Templates by BIGtheme NET
BREAKING NEWS
Home / বই ও রিসালাহ / ইতিহাস- ঐতিহ্য / ‘তাওয়াক’ এর গল্প (শামের বরকতময় জিহাদের ময়দানে শাহাদাতবরণকারী এক মুজাহিদের ডায়েরি)-

‘তাওয়াক’ এর গল্প (শামের বরকতময় জিহাদের ময়দানে শাহাদাতবরণকারী এক মুজাহিদের ডায়েরি)-

‘তাওয়াক’ এর গল্প
(শামের বরকতময় জিহাদের ময়দানে শাহাদাতবরণকারী এক মুজাহিদের ডায়েরি)
পর্ব: ১

অনুবাদ: আশ-শাম মিডিয়া

বারা’ আত তামিমি

আবুল মুসান্না বারা’ আল-খালিফাহ আত-তামিমি (তাওয়াক) শামের জিহাদে শাহাদাতবরণকারী একজন মুহাজির মুজাহিদ।

তিনি ২৩/৩/১৪৩৪ হি: (৫/৩/২০১৩ ইং) ২০ বছর বয়সে শামের জিহাদের উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। তিন বছরের কিছু কম সময় শামের বরকতময় জিহাদে সক্রিয় ছিলেন। গত ১৪/৩/১৪৩৭ হি: (২৫/১২/২০১৫ ইং) জুমুয়ার দিন আসরের পরে হালাবে (আলেপ্পো) শাহাদাতবরণ করেন। শাহাদাতের সময় তার বয়স ছিল ২৩ বছর।

তিনি কুরআনের হাফেজ ও তালিবুল ইলম ছিলেন। হিজরতের পূর্বে একটি জামেয়াহ-এ (বিশ্ববিদ্যালয়) শরিয়াহ বিভাগে অধ্যায়নরত ছিলেন। একজন পরিশ্রমী ও ভালো ছাত্র ছিলেন। ইলমে দীনের প্রতি তার আগ্রহ ও ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। মসজিদে নববীর ইলমে দীনের হালাকাহগুলোর একজন পরিচালকও ছিলেন। পাশাপাশি একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন।

হিজরতের পর তিনি যেমন একজন বীর মুজাহিদ ছিলেন, তেমনই একজন দায়ী ও মুআল্লিমও ছিলেন। শামে তার হাতে বিশটি কুরআন শিক্ষার হালাকাহ চালু হয়েছে। যার ছাত্র সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচশত। মেয়েদের দীনী তা’লীমের জন্য চারটি একাডেমি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অংশগ্রহণ করেন। সে সময়ই তার ছাত্রিসংখ্যা সাড়ে তিন শত ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হালাবে মুসলিম নারীদেরকে দাওয়াত প্রদান ও হিজাবের প্রসারের লক্ষে ‘ইবনাতুল ইসলাম’ প্রকল্পটি চালু করার মূলে তিনিই ছিলেন। এই প্রকল্পের দাওয়াতে হাজার হাজার নারী হিজাব ব্যবহার শুরু করেন।

তার ওসিয়ত মোতাবেক এই লেখাগুলো একত্রিত করে প্রকাশ করেন শামের মুজাহিদীন।

শাইখ আব্দুল্লাহ মুহাইসিনী বইটির ভূমিকায় লিখেছেন:

“…এগুলো গল্প নয়, যদিও নাম দেয়া হয়েছে গল্প, এগুলো এমন কিছু কাহিনী যা মনের পর্দা ভেদ করে হৃদয়ের গভীরে করাঘাত করবে। তারপর আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদে বের হবার জন্য একটি জ্বলন সৃষ্টি করবে অন্তরে।

“এগুলো কিছু গল্প নয়, বরং আল্লাহর পথে জিহাদে বের হবার একটি জোরদার উদ্বুদ্ধকরণ। পাঠক আসুন, পড়ুন। পড়ে জিহাদে বের হোন। যদি ইতিমধ্যেই জিহাদে শামিল হয়ে থাকেন তাহলে দৃঢ় থাকুন, ধৈর্যধারণ করুন। সেভাবে ইতিহাস রচনা করুন যেভাবে তারা করেছেন…”

