসলমানের ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বহীন থাকা অকল্যাণকর। তা থেকে সতর্ক থাকতে হাদিসে এসেছে–
إِذَا كَانَ ثَلاَثَةٌ فِي سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوا أَحَدَهُمْ
হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তিনজন লোকও যদি কোনো সফরে থাকে। তবে একজনকে যেন আমির বা দলনেতা সাব্যস্ত করে। হাদিসের মান: হাসান, সহীহ ’(আবুদাঊদ হাদিস নং ২৬০৯)
এ সবের উদ্দেশ্য একটাই – পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করা। যার ফলে গড়ে উঠবে শান্তিপূর্ণ ইসলামি সমাজ। মনে রাখতে হবে হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত সেই বিখ্যাত হাদিসটি। যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন,
مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا فَمَاتَ إِلاَّ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً
‘যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধ থেকে এক বিঘতও বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করবে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু (নাউজুবিল্লাহ)। (বুখারী হাদিস নং ৭০৫৪)
আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন। এবার আসুন ভ্রাতৃত্ব নষ্টের দ্বিতীয় কারণটি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
মুসলিমদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হওয়ার কিছু কারণ
শয়তান যে সকল কূটকৌশল ব্যবহার করে মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং তাদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে দেয়, পবিত্র কুরআনে সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন আপনাদের সামনে পারস্পরিক বিভেদ সৃষ্টি ও ভ্রাতৃত্ব নষ্টের কিছু কারণ উল্লেখ করছি। কারণগুলো হচ্ছে:
এক: অন্যের কল্যাণকামীতার চিন্তা না করা।
দুই: গীবত ও মিথ্যা অপবাদের প্রচার–প্রসার করা।
তিন: অন্যের প্রতি কু–ধারণা পোষণ করা।
চার: চতুর্থ বিষয় ভুল ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা।
এক: অন্যের কল্যাণকামীতার চিন্তা না করা
মুসলমানদের মনে পরোপকারিতা, অন্যের কল্যাণকামীতা ও মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা দুর্বল হয়ে পড়া এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া পারস্পরিক ঝগড়া–বিবাদের অন্যতম কারণ। ইসলামের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা হৃদয়ে না থাকলে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ ও ইসলামী ঐক্যের গুরুত্ব মনে না থাকাই স্বাভাবিক। তখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়াকে আর দোষের কিছু মনে হয় না।
ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম এক উপায়। হাদিসের আলোকে আমরা জানি যে, ‘এক দেহ–এক প্রাণ’ চেতনায় বিশ্বাসী পুরো মুসলিম মিল্লাত। ইসলামের অপরিহার্য বিধান উপেক্ষা করার কারণেই মুসলিম মিল্লাত আজ বিভক্ত। পরস্পর হিংসা–বিদ্বেষ, নিন্দাবাদের ঘৃণ্য কাঁদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত মানবতা। ফলে মুসলিম বিশ্বে অশান্তির আগুন জ্বলছে। এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদার করা।
কুরআন–সুন্নায়ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদারের নির্দেশ এসেছে । পবিত্র কোরআনে একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিনদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ ۚ وَأُولَـٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿١٠٥﴾
অর্থ: “তোমরা সেই সব লোকদের মতো হইও না, যাদের কাছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও তারা বিভিন্ন দল–উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং নানা ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। ” (সূরা আল–ইমরান: আয়াত ৩; ১০৫)
যারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে তাদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার কথা এভাবে ওঠে এসেছে যে, আল্লাহ তা’আলা বলেন:
إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ ﴿٤﴾
অর্থাৎ: ‘নিশ্চয়ই (আমি) আল্লাহ তাদেরকে বেশি ভালোবাসি যারা আল্লাহর রাস্তায় এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে লড়াই করে, ঠিক যেন সীসাঢালা এক সুদৃঢ় প্রাচীর।’ (সূরা সফ: আয়াত ৬১)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘মুমিনগণ একজন মানুষের মতো, যার চোখ আক্রান্ত হলে সমস্ত শরীর আক্রান্ত হয় আর মাথা আক্রান্ত হলে সমস্ত শরীর আহত হয়।’ (মুসলিম)
অন্য হাদিসে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধভাবে জীবনযাপনে কিছু নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে–
عَنِ الْحَارِثِ الْأَشْعَرِيِّ رضي الله عنه ، أَنَّ نَبِيَّ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ
وأَنَا آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ اللهُ أَمَرَنِي بِهِنَّ : آمركم بِالْجَمَاعَةِ ، وَالسَّمْعِ ، وَالطَّاعَةِ ، وَالْهِجْرَةِ ، وَالْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللهِ
قَالَ أَبُو عِيسَى(الترمذي): هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ . (وصححه الألباني)
হাদিসের মর্ম: হযরত হারিস আল আশআরি রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি, স্বয়ং রব আমাকে এগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়গুলো হচ্ছে–
১. জামাআ’ত বদ্ধ হওয়া,
২. আমিরের নির্দেশ শোনা,
৩. আমিরের নির্দেশ মেনে চলা,
৪. হিজরত করা,
৫. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।
এটি একটি লম্বা হাদিস যার পরের অংশে আছে –
فَإِنَّهُ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ قِيدَ شِبْرٍ فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ, فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَإِنْ صَلَّى وَصَامَ؟ قَالَ: وَإِنْ صَلَّى وَصَامَ, فَادْعُوا بِدَعْوَى اللَّهِ الَّذِي سَمَّاكُمْ الْمُسْلِمِينَ الْمُؤْمِنِينَ عِبَادَ اللَّهِ
“যে ব্যক্তি জামাআ’ত বা সংঘবদ্ধতা ত্যাগ করে এক বিঘৎ পরিমাণ দূরে সরে যায়, সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে নেয়”। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! নামাজ প্রতিষ্ঠা এবং সাওম পালন করা সত্ত্বেও? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নামাজ কায়েম করা এবং রোজা পালন করা ও মুসলমান বলে দাবি করা সত্ত্বেও। ‘” (তিরমিজি)
দুই: গীবত ও মিথ্যা অপবাদের প্রচার–প্রসার করা
কুরআনের দৃষ্টিতে গীবত মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার নামান্তর। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ ۚ إِنَّ اللَّـهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ ﴿١٢﴾
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং (কারো) গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু”। [সূরা হুজুরাত ৪৯:১২]
গীবত এত সূক্ষ্ম গুনাহ যে, কোনো কোনো পরহেজগার ব্যক্তিও এ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। তখন এটা গুনাহ হওয়ার বিষয় তাদের মনে জাগ্রত থাকে না । কারণ অন্যের দোষ বর্ণনা করার মধ্যে মন এক ধরনের মিথ্যা আনন্দ খুঁজে পায়। তাই মধু মনে করে এ বিষ পান করতে থাকে। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ : ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ. قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِى أَخِى مَا أَقُولُ؟ قَالَ : إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ–
অর্থ: “গীবত কী তা কি তোমরা জান?” লোকেরা উত্তরে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “গীবত হলো তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে। ” জিজ্ঞাসা করা হলো, “আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তবে এটাও কি গীবত হবে?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলেই সেটা হবে গীবত আর তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে সেটা হবে বুহতান বা মিথ্যা অপবাদ। ”( মুসলিম; মিশকাত হা/৪৮২৮)।
সুতরাং মানুষের মধ্যে যে দোষ আছে এবং যার চর্চা সে অপছন্দ করে তা আলোচনা করাই গীবত। চাই সে দোষ তার শরীর সংক্রান্ত হউক কিংবা দ্বীন ও চরিত্র বিষয়ক হউক কিংবা আকার–আকৃতি বিষয়ক হউক। গীবত করার আঙ্গিক বা ধরনও নানারকম রয়েছে। যেমন ব্যক্তির দোষ আলোচনা করা, বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে তার কর্মকাণ্ড তুলে ধরা ইত্যাদি।
উক্ত হাদিসটিতে নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে ও স্পষ্ট ভাষায় গীবতের বর্ণনা দিয়েছেন
এবং গীবত করা কতখানি ঘৃণ্য একটি ব্যাপার উম্মতের বুঝবার জন্য তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। গীবত হচ্ছে কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ অন্যের নিকট বলা– যদিও সকলেই জানে যে সেই ব্যক্তি আসলেই দোষী। মোটকথা, একজন দোষী ব্যক্তির প্রমাণিত দোষ সম্পর্কে তার অনুপস্থিতিতে অন্যের নিকটে বলাবলি করাই গীবত। কেউ একজন একটা দোষ করেছে যা সকলেই জানে তারপরও বিনা কারণে শুধুই কিছুটা মজা কিম্বা ঠাট্টা করার জন্য দোষী ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ সম্পর্কে বলাবলি করা গীবত।
চিন্তা করে দেখুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রমাণিত ভাবে দোষী হয় তবুও কেবল তার দোষ সম্পর্কে তার অনুপস্থিতিতে অন্যকে বললে তা হবে গীবত। আর যদি তার দোষ ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়ে না থাকে অথবা সত্যিকার অর্থে যদি ঐ ব্যক্তি দোষী না হয়ে থাকে তবে তার দোষ সম্পর্কে বলা হবে মিথ্যা অপবাদ দেয়া যা গীবতের চেয়েও ঘৃণ্য এবং গীবতের চাইতেও কঠিন গুনাহের কাজ। আল্লাহ পাকের নিকটে গীবত বড়ই কদর্য ও খারাপ কাজ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ গীবতের ব্যাপারে খুবই উদাসীনতা দেখিয়ে থাকে। এজন্য গীবতের ভয়াবহতা প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
اَلرِّبَا اثْنَانِ وَسَبْعُونَ بَابًا أَدْنَاهَا مِثْلُ إِتْيَانِ الرَّجُلِ أُمَّهُ وَأَرْبَا الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُلِ فِيْ عِرْضِ أَخِيهِ–
অর্থ: ‘সূদের (পাপের) ৭২টি দরজা বা স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নতম স্তর হচ্ছে স্বীয় মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তুল্য পাপ এবং ঊর্ধ্বতম স্তর হ’ল কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার এক ভাইয়ের মান–সম্ভ্রমের হানি ঘটানো তুল্য পাপ’। (তাবারাণী; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৮৭১)।
যে মজলিসে কারও গীবত করা হয় সেখানে যে ব্যক্তিই উপস্থিত থাকুক তাকে তা নিষেধ করা ওয়াজিব। যে ভাইয়ের গীবত করা হয় তার পক্ষ নিয়ে সাধ্যমত তাকে সহযোগিতা করাও আবশ্যক। সম্ভব হলে ঐ মজলিসেই গীবতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এটা কেন করব? দেখুন হাদিসে কি বলেছেন । নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ–
‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মান–সম্ভ্রমের বিরুদ্ধে কৃত হামলাকে প্রতিহত করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তার থেকে জাহান্নামের আগুনকে প্রতিহত করবেন’। (আহমাদ হা/২৭৫৮৩; তিরমিজি হা/১৯৩১)।
আমাদের সমাজে হয়ত বিবেক বিবেচনা সম্পন্ন কোনো ভদ্রলোক সাধারণতঃ বুহতান বা মিথ্যা অপবাদ দেয়ার কাজটি করেন না। তবে আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরা, উঠা–বসা ও কথাবার্তায় অসাবধানতা বশতঃ গীবতের মত ঘৃণ্য অপরাধটি আমাদের অনেকের দ্বারা প্রায়ই সংঘটিত হয়ে থাকে। তাই গীবতের গুনাহ থেকে হেফাজত থাকতে হলে আমাদেরকে প্রথমেই গীবতের সংজ্ঞাটি ভালো ভাবে বুঝে নিতে হবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতই না সুন্দরভাবে ও পরিষ্কার বর্ণনায় গীবতের সংজ্ঞা দিয়েছেন। তা বুঝা আমাদের জন্য কঠিন কোনো বিষয় না।
আসল কথা হচ্ছে আমরা এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে চাই না। অথচ সৃষ্টিকুলের সেরা প্রাণী হিসেবে আমাদের এ বোধটি থাকা উচিত যে, একজন মানুষ তার মানবিক দুর্বলতা থেকে এক মুহূর্তের প্ররোচনায় কোনো দোষ করে থাকতেই পারে। আমার মধ্যে যে ঐ ধরনের মানবিক দুর্বলতা নেই তা নয়। হতে পারে আমিও ঐরকম পরিস্থিতিতে পড়লে ঐ একই রকমের দোষ করে ফেলতে পারতাম। তাই আমি যখন অন্যের নিকট কোনো দোষী ব্যক্তির দোষ অকারণে বলি বা শুনি তখন আমার লজ্জা পাওয়া উচিত। গীবত বলা বা শোনার ব্যাপারে এই প্রকারের লজ্জাবোধ যার আছে কেবল সে–ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান এবং সত্যিকারের ঈমানদার। গীবত সংক্রান্ত আয়াতটি আবার একটু খেয়াল করি ।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ ۚ إِنَّ اللَّـهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ ﴿١٢﴾
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং (কারো) গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু”। [সূরা হুজুরাত ৪৯:১২]
গীবত কতখানি ন্যক্কারজনক একটি ব্যাপার তা বুঝতে আমরা এই আয়তের দিকে মনোযোগ দেই। এখানে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। লক্ষ্য করুন, এখানে আল্লাহ তা’আলা গীবতের ব্যাপারে কত শক্তিশালী ও পরিষ্কার তুলনা দিয়েছেন বান্দার বুঝবার জন্য।
আদম সন্তান পরস্পর ভাই–ভাই। রক্তের সম্পর্কে না হোক আচার–আচরণ ও প্রকৃতিগত দিক থেকে সকল মানুষ একই মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। লোভ, ঘৃণা, হিংসা, সুবিধাবাদীতা ইত্যাদি মৌলিক প্রবণতা সব মানুষের মধ্যেই কম–বেশি রয়েছে। সেই হিসেবে সব মানুষই ভাই–ভাই। দোষী ব্যক্তি যেরকম রক্তমাংসের তৈরি মানুষ, গীবতকারীও তেমনই রক্তমাংসের তৈরি মানুষ। মুহূর্তের দুর্বলতায়, পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাবে, শয়তানের প্ররোচনায় যে কেউ কোনো একটি অপরাধ করে থাকতে পারে। ঐরকম অবস্থায় পড়লে কিংবা ঐরকম সুযোগ পেলে গীবতকারীও যে সেই অপরাধটি করত না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই স্বভাবগত দিক থেকে অপরাধকারী আর গীবতকারী একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। স্বভাবগতভাবে তারা ভাই–ভাই। তাই কেউ একজন যখন অন্য একজন অনুপস্থিত দোষী ভাইয়ের নামে গীবত করে তখন সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খায় বটে। এখানেও আল্লাহ তা’আলার তুলনাটা কত সুন্দর ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে লক্ষ্য করুন। এখানে “মৃত” বলতে “অনুপস্থিত” বুঝাচ্ছে।
একজন “মৃত” ব্যক্তির শরীর থেকে গোশত খুলে নিলেও মৃতব্যক্তি যেমন কোনো প্রতিবাদ করতে বা বাধা দিতে পারে না তেমনি একজন “অনুপস্থিত” ব্যক্তির নামে হাজারটা সত্য/মিথ্যা দোষের কথা বর্ণনা করে গেলেও অনুপস্থিত থাকার কারণে সে ঐসব কথার কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না কিংবা নিজের স্বপক্ষে বক্তব্য দিতে পারে না। অথচ ঐ একই কথা তার সাক্ষাতে বলা হলে সে নিশ্চয়ই আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু না কিছু বলতে চাইত।
তাছাড়া দোষী ব্যক্তির দোষ তার সাক্ষাতে বলাই সভ্য জগতের নিয়ম। সে কারণেই সভ্য সমাজের ইসলামী আদালতে দোষী ব্যক্তির বিচার চলাকালে কেবলমাত্র আসামীর উপস্থিতিতেই মামলার শুনানি বা আসামীর দোষ পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে।
ইসলামী খেলাফতের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেখানে কোনো আদালতের ভাগ নেই। অর্থাৎ উচ্চ আদালত, নিম্ন আদালত এমন কোন ভাগ নেই। কুফরি আদালতে এ ধরণের ভাগ হয়ে থাকে। কারণ তাদের আদালতের বিচারকগণ সাধারণত দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর হয়ে থাকে। যার কারণে নিম্ন আদালতে একটা রায় হলে সেটা অযৌক্তিক সাব্যস্ত করে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকে। কিন্তু ইসলামী আদালতে বিচারক হবে যোগ্য রায়ও হবে একবার, আপিলের কোনো সুযোগ নেই।
বর্ণিত আয়াতটিতে আরও অগ্রসর হয়ে গীবত করাকে “মৃত” “ভাইয়ের” গোশত “খাওয়া বা ভক্ষণ করা”র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা’আলা কতই না দরদী এক অভিভাবকের মত তাঁর অবুঝ বান্দাদেরকে মৃদু তিরস্কারের মাধ্যমে গীবত থেকে ফিরিয়ে রাখতে চাচ্ছেন, স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, একজন মুসলমান হিসেবে ও ঈমানদার হিসেবে গীবত বলা বা শোনার মত অভিরুচি কোনো মুসলমানের থাকা উচিত নয়।
কারণ গীবত করার অর্থ কেবল “মৃত” “ভাইয়ের” শরীর থেকে গোশত খুলে নেয়ার ব্যাপার নয় বরং গোশত খুলে নিয়ে তা “খাওয়া” বা “ভক্ষণ করা”র মত ঘৃণ্য একটি ব্যাপার। নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মত রুচি কেবল অসভ্য জংলী মানুষদেরই হয়ে থাকে। সভ্য মানুষের সমাজে মানুষ হয়ে মানুষের গোশত খাওয়ার কথা শোনা যায় না। বনজঙ্গলে বসবাসকারী কিছু জংলী, অসভ্য, বর্বর মানুষের কথা শোনা যায় যে, তারা “নর–মাংস ভক্ষণকারী”।