মায়ের হাতের কফি

আব্বা, আমার ইচ্ছা হয়, যদি তোমার পাশে থাকতে পারতাম। তোমার মাথায় চুমু খেতাম। শরীরের খবর নিতাম। তারুণ্যকে ধরে রাখতে যে সাদা চুলগুলো সব সময় তুমি মেহেদিতে ঢেকে রাখ, গভীরভাবে দেখতাম সেগুলো।

আব্বার সাথে আমার সকালটা অন্যরকম ছিল…। এখনো সবখানে তার ঘ্রাণ পাই…। যখন ফজর সালাতের পর ঘরে ফিরে আসতাম আম্মা তখন এক জাদুময় মমতা মেশানো হাসি নিয়ে আমার সামনে আসতেন।

আম্মার অভ্যাস ছিল সুবহে সাদিকের আগেই জেগে ওঠা। তিনি ঘুম থেকে উঠে আল্লাহ যতটা তাওফিক দেন সালাত আদায় করতেন।
তারপর সুবহে সাদিকের সময় ঘনিয়ে এলে একে একে আমাদের সবাইকে জাগিয়ে দিতেন।

আম্মা যখন আমাকে ডাকতে আসতেন তখন আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার ভান করতাম। কারণ আর কিছু না, আম্মার কণ্ঠ আমার ভালো লাগত। আমি জেগে ওঠার আগ পর্যন্ত আম্মা আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতেন। ছোট বাচ্চার মত আমাকে আদর করে দিতেন।

সবাই জেগে উঠলে আম্মা চা, কফি আর নাস্তা তৈরি করতে চলে যেতেন। আর আমরা যেতাম মসজিদে। সালাত শেষে আমরা বাসায় চলে আসতাম। আব্বা মসজিদ থেকে বের হতেন সব মুসল্লিদের শেষে।

আব্বাকে অনেক ভালোবাসি। তিনিও আমাকে অনেক ভালোবাসেন। প্রতিদিন সকালে আব্বার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকতাম তাকে মায়ের তৈরি এক কাপ কফি খাওয়াতে। সেই এক কাপ কফির সাথে তার প্রতি আমার ভালোবাসা ও অনুরাগটুকুও ঢেলে দিতাম। আর তিনি আমাকে বলতেন তার মনে জমে থাকা গোপন কথাগুলো।

আম্মার হাতের কফির স্বাদটাই অন্যরকম ছিল। সে রকম স্বাদের কফি আমি কোথাও পাই নি, আর কখনো পাবো-ও না। কারণ একটাই- সেটা তার হাতের।

আব্বা ছিলেন চাপা স্বভাবের। তার গোপন কথাগুলো কাউকে জানাতেন না। কিন্তু কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমাকে অনেক কিছুই বলতেন। আমাকে জানাতেন বিভিন্ন ব্যাপারে তার মতামত। আমার সাথে ভাগাভাগি করে নিতেন তার উদ্বেগের বিষয়গুলো। শোনাতেন তার কাহিনীগুলো।

আব্বার কথা বলার সবচেয়ে উপযোগী সময় এটাই ছিল…। একদিন আমি তার পাশে ছিলাম না। তিনি সেদিন আমাকে বকা দিয়েছিলেন।

তিনি চাইতেন আমি যেন প্রতিদিন এ সময় তার পাশে থাকি। যেন তার দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো ভাগাভাগি করে নিতে পারি। তিনি যেন আমাকে বলতে পারেন কাউকে না বলা কথাগুলো।

আব্বার অনেক গোপন কথা ছিল যা তিনি কাউকে বলেন নি। দিনের শুরুর মূহুর্তগুলো আর আম্মার হাতের কফি – এই দুটি একসাথে হয়ে আব্বার সেসব গোপন কথা প্রকাশ করে দিত…। আব্বা আমাকে সেগুলো বলতেন।