সভ্য, ভদ্র, সুশীল ও সামাজিক মানুষের পক্ষে যেমন নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া কোনো স্বাভাবিক আচরণ নয়, তেমনি গীবত বলা বা শোনা কোনো মুসলিম ভদ্রলোকের পক্ষে স্বাভাবিক আচরণ নয়। উল্লিখিত আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী গীবত চর্চা করা একটি মারাত্মক কবীরা গুনাহ। বর্ণিত আয়াতটিতে আল্লাহ তা’আলা গীবত করার মত মারাত্মক কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
মোটকথা গীবতকে একটি হালকা এবং গুরুত্বহীন ব্যাপার বলে মনে করা যাবেনা। প্রকৃতপক্ষে এটা মারাত্মক ক্ষতিকারক একটি বিষয়। এটা তাগুতি শক্তির একটি মারাত্মক অস্ত্র। আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন, দুষ্ট লোকজন কীভাবে গীবতকে ব্যবহার করে ছোট–বড় সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও কোন্দল সৃষ্টি করে এবং সেসব বিশৃঙ্খলা ও কোন্দল থেকে অবশেষে নিজেরা ফায়দা উদ্ধার করে। আপনার নিজের দেখা এমন অসংখ্য উদাহরণ আপনি খুঁজে বের করতে পারবেন। অতএব, আমরা সকলেই গীবত বলা থেকে তো বটেই এমনকি গীবত শোনা থেকেও সাবধান থাকব ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ সবাইকে কবুল করুন আমীন
কোনো গীবতকারীকে আমরা প্রশ্রয় দিব না
আমাদের সমালোচনা অনেকেই করবে কিন্তু আমাদের সেই জওয়াব দেওয়ার সময় নেই । আমরা আমাদের কাজে মনোযোগ দিব যারা জওয়াব দেওয়ার একমাত্র তারাই দিবেন। একথা নিশ্চিত যে, যেই ব্যক্তি আপনার সামনে অন্যের দোষ সম্পর্কে বলে থাকে, কোনো সন্দেহ নেই সেই ব্যক্তি আপনার অনুপস্থিতিতে অন্যের সামনে আপনার দোষও বলাবলি করে থাকে।
তিন. অন্যের প্রতি কু–ধারণা পোষণ করা
পারস্পরিক বিভেদ সৃষ্টি ও ভ্রাতৃত্ব নষ্টের তিন নাম্বার কারণ হচ্ছে– ‘অন্যের প্রতি কু–ধারণা পোষণ করা’।
মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে দুর্বল ও নিস্তেজ করে দেওয়ার তৃতীয় মৌলিক মাধ্যম হল, এক মুসলমান অপর মুসলমানের প্রতি কু–ধারণা পোষণ করা। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে কু–ধারণা থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে এবং অমূলক ধারণাকে গুনাহ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيراً مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ”। [সূরা হুজুরাত– ৪৯:১২]
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِيّاكُمْ وَالظّنّ، فَإِنّ الظّنّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ.
অর্থ: “তোমরা কু–ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কু–ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা”। -(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫১৪৩)
অন্যান্য মহৎ গুণের পাশাপাশি একজন মুসলিমকে যে বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে তা হল মানুষের প্রতি সুধারণা পোষণ করা। সুধারণা সমাজে কল্যাণ বয়ে আনে, ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট রাখে। সুচিন্তা–সুধারণা আমাদেরকে বিবেকবান উন্নত মানুষে পরিণত করে। প্রত্যেক বিবেকবান মানুষেরই সুধারণামূলক মনোভাব থাকা আবশ্যক। কেননা হাদিসের ভাষ্যমতে অপরের উপর ভাল ধারণা পোষণ করা নেকিতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
حُسْنُ الظَّنِّ مِنْ حُسْنِ الْعِبَادَة
অর্থ: “সুন্দর ধারণা সুন্দর ইবাদতের অংশ”। -(আহমাদ হা/৮০৩৬; আবুদাঊদ হা/৪৯৯৩, সনদ হাসান)।
পক্ষান্তরে কু–ধারণা মোটেও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। মন্দ ধারণা পোষণকারী ব্যক্তি হিংসা–বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব–কলহে ইন্ধন যোগায়। নানান অন্যায়–অসার কথাবার্তার বিস্তার ঘটায়। মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়ে মানুষের মনে অসন্তোষের দানা বাঁধতে শুরু করে। মন্দ ধারণার মধ্য দিয়ে মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধে চিড় ধরে। ফলে একতার বন্ধন ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যায়। এজন্যই আমাদের জন্য অপর মুসলিম ভাই সম্পর্কে সদা–সর্বদা সুধারণা পোষণ করা আবশ্যক।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلاَ يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ–
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং (কারো) গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু”। [সূরা হুজুরাত ৪৯:১২]
মন্দ ধারণা ও অতিরিক্ত ধারণা থেকেই হিংসা–বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। আর হিংসা–বিদ্বেষ থেকে অন্যায়ের জন্ম হয়। অনেক ক্ষেত্রে আমরা সুধারণার পরিবর্তে কু–ধারণাকে প্রাধান্য দিতে পছন্দ করি। অপর মুসলিম ভাইয়ের মানহানি করি, তার মান–মর্যাদা নিয়ে টানাহেঁচড়া করি। অথচ এগুলো অনুচিত কাজ। যারা মুজাহিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তাদের ক্ষেত্রে তো এগুলো কল্পনা করাও অসম্ভব। হাদিসে সংশয়–সন্দেহ থেকে দূরে থেকে পরস্পরের প্রতি সুধারণা পোষণ করতে বলা হয়েছে। মিথ্যা ও অনুমান ভিত্তিক বাগাড়ম্বর, বাকপটুতা তো দূরের কথা, অন্তরে মন্দ ধারণার বশবর্তী হতেও নিষেধ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِيَّاكُمْ وَ الظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ، لاَ تَجَسَّسُوا، وَلاَ تَحَسَّسُوا، وَلاَ تَبَاغَضُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا ‘
অর্থ: “তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, ধারণা ভিত্তিক কথাই হল সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। তোমরা একে অপরের দোষ অনুসন্ধান কর না। পরস্পর হিংসা–বিদ্বেষ কর না এবং পরস্পর দুশমনি কর না, বরং তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও হে আল্লাহর বান্দারা”। -(বুখারী হা/৪৮৪৯, ৫১৪৩)
ধারণার প্রকারভেদ
আল্লামা যামাখশারী রহ. ধারণাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন– ১. সুধারণা ২. কু–ধারণা ও ৩. বৈধ ধারণা। এবার আসুন প্রত্যেক প্রকারের হুকুম জেনে নিই।
১. সুধারণা
সুধারণা পোষণ করা ওয়াজিব – তা হল আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা। জাবের রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর মৃত্যুর তিনদিন পূর্বে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন,
لاَ يَمُوتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلاَّ وَهُوَ يُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللهِ عَزَّ وَجَلَّ
অর্থ: “তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ ব্যতীত মৃত্যুবরণ না করে”। -(মুসলিম হা/২৮৭৭)
এই হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, মুমিনদের প্রতি অপরাপর মুমিনদেরও সুধারণা পোষণ করা ওয়াজিব।
২. কু–ধারণা
কু–ধারণা করা হারাম। আল্লাহ তা’আলার প্রতি এবং মুসলিমদের বাহ্যিক কাজকর্মের উপর কু–ধারণা বা মন্দ ধারণা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক”। -(বুখারী হা/৬০৬৪)
৩. বৈধ ধারণা:
“যে ব্যক্তি মন্দ কর্ম সম্পাদনে অত্যধিক পটু, তার মন্দ কাজ–কর্ম প্রকাশ্যে ধরা পড়ে ও মানুষের নিকট মন্দ বলেই সে পরিচিত; এরূপ মানুষ সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা হারাম নয়, বরং বৈধ”। -(ছান‘আনী, সুবুলুস সালাম ৪/১৮৯)
সুধারণা পোষণের কিছু প্রক্রিয়া
এবার আসুন সুধারণা পোষণের কিছু প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা যাক। সুধারণা তৈরিকরণের কতিপয় উপায় রয়েছে, যেগুলো মানুষের মনে পারস্পরিক ভাল ধারণা সৃষ্টিতে সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।
সুধারণা তৈরিকরণের কতিপয় উপায় নিম্নে তুলে ধরা হল:
১. দো’আ করা:
দো’আ হল সকল কল্যাণের মূল উৎস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে ‘ক্বালবে সালীম’ তথা সুস্থ আত্মার জন্য শাদ্দাদ বিন আওস (রা.)-কে দো’আ শিখিয়েছিলেন।
শাদ্দাদ বিন আওস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, “হে শাদ্দাদ বিন আওস! তুমি যখন মানুষকে সোনা–রূপা জমা করতে দেখবে তখন এই কথাগুলো বেশি বেশি বল,
اَللَّهُمَّ إنِّيْ أسْألُكَ الثَّبَاتَ فِيْ الأمْرِ، والعَزِيْمَةَ عَلَى الرُّشْدِ، وأسْألُكَ مُوْجِبَاتِ رَحْمَتِكَ، وَعَزَائِمَ مَغْفِرَتِكَ، وَأَسْألُكَ شُكْرَ نِعْمَتِكَ، وَحُسْنَ عِبَادَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ قَلْباً سَلِيْماً، وَلِسَاناً صَادِقاً، وَأَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِمَا تَعْلَمُ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَعْلَمُ، وَأسْتَغْفِرُكَ لِمَا تَعْلَمُ؛ إِنَّكَ أَنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوْبِ.
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কাজের দৃঢ়তা, সৎ পথের উপর অবিচলতা প্রার্থনা করছি; আপনার রহমতের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সম্বলিত ভাল কাজ ও অনুপম ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নেয়ামতের শুকরিয়া, উত্তম ইবাদত ও ‘ক্বালবে সালীম’ তথা সুস্থ আত্মা, সত্যবাদী জিহ্বার জন্য দো’আ করছি, আপনার পরিজ্ঞাত সকল কল্যাণ প্রার্থনা করছি ও অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাচ্ছি এবং যা আপনি জানেন তা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, নিশ্চয়ই আপনি অদৃশ্য সমূহের মহাজ্ঞানী”। -(আহমাদ হা/১৭১১৪; সহীহাহ/৩২২৮)
২. মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সর্বাবস্থায় ভাল ধারণা করা:
আমাদের প্রত্যেকেই যদি কোন কথা বা কাজ ঘটার সাথে সাথেই অপর মুসলিম ভাই সম্পর্কে উত্তম ধারণা করি, তবে যে কোন পরিস্থিতিতে আমাদের অন্তরাত্মা সুধারণা পোষণ করতে বাধ্য থাকবে। এমনই একটি ঘটনার বৃত্তান্ত আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। আয়েশা রা.-এর উপর যখন অপবাদ আরোপ করা হল, তখন মুমিনদের উচিৎ ছিল মুনাফিকদের খপ্পরে না পড়ে উক্ত অপবাদ শ্রবণের প্রথম ধাপেই তাঁদের উপর সুধারণা পোষণ করা।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ
অর্থ: “যখন তোমরা একথা শুনলে তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণ নিজেদের বিষয়ে কেন ভাল ধারণা করেনি এবং বলেনি যে, এটা সুস্পষ্ট অপবাদ?” [সূরা নূর ২৪;১২]
৩. কথা শ্রবণের সাথে সাথে সেটাকে উত্তমভাবে গ্রহণ করা:
সালফে সালেহীনের কর্মপদ্ধতি ছিল যে, তারা কোন কথা শোনামাত্রই সেটাকে খারাপ অর্থে না নিয়ে উত্তমভাবে গ্রহণ করতেন।
হযরত উমর ইবনুল খাত্ত্বাব রা. বলেন,
وَلَا تَظُنَّنَّ بِكَلِمَةٍ خَرَجَتْ مِنِ امْرِئٍ مُسْلِمٍ شَرًّا وَأَنْتَ تَجِدُ لَهُ فِي الْخَيْرِ مَحْمَلًا
অর্থ: “তোমার ভাইয়ের ভিতর থেকে যে কথা বের হয়েছে, তাকে তুমি খারাপ অর্থে নিবে না। বরং কোন কথা শোনামাত্রই উত্তমভাবে নিবে”। -(বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৭৯৯২; জামেউল আহাদীছ হা/৩১৬০৪)
ইমাম শাফেঈ রহ. অসুস্থ হলে তার কতিপয় ভাই তাকে দেখতে এসে তাকে বলেন, “আল্লাহ আপনার দুর্বলতাকে শক্তিশালী করুন। ইমাম শাফেঈ রহ. বলেন, আল্লাহ যদি আমার দুর্বলতাকে শক্তিশালীর স্থায়িত্ব দেন, তবে তো আমার মৃত্যু হবে! তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি কল্যাণ ছাড়া কিছুই কামনা করিনি। তখন ইমাম শাফেঈ রহ. বলেন, আপনি যদি আমাকে গালিগালাজও করতেন, তবুও আমি তা ভাল অর্থেই নিতাম”। -(বায়হাক্বী, মানাক্বিবুল ইমাম শাফেঈ ২/১১৬–১১৭; তাবাকাতুশ শাফেঈয়্যাহ আল–কুবরা পৃঃ ১৩৫/১৩৮)
৪. অপরের ওজর–আপত্তি গ্রহণ করা:
অপর মুসলিম ভাইয়ের যে কোন কথায় বা কাজে তার ওজর–আপত্তি তালাশ করতে হবে। সালফে সালেহীনের উত্তম ধারণার কথা স্মরণ করতে হবে। তাঁরা মানুষকে ক্ষমা করার নিমিত্তে তার ওজর–আপত্তি সমূহ তালাশ করতেন। তাঁদের কথাই ছিল এমন যে,
فَاطْلُبُوْا لَهُ سَبْعِيْنَ عُذْرًا
অর্থ: “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের সত্তরটি ওজর অনুসন্ধান কর”। (–আবুদাঊদ হা/৫১৬৪, সনদ সহীহ; শু‘আবুল ঈমান হা/৮৩৪৪)
মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন,
إِذَا بَلَغَكَ عَنْ أَخِيكَ الشَّيْءُ تُنْكِرُهُ فَالْتَمِسْ لَهُ عُذْرًا وَاحِدًا إِلَى سَبْعِينَ عُذْرًا، فَإِنْ أَصَبْتَهُ وَإِلَّا قُلْ: لَعَلَّ لَهُ عُذْرًا لاَ أَعْرِفُهُ
অর্থ: “তুমি যদি তোমার মুসলিম ভাইয়ের মন্দ কিছু আঁচ করতে পার, তবে তাঁর ওজর গ্রহণ কর। যদি কোনই ওজর না পাও তবে বল, হয়তবা তার এমন ওজর আছে যা আমি জানি না”। -(বায়হাক্বী হা/৭৯৯১; ১০৬৮৪)
আমরা যদি অপরের ওজর গ্রহণ করতে পারি তবে মন্দ ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসবে। ইনশা আল্লাহ।
৫. মানুষের অন্তঃস্থ নিয়তে হস্তক্ষেপ না করা:
অন্যের মনের কথায় কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করলেই আমাদের মনে সুধারণা তৈরি হবে। মানুষের উচিৎ হল মনের সকল বিষয়কে একমাত্র গায়েবজান্তা আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা। আল্লাহ আমাদেরকে মানুষের অন্তর চিড়ে তার স্বরূপ উদঘাটনের নির্দেশ দেননি।
উসামা বিন যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে ‘হুরাক্বাহ’ নামক স্থানে ‘জুহাইনা’ গোত্রের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য পাঠালেন। সেখানে আমরা প্রভাতে তাদের উপর হামলা করলাম। আমি ও একজন আনসার মিলে তাদের একজনকে আক্রমণ করলাম। আমরা তাকে কাবু করে ফেললে সে ‘লা ইলা–হা ইল্লাল্লা–হ’ বলল। ফলে আনসার সাহাবী তাকে ছেড়ে দিল। কিন্তু আমি আমার বল্লম দ্বারা আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেললাম। যখন আমরা ফিরে আসলাম, তখন এ সংবাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন,
يَا أُسَامَةُ أَقَتَلْتَهُ بَعْدَ مَا قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّمَا كَانَ مُتَعَوِّذاً مِنَ الْقَتْلِ فَكَرَّرَهَا عَلَىَّ حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّى لَمْ أَكُنْ أَسْلَمْتُ إِلاَّ يَوْمَئِذٍ
অর্থ: “হে উসামা! ‘লা ইলা–হা ইল্লাল্লা–হ’ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে? আমি বললাম, সে হত্যা থেকে আত্মরক্ষার জন্য কালিমা পড়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথাটার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন। আরেক রেওয়ায়েতে আছে তুমি কি তার কলব চিড়ে দেখেছ? আর আমি আফসোসের সাথে কামনা করলাম, হায়! আমি যদি এ দিনের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করতাম”। -(বুখারী হা/২৪৬৯; মুসলিম হা/১৯০)
৬. মন্দ ধারণার কুফল সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকা:
অধিকাংশ মানুষের স্বভাব হল অপর ভাই সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করা। আর এই মন্দ বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে মানুষ একে অপরের প্রতি মিথ্যারোপ করে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ মনে করে।
অথচ মহান আল্লাহ বলেন,
فَلاَ تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
অর্থ: “তোমরা আত্মপ্রশংসা কর না, তিনিই সর্বাধিক অবগত কে বেশি পরহেজগার”। [নাজম ৫৩/৩২]
ইহুদীদের আত্মপ্রশংসার নিন্দা করে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেছেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنْفُسَهُمْ بَلِ اللهُ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَلاَ يُظْلَمُونَ فَتِيلًا انْظُرْ كَيْفَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ وَكَفَى بِهِ إِثْمًا مُبِينًا
“তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা স্বীয় আত্মার পবিত্রতা প্রকাশ করে? বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন এবং তারা সূতা পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না”। [সূরা নিসা ৪;৪৯]
মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন,
وَقَالَتِ الْيَهُوْدُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللهِ وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُمْ بِذُنُوبِكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بَشَرٌ مِمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيْرُ–
অর্থ: “ইহুদী ও নাসারাগণ বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও প্রিয়ভাজন। তুমি বল, তবে তোমাদের পাপকর্মের দরুন কেন তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়? বরং তাঁর সৃষ্টি মানুষের মত তোমরাও মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন”। [সূরা মায়েদাহ ৫;১৯]
তাই মন্দ ধারণাযুক্ত বাকচতুরতা থেকে বিরত থেকে তার কুফল সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকব ইনশা আল্লাহ। অতএব, সামাজিক জীবনে আমাদের পারস্পরিক আন্তরিকতা বজায় রাখতে হবে। অযথা সন্দেহ পোষণ থেকে বিরত থাকতে হবে। অনুমান নির্ভর ও গুজবের উপর ভর করে সমাজে অঘটনের অনেক নজির আছে। কথার সত্যতা যাচাই না করেই অন্যের বিরুদ্ধে বিষেদগার রচনার অপ–তৎপরতাও সমাজে কম নয়। মুসলমান হিসাবে আমাদের উচিত নিজেদেরকে মন্দ ধারণা থেকে পরহেজ করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে, অটুট থাকবে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ।
অপর ভাই সম্পর্কে ভাল ধারণা তৈরি করার মানসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈক সাহাবীকে হাতে–কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। একদা এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে অভিযোগ করল যে, আমার স্ত্রী কালো সন্তান প্রসব করেছে। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার কোন উট আছে কি? সে বলল, জি আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি রং সেগুলোর? সে বলল, সেগুলো লাল রংয়ের। তিনি বললেন, সেগুলোর মধ্যে কোন কালো বাচ্চা আছে কি? সে বলল, অবশ্যই আছে। তিনি বললেন, কালোগুলো কোথা থেকে আসল? সে বলল, সম্ভবত পূর্ব বংশের কোন রগের ছোঁয়া লেগেছে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
لَعَلَّ ابْنَكَ هَذَا نَزَعَهُ عِرْقٌ
অর্থ: “সম্ভবত তোমার সন্তানও পূর্ববর্তী কোন বংশের ছোঁয়া পেয়েছে”। -(বুখারী হা/৬৮৪৭)
এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মন্দ ধারণা পরিবর্তনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন উত্তম প্রশিক্ষক। ঐ ব্যক্তির ধারণা ছিল যে, তার স্ত্রী ব্যভিচারের শিকার হয়েছে এবং এ সন্তান তার ঔরসজাত সন্তান নয়। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে উন্নত মননের অধিকারী বানাতে সহায়তা করলেন।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি ছিল, যাকে হিমার তথা গাধা উপাধিতে ডাকা হতো। সে আল্লাহর রাসূলকেও হাঁসাতে পারত। মদ পানের অভিযোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন। একই অপরাধে অন্য একদিন আবারো তাকে উপস্থিত করা হল। আবারো তাকে চাবুক মারার নির্দেশ প্রদান করা হল। তখন জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ তার উপর লানত বর্ষণ কর। একই অপরাধে শাস্তির জন্য কতবার তাকে আনা হল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
لاَ تَلْعَنُوهُ ، فَوَاللهِ مَا عَلِمْتُ أَنَّهُ يُحِبُّ اللهَ وَرَسُولَهُ
অর্থ: “তোমরা তাকে লানত দিও না। আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে”। -(বুখারী হা/৬৭৮০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন,
إِنَّ حُسْنَ الظَّنِّ مِنْ حُسْنِ الْعِبَادَةِ
অর্থ: “নিশ্চয়ই সুন্দর ধারণা সুন্দর ইবাদতের অংশ”। -(আহমাদ হা/ ৮১৭৬; আবুদাঊদ হা/ ৪৯৯৩, সনদ হাসান)
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا قَالَ الرَّجُلُ هَلَكَ النَّاسُ فَهُوَ أَهْلَكُهُمْ
অর্থ: “তুমি যখন কাউকে বলতে শোন যে, সে বলল, লোকেরা ধ্বংস হয়ে গেল, তবে জেনে রেখ সেই সর্বাধিক ধ্বংসপ্রাপ্ত”। -(মুসলিম হা/৬৭৭৬; আদাবুল মুফরাদ হা/৭৫৯)
নেতিবাচক ধারণা মানুষকে ধ্বংসমুখী করে দেয়, মানুষের প্রতি নেতিবাচক ধারণা মানুষকে যেভাবে বিপথগামী করে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা তার স্পষ্ট উদাহরণ পেশ করেছেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
بَلْ ظَنَنْتُمْ أَنْ لَنْ يَنْقَلِبَ الرَّسُولُ وَالْمُؤْمِنُونَ إِلَى أَهْلِيهِمْ أَبَدًا وَزُيِّنَ ذَلِكَ فِي قُلُوبِكُمْ وَظَنَنْتُمْ ظَنَّ السَّوْءِ وَكُنْتُمْ قَوْمًا بُوْرًا–
অর্থ: “বরং তোমরা ধারণা করেছিলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুমিনগণ তাদের পরিবার–পরিজনের কাছে কিছুতেই ফিরে আসবে না। আর এ ধারণা তোমাদের জন্য খুবই সুখবর ছিল। তোমরা মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়েছিলে, আর তোমরা ছিলে ধ্বংসমুখী সম্প্রদায়”। [সূরা ফাতহ ৪৮;১২]
উল্লিখিত আয়াতটি হুদাইবিয়ার সন্ধির পরপরই নাযিল হয়েছে। আরব বেদুইনদের কতিপয় লোক কু–ধারণা করেছিল যে, মক্কার কুরাইশ কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদলবলে নিহত হবেন (নাউজুবিল্লাহ)। কিন্তু তারা যখন দেখল যে, তাঁরা ফিরে এসেছেন, তখন এই কু–ধারণা পোষণকারী ব্যক্তিগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার মিথ্যা অজুহাত পেশ করতে লাগল। তখন আল্লাহ তা‘আলা উপরোক্ত আয়াত নাযিল করে তাদের গোমড় ফাঁস করে দিয়েছেন। মুমিনের ভিত্তি অপর মুমিনের উপর পূর্ণ সুধারণার উপরে গড়ে উঠবে এটাই কাম্য। কথা বা কাজ উত্তম ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করবে। মন্দ ধারণার উপর ভিত্তি করে এই পর্যন্ত কত বন্ধুত্বের যে ফাটল ধরছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে, ভাইয়ে ভাইয়ে খুনাখুনি হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এসবেরই মূল হল নিছক ধারণা ও অনুমান। এই অন্যায় ধারণার কারণে পৃথিবীর অধিকাংশ লোকই বিভ্রান্তির শিকার।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ
অর্থ: “তুমি যদি দুনিয়াবাসীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে। তারা নিছক ধারণা ও অনুমানেরই অনুসরণ করে, আর তারা ধারণা ও অনুমান ছাড়া কিছুই করছে না”। [আনআম ৬/১১৬]
নেতিবাচক ধারণা ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বত্রই শত্রুতা, হিংসা–বিদ্বেষ, ঝগড়া–কলহের সূত্রপাত ঘটায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সর্বদা ভাল ধারণা পোষণ করতে বলতেন এবং মন্দ ধারণা থেকে সর্বদা নিরুৎসাহিত করতেন। কু–ধারণাকে পরিহার করার গভীর অনুশীলন করাতেন।
হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবাইর ও মিক্বদাদ রা. সহ আমাকে ‘রাওযায়ে খাখ’ নামক স্থানে পাঠালেন। আর বললেন, সেখানে একজন মহিলা আরোহী রয়েছে, যার সাথে লিখিত একটি পত্র আছে। তোমরা তার কাছ থেকে সেটা নিয়ে নিবে। অতঃপর আমাদের ঘোড়াগুলো পরস্পর প্রতিযোগিতা করে ছুটল। আমরা মহিলার কাছে পৌঁছে বললাম, হে মহিলা পত্রটি বের কর! সে বলল, আমার কাছে কোন পত্র নেই। আমরা বললাম, অবশ্যই তুমি পত্র বের কর অন্যথায় তোমার কাপড় খুলে চেক করা হবে। অতঃপর সে তার চুলের খোপার ভিতর থেকে চিঠিটি বের করল। আমরা সেটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমীপে উপস্থিত হলাম। তাতে লেখা ছিল, ‘হাত্বেব ইবনে আবু বালতা’র পক্ষ থেকে মক্কার মুশরিকদের প্রতি’। এতে তিনি তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কিছু কর্ম–কৌশলের সংবাদ পাচার করেছিলেন।
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘হে হাত্বেব! এটা কি?’ তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার বিষয়ে ক্ষিপ্রতা অবলম্বন করবেন না। আমি কুরাইশদের ঘনিষ্ঠ ছিলাম (সুফিয়ান বলেন, তিনি কুরাইশদের মিত্র ছিলেন, কিন্তু তাদের বংশীয় ছিলেন না। হাত্বেব অন্য সাহাবার সাথে হিজরত করে মক্কায় চলে এসেছেন বটে, কিন্তু তার পরিবার মক্কায় তার আত্মীয়দের তত্ত্বাবধানে রয়েছে)। আমি আমার আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নের আশংকা করলাম। তাই আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রেখে তাদেরকে হাত করার জন্য এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছি। কুফরি বশত কখনো আমি এ কাজ করিনি এবং আমি আমার ধর্ম থেকে মুরতাদ হয়ে যাইনি। আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরির উপর আমি সন্তুষ্ট নয়’। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে সত্য বলেছে। অন্যদিকে ওমর রা. বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এই মুনাফিকের ঘাড়ে তলোয়ার মারতে আমাকে সুযোগ করে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেন,
إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا، وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللهَ أَنْ يَكُونَ قَدِ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ، فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
অর্থ: “নিশ্চয়ই হাত্বেব বদরী সাহাবী, তুমি কি জান না আল্লাহ বদরী সাহাবীদের প্রতি উঁকি দিয়ে দেখে বলেন, তোমরা যা ইচ্ছে তাই কর; আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম”।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ
অর্থ: “হে মুমিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু রূপে গ্রহণ কর না। তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছ? অথচ তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তার সাথে তারা কুফরি করেছে। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তোমাদেরকে এ কারণেই বহিষ্কার করেছে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস কর। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যে আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাক তবে কেন তোমরা তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা কর। তোমরা যা গোপন কর বা প্রকাশ কর সে বিষয়ে আমি সম্যক অবগত”। [সূরা মুমতাহিনা ৬০;১]
অপর বর্ণনা মতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে, যুবাইর, তালহা, মিক্বদাদ বিন আসওয়াদকে পাঠালেন। –বুখারী হা/৩০০৭; মুসলিম হা/৬৪৮৫।
সুফিয়ান ইবনে হুসাইন বলেন, “আমি ইয়াস ইবনু মুআবিয়ার নিকট কোন এক লোকের বদনাম করলাম। তিনি আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ভারতবর্ষ, তুর্কী, সিন্ধু প্রদেশের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ? আমি বললাম, জী না। তিনি বললেন, তোমার থেকে রোমান, সিন্ধু, তুর্কী, ভারতীয়রা নিরাপদে রইল, অথচ তোমার মুসলিম ভাই তোমার থেকে নিরাপদ নয়! তিনি বলেন, এরপর থেকে আর কখনো আমি এরূপ করিনি”। –বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৩/১২১
আবু হাত্বেব ইবনে হিববান আল বাসাতী রহ. বলেন, “জ্ঞানীদের উপর আবশ্যক হল অপর মানুষের মন্দচারি থেকে নিজেকে পূর্ণভাবে মুক্ত রাখা, নিজের দোষ–ত্রুটি সংশোধনার্থে সর্বদা নিমগ্ন থাকা। যে ব্যক্তি অপরেরটা ত্যাগ করে নিজের ভুলত্রুটি সংশোধনে সদা ব্যস্ত থাকে, তার দেহ–মন শান্তিতে থাকে। আর যে অন্য মানুষ সম্পর্কে মন্দ ধারণা করে, তার অন্তর মরে যায়, আত্মিক অশান্তি বেড়ে যায় এবং তার অন্যায় কর্মও বৃদ্ধি পায়”। –রওয়াতুল উক্বালা: পৃ:১৩১
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের দোষ ও ছিদ্রান্বেষণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি মানুষকে স্ব–স্ব দোষ–ত্রুটি সংশোধনে আত্মনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহর কাছে যেসব কথাবার্তা–ধ্যানধারণার মূল্য নেই তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الإِيمَانُ قَلْبَهُ لاَ تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلاَ تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِى بَيْتِهِ
অর্থ: “ওহে যারা মৌখিক স্বীকৃতির মাধ্যমে ঈমান এনেছ, অথচ এখনো অন্তঃকরণে ঈমান পৌঁছেনি! তোমরা মুসলিমদের নিন্দা কর না, তাদের ছিদ্রান্বেষণ কর না। কেননা যে ব্যক্তি অপরের দোষ খোঁজে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আর আল্লাহ যার দোষ তালাশ করেন, তাকে তার নিজস্ব বাসগৃহেই অপদস্থ করেন”। –আবুদাঊদ হা/৪৮৮০, আলবানী একে সহীহ বলেছেন।
সুতরাং ভাইয়েরা! আমরা অন্যের প্রতি কু–ধারণা পোষণ করা এবং তাদের দোষ খোজা থেকে বিরত থাকব ইনশা আল্লাহ।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে অপর মুসলিম সম্পর্কে সুধারণা পোষণের ‘ক্বালবে সালীম’ তথা সুস্থ অন্তঃকরণ দান করুন, আমীন!
চার. ভুল ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা
পারস্পরিক বিভেদ সৃষ্টি ও ভ্রাতৃত্ব নষ্টের চার নাম্বার কারণ হচ্ছে, ‘ভুল ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা’। এই জন্য কোন কথা শোনেই অন্যের নিকট না বলা, বরং আগে যাচাই করে নেওয়া। অন্যথায় মিথ্যুক সাব্যস্ত হতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
অর্থ: “ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, শোনা কথা যাচাই–বাছাই ছাড়া বর্ণনা করা”। -(সুনানে আবুদাঊদ: ৪৯৯২)
সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে আল্লাহ তা’আলা কুরআনেও নির্দেশ দিয়েছেন। তথ্যের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস না থাকলে অথবা তথ্যদাতা অমুসলিম বা ফাসেক–ফাজের হলে তাদের সংবাদ যাচাই করতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوْا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوْا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِيْنَ
অর্থ: ”হে মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও”। [সূরা হুজুরাত ৪৯:৬]
মিথ্যা সংবাদ ও গুজবের ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাই কমবেশি অবগত আছি। স্বাভাবিক কথোপকথন থেকে শুরু করে বক্তব্য, লেখনী ও ছবির মাধ্যমে গুজব রটানো হয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো পরিণত হয়েছে গুজবের খনিতে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও চিন্তা–চেতনার বিরোধকে পুঁজি করে মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো হয় অধিক হারে। ক্ষেত্র বিশেষ অশ্লীল ও নোংরা ছবি বা ভিডিও প্রচার করা হয়।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَمَن يَكْسِبْ خَطِيئَةً أَوْ إِثْمًا ثُمَّ يَرْمِ بِهِ بَرِيئًا فَقَدِ احْتَمَلَ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
অর্থ: “আর যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ বা পাপ অর্জন করে, অতঃপর কোনো নির্দোষ ব্যক্তির ওপর তা আরোপ করে, তাহলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের বোঝা বহন করল”। [সূরা নিসা ৪:১১২]
কোনো খবর দেখলেই বা শুনলেই তা যাচাই–বাছাই ছাড়া বিশ্বাস করা অনুচিত। কোরআনে কারীমে কোনো ধরনের ভুল তথ্য অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে,
وَلاَ تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولـئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْؤُولاً
অর্থ: “যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে”। [সূরা বনী–ইসরাঈল ১৭:৩৬]
সুতরাং প্রমাণ ছাড়া শুধু সন্দেহের বশে কারও সম্পর্কে কোনো অপবাদ দেওয়া যাবে না। গুজব ছড়ানো যাবে না। তাগুতরা কেমন গুজব ছাড়ায় তা একটা ঘটনা থেকেই বুঝা যায় যে, অনেক আগে এক ভাইকে বলতে শুনেছি, তিনি বলছেন যে, আমরা এখনো কান্দাহার বিমানবন্দর পাহারা দিচ্ছি, আর এদিকে রেডিওতে শুনছি তারা প্রচার করছে যে, কান্দাহার বিমানবন্দর তাদের দখলে, তো ঐ ভাই বলছেন যে, দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে আমাদের আসল হালত উম্মত জানতে পারছে না তাদের অপপ্রচারের কারণে। গুজব রটিয়ে ও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মুসলিমদের বিশেষ করে মুজাহিদীনদের চরিত্র হনন করা ইসলামের শত্রুদের একটি পুরনো কূটকৌশল। অতএব এ ব্যাপারে সকলের সতর্ক থাকতে হবে। যে বক্তব্যের সত্যতা জানা নেই, সে সম্পর্কে কথা বলা যাবে না। প্রচারও করা যাবে না।
মিডিয়ার মিথ্যাচার
বর্তমান এই প্রযুক্তির যুগে তাগুত কাফিররা মিডিয়ার মাধ্যমে কত যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তার কোন সীমা নেই, তারা আমাদেরকে জনবিচ্ছিন্ন করার জন্য প্রায় সময়ই মিথ্যা বানোয়াট সংবাদ প্রচার করে থাকে। শুধু এতটুকুই না বরং তারা আমাদের মুজাহিদ ভাইদের ব্যাপারেও মদ গাঁজার মত ঘৃণ্য জিনিসের অপবাদ দিয়ে থাকে। যা আরো আগে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে দেখেছিলাম। এ জন্যই মিডিয়ার কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করে মিডিয়া যুদ্ধে সকলকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কোন ধরনের অবহেলা করা যাবে না। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় অর্থনীতিকে যদি শরীরের রক্ত প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তো মিডিয়াকে তুলনা করতে হবে বায়ু প্রবাহের সঙ্গে। বলা হয়, ছোট হয়ে এসেছে পৃথিবী। নিঃসন্দেহে তা মিডিয়ার কল্যাণে। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কী ঘটছে, কোথায় কোন খেলা হচ্ছে, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছবিসহ তা আমাদের সামনে হাজির করে দিচ্ছে। শুধু বর্তমান কেন, অতীতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন সবই ইলেকট্রনিক মিডিয়া কব্জায় নিয়ে তারপর প্রিন্ট মিডিয়া বা ছাপাখানাকে সরবরাহ দিচ্ছে। মানুষের কথাবার্তা, আচরণ, কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হয় তার মস্তিষ্ক দিয়ে। মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে সংগৃহীত তথ্য, জ্ঞান, চিন্তা ও বিশ্বাস। এই সংগ্রহ নির্ভর করে সংবাদ প্রবাহের উপর। তার মানে সংগৃহীত সংবাদ আমরা মস্তিষ্কে নিয়ে বিশ্লেষণ করি। সে বিশ্লেষণের ফলাফল নিয়ে আমাদের চিন্তা গঠিত হয়। সেই চিন্তা প্রতিফলিত হয় ব্যক্তির কথায় ও আচরণে। কাজেই ব্যক্তির জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিডিয়া বা সংবাদ সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্ব যুক্তি দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন নেই।
আমেরিকা যখন ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা অজুহাতে ইরাকের উপর আগ্রাসন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তখন মিডিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছিল, যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদের সমমূল্যের অর্থ মিডিয়ার পেছনে বিনিয়োগ করেছিল আমেরিকা। ইরাক আগ্রাসনের পক্ষে বিশ্ব জনমতের সমর্থন ধরে রাখার জন্য মিডিয়ার উপর এই নির্ভরতা ও অর্থ বিনিয়োগ তার বিফলে যায়নি। বিষাক্ত কিংবা দূষিত বায়ু প্রবাহ যেমন জীবনহানির কারণ হয়, আবার প্রভাত সমীরণ বা নির্মল বায়ু প্রবাহের ছোঁয়ায় ফুল ফোটে, ফসল ফলে, জীবন বাঁচে, তেমনি মিথ্যা বানোয়াট কিংবা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ বিশ্বসভ্যতার জন্য ধ্বংস বয়ে আনতে পারে, আবার জীবন জাগার চেতনায় চারদিক মুখরিতও করতে পারে। এ কারণেই ইসলাম সাংবাদিকতা বা সংবাদ সরবরাহের স্পর্শকাতরতার ব্যাপারে সতর্ক করেছে। এই জন্য পূর্বে উল্লেখিত হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কেউ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে যাচাই না করে তা বলে বেড়াবে।’ অর্থাৎ শুনেই তার সত্যতা যাচাই না করে অন্যের কাছে বলে বেড়ানো মিথ্যাচার হিসেবে গণ্য হবে।
মুহতারাম ভাইয়েরা! আজকে দেখুন মিডিয়াতে কাদের আধিপত্য বেশি। তাগুতদের আমরা দেখি যে, মিডিয়াগুলোতে ইহুদীদের আধিপত্যই বেশি। রয়টার্সের মত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা তাদেরই। টাইম, নিউজ উইকের মত বহুল প্রচলিত পত্রিকাগুলোর প্রভাবশালী সাংবাদিক ও কলামিস্ট তারাই। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ইহুদী শিক্ষকরাই অধিকতর প্রভাবশালী। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে মিডিয়া এসব শিক্ষকদের মতামতকেই অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশাসনও নির্দেশনা নেয় তাদের থেকেই। মিডিয়াতে ইহুদীদের প্রভাবের কারণেই ফিলিস্তিনে বসতি নির্মূলের পরও আগ্রাসী ইহুদীরা প্রচার পায় শান্তিবাদী রূপে। অথচ ইসরাঈলের জন্মই হয়েছে সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে। টিকেও আছে বিরামহীন সন্ত্রাস চালিয়ে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যুদ্ধ আর সন্ত্রাস চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে তারাই বিনষ্ট করেছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, মার্কিনীদের ছাড়াও তারাই এখন বিশ্বের বৃহৎ আগ্রাসী শক্তি। আর এদের সাফাই গাচ্ছে পাশ্চাত্যের মিডিয়া। মিডিয়ার হাতে জিম্মি পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতিবিদরাও, ইসরাঈলী স্বার্থের বিরোধিতা দূরে থাক তাদের স্বার্থে সামান্য নীরবতাও তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনে। মিডিয়ার আগ্রাসনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাদের বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞকে তারা একটি ন্যায্য যুদ্ধ রূপে বিশ্বময় প্রচার করছে। পাশ্চাত্য বিশ্বে সেটি গ্রহণযোগ্যতাও পাচ্ছে। মিডিয়া যে কীভাবে মানুষের মনের ভুবনে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে এ হল তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
এককালে বহু অর্থ ও বিপুল রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে সামরিক যুদ্ধ করেও এমনটি সম্ভব ছিল না। আগ্রাসী শক্তি রূপে এটিই হল মিডিয়ার ক্ষমতা। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব আজ সে শক্তির কাছেই প্রচণ্ডভাবে পরাজিত। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী জানা যায় যে, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে অপপ্রচারে অনেক মিডিয়া লিপ্ত আছে। তন্মধ্যে ২০০ টি রেডিও স্টেশন, ১,৭০০ টি টিভি চ্যানেল এবং দৈনিক, সাপ্তাহিক ও অন্যান্য প্রায় ২২ হাজার ম্যাগাজিন প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এই জরিপটি আরো ৫/৭ বছর আগের। এখন তো আরো অনেক বেড়েছে হয়ত।
মূলত, দ্বীনের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আলেম–ওলামা মিডিয়াতে অংশগ্রহণ না করায় নাস্তিক্যবাদীরা মুখ্যম সুযোগ পেয়ে ইসলামের নাম–নিশানা চিরতরে উড়িয়ে দিতে মিডিয়ার অপব্যবহারে মাতাল হয়ে লেগেছে। ইসলামে চিরনিষিদ্ধ অপকর্মগুলোকে মিডিয়াতে ব্যাপকহারে অতি জোরালোভাবে সম্প্রচার করা হয়। মিডিয়ায় প্রচারিত বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করলে অনায়াসেই অনুমেয় হয় যে, এটার প্রচারক কে বা কারা? বর্তমানে মিডিয়াতে অতি গুরুত্বের সাথে ইহুদী, খ্রিস্টানদের চাল–চলন, বেশ–ভূষণ, কাজ–কর্ম সম্প্রচার করা হচ্ছে। হিন্দুদেরও মিডিয়ায় প্রচারিত বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করে আমাদের মুসলিম দেশের মানুষেরা নাস্তিক ও লম্পটদের সংস্কৃতি ও উলঙ্গপনাকে পছন্দসই মনে করছে। ইসলামী সংস্কৃতির চেয়ে তথাকথিত উলঙ্গপনার সংস্কৃতিকে মুসলমানদের ছেলে–মেয়েরাও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ইসলামী তাহযীব–তামাদ্দুনকে এড়িয়ে চলছে। অধিকাংশ উলামারা তো এই কারণেই মিডিয়া থেকে দুরে আছেন যে তা অত্যন্ত অশ্লীল! কিন্তু তার প্রতিকার হয়তো তাদের চিন্তায় ছিলনা… এ মিডিয়ার যুগে যদি সঠিকভাবে ইসলাম প্রচার করা হয়, মিডিয়ার প্রতিটি সেক্টরে যদি ইসলামের বিধি–বিধান থাকে তাহলে ইসলামের যে কত বড় একটা খেদমত হবে তা বলাই বাহুল্য। এসব মিথ্যাচারের মূল কিন্তু মিডিয়ার অপব্যবহারই।
সুতরাং এসকল তাগুত মিডিয়ার মোকাবেলায় আমাদেরকে হক্ব মিডিয়ার কাজে খুবই একটিভ থাকতে হবে। আমাদের মিডিয়াকে শক্তিশালী করার দরকার আছে কি না ভাই? তাদের সামনে এর সঠিক প্রতিকার ও নিরাপদ ব্যবহার দেখিয়ে দিতে পারলে এটাকে পজিটিভ ভাবে নিবে। আর এখন ওয়াজ–মাহফিলের মাধ্যমে মিডিয়ার ব্যবহার দেখে কিছুটা হলেও উলামা হযরতরা বুঝেছেন অবশ্যই, যে মিডিয়া এর বিকল্প নেই। তাহলে আমরা যারা মিডিয়াতে কাজ করি তাদের কতটুকু সোচ্চার হওয়া দরকার? কিন্তু বর্তমানে যারা এর গুরুত্ব বুঝেছেন তারাও দেখি তাগুতি মিডিয়ার মিথ্যা নিউজ ঢালাও ভাবে প্রচার করছে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যে, আমাকে যে কাজটা দেয়া হয়েছে সেটা দিন কে দিন আমার হাতে পড়ে আছে, আমার কোন খবরই নেই। যে যেই বিভাগেই কাজ করি তারা একটু চিন্তা করে দেখি তো ভাই? যে, আসলে আমার দ্বারা কি পরিমাণ কাজ হওয়ার দরকার ছিল? যারা অডিও, ভিডিওর কাজে আছি তারা কতটুকু সময় দিচ্ছি এবং যারা অনুবাদের কাজে আছি তারা কতটুকু গুরুত্বের সাথে কাজ করছি? এভাবে সকল বিভাগের ভাইরা একটু চিন্তা করে দেখুন যে, আসলে কতটুকু কাজ হওয়ার দরকার ছিল আর কতটুকু হচ্ছে? আমাদেরকে এটা বুঝতে হবে যে, এটা আমাদের জিহাদি কাজের অন্যতম একটি কাজ। এটাকে অন্যসব কাজের উপর প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ এটা তো জিহাদেরই একটা অংশ। আসলে সামর্থ্য অনুসারে কাজ হচ্ছেনা। আল্লাহ আমাদেরকে অলসতা অমনোযোগিতা ও অবহেলা থেকে মুক্তি দান করুন। আমাদেরকে যথাসাধ্য কাজ করার তৌফিক দান করুন, আমীন।
স্বাভাবিকভাবে মিথ্যা সংবাদ প্রচারের দ্বারা পারস্পরিক ঘৃণার জন্ম নেয়, আর কারো প্রতি ঘৃণা জন্মালে অনেক সময় তা শুধু গীবতের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তখন অলীক সব কল্পকাহিনী বানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সত্য–মিথ্যা কথা প্রচার করা হয়। কখনো তো মূল ব্যাপারটি একরকম থাকে তবে এর সাথে নিজ থেকে বিভিন্ন কথা জড়িয়ে রং লাগিয়ে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ দেওয়া হয়। বাস্তবতা তখন পুরোপুরি বদলে যায়। অনেক কবীরা গুনাহের সমন্বয়ে এ পরিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, মুসলমানকে লাঞ্ছিত করা, মনে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি কবীরা গুনাহ এর সাথে জড়িয়ে থাকে। তাই কারো ব্যাপারে কোনো কিছু শুনলে যাচাই–বাছাই ছাড়া তা বিশ্বাস করা এবং সত্য মনে করে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য পবিত্র কুরআনে আদেশ করা হয়েছে। সেই সাথে এমন অবাস্তব সংবাদদাতাদের ফাসিক আখ্যায়িত করে তাদেরকে অবিশ্বাসযোগ্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একে অন্যের বিরুদ্ধে যখন এমন ভুল ও মিথ্যা সংবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে তখন পরস্পরের মাঝে শত্রুতার আগুন জ্বলে উঠে। ফলে মুসলমানদের যে সময় ও শক্তি কাফেরদের মোকাবেলায় ব্যয় হওয়া উচিত ছিল তা নিজেদের কোন্দল ও রেষারেষির মাঝেই ব্যয় হয়ে যায়। প্রত্যেকেই অন্যকে দোষী প্রমাণিত করে খাটো করে দেখানোর জন্য নিজের সমস্ত মেধা ও প্রতিভা খরচ করে। অপপ্রচার ও মিথ্যা–বানোয়াট সংবাদ প্রচারে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বিটিভি ১ নাম্বারে থাকবে মনে হয়।
যাই হোক ভাই… এভাবে মুসলমানদের সময় ও শক্তি, যোগ্যতা ও প্রতিভা এবং ধন–সম্পদ নিজেদের মাথা ফাটাফাটিতে শেষ হয়ে যায়। আর ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকে। কারণ, এ অবস্থায় মুসলমানরা নিজ শত্রুদের প্রতি দৃষ্টি দিতে পারবে না। আফসোস! বর্তমানে পুরো মুসলিম সমাজ এ ভয়াবহ শাস্তির আগুনেই জ্বলছে। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং লড়াই ও ঝগড়া বাঁধানোর জন্য শয়তানের আবিষ্কৃত কিছু কিছু উপায় এমন, যা কেউ খারাপ চোখে দেখে না। এ বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টির জন্য শয়তান কখনো ধর্মের পথ বেছে নেয় এবং কিছু চিন্তা বিভ্রান্ত লোকের মাথায় নিত্যনতুন ধারণা প্রসব করতে থাকে। কখনো রাজনীতির অঙ্গন বেছে নেয় এবং মুসলমানদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে রাজনৈতিক দাঙ্গা–হাঙ্গামার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কখনো আঞ্চলিক ভালোবাসা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের মূর্তি নির্মাণ করে কিছু ‘সামেরীকে’ তার পূজায় লাগিয়ে দেয়, যারা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে মুসলিম উম্মাহকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কখনো শ্রেণিগত বৈষম্য উসকে দিয়ে মুসলমানদের রক্তপাত ঘটাতে এবং সমাজ ও পরিবেশকে রণক্ষেত্রে পরিণত করতে উদ্বুদ্ধ করে। এসব কিছু আজ মুসলিম সমাজকে জাহান্নামের নমুনা বানিয়ে দিয়েছে। আর শয়তানের তৈরি এ জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গে মুসলমানরাই ইন্ধনে পরিণত হচ্ছে।
আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং শয়তানের সমস্ত চক্রান্ত থেকে হেফাজত করুন, আমীন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সর্বক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করার তাওফিক দান করুক। আমাদের মুজাহিদ ভাইদেরকে সব জায়গায় কাফেরদের ওপর বিজয়ী হওয়ার তাওফিক দান করুন। সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে আ’মালের উন্নতি করার তাওফিক দান করুন। জিহাদ ও শাহাদাতের পথে ইখলাসের সাথে অগ্রসর হওয়ার তাওফিক দান করুন। পরকালে আমাদেরকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমীন।
প্রিয় ভাইয়েরা, আমাদের আজকের মজলিস এখানেই শেষ করছি। ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।
আমরা সকলে মজলিস থেকে উঠার দোয়া পড়ে নিই।
سبحانك اللهم وبحمدك،أشهدأن لاإله إلا أنت،أستغفرك وأتوب إليك
وصلى الله تعالى على خير خلقه محمد وآله واصحابه اجمعين
وآخردعوانا ان الحمد لله ربالعالمين
***********