আব্বার গোপন কথাগুলো অনেক মূল্যবান ছিল। তিনি সেগুলোর ব্যাপারে আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন। আমার বুকের ভেতর সেগুলো আমানত রেখেছিলেন… আমি আব্বার আমানতগুলো সংরক্ষণ করেছিলাম…। একটা সময় পর্যন্ত তা রেখেছিলাম আমার কাছে…। হিজরতের পর সেগুলো গভীর কুপের ভেতরে নিক্ষেপ করেছি।

আম্মা তখন ব্যাস্ত থাকতেন। ছোটদেরকে ঘুম থেকে জাগাতেন। চুল আঁচড়ে দিতেন, কাপড় পরাতেন, নাস্তা খাওয়াতেন, স্কুলে যাবার আগে ওদের ব্যাগগুলো গুছিয়ে দিতেন। আর আমরা তাদের রেডি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম।

চেপে রাখা কষ্টকর কাজ। কাউকে বলতে পারলে কষ্ট হালকা হয়… খুব ইচ্ছা হয় আব্বার গোপন কথাগুলো শুনতে। কথাগুলোর আকর্ষণে না, বরং আব্বার লুকিয়ে রাখার কষ্ট লাঘব করতে।

শামের জিহাদের বাজার চালু হল। শামের অধিবাসীরা উদ্ধত পাপিষ্টদের জ্বালানো আগুনে ঝলসে যেতে লাগল। ফলে জিহাদের জন্য বের হওয়াটাও জরুরি হয়ে গেল…। আমি মায়ের হাতের চা আর আব্বার সাথে বসে কথা বলাকে অনেক উপভোগ করতে লাগলাম। কারণ, আমি অনুভব করছিলাম যে বিদায়ের মূহুর্ত ঘনিয়ে আসছে।

কাফেলার ঘোষক মুহাজিরদের কাফেলায় শামিল হবার দাওয়াত সবখানে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। এদিকে আব্বার প্রতি আমার ভালোবাসা আর আমার প্রতি তার ভালোবাসা আমাকে একটি জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিল…। কিন্তু আমি অনুভূতিগুলোকে পায়ে মাড়িয়ে সিদ্ধান্তে অনড় থাকলাম।

জিহাদে বের হবার ইচ্ছার কথা আব্বাকে স্পষ্টভাবে বলাটা ছিল কল্পনার বাইরে। আব্বা কখনো ভাবেন নি যে এক দিন অথবা এক মুহূর্তের জন্যও আমি তার থেকে পৃথক হব…। এটা জীবনের এমন একটি মাইলফলক ছিল, যা আমার ও আব্বার দুজনের জন্যই অনেক কষ্টের ছিল।

প্রথমে আব্বা ভেবেছিলেন আমি রসিকতা করছি, তাই অনুমতি দিয়েছিলেন। যখন আমি রওয়ানা হবার জন্য গোছাতে লাগলাম, তখন বুঝতে পারলেন যে এটা রসিকতা না। তার জন্য বড় একটা আঘাত ছিল এটা। যার একশ ভাগের একভাগও তিনি কখনো আশা করেন নি।

আমি বারবার পীড়াপীড়ি করতে থাকলাম…। আব্বা আমাকে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে থামাতে চেষ্টা করলেন…। তিনি আমাকে একটি উজ্জল ভবিষ্যতের কথা বলছিলেন, যেভাবে বাবারা ছেলেদের বলে…। কিন্তু কোন ভাবেই তিনি আমাকে টলাতে পারলেন না…। অবশেষে আমাকে বললেন আগে আম্মাকে রাজি করাতে।

আম্মার ইন্দ্রিয়গুলো যেন সব সময় আমার সাথেই থাকে…। আমি আম্মার কাছে গেলাম। হাত ধরে হাতে একটা চুমু খেলাম। আমি কোন কথা বলার আগেই তিনি বলে দিলেন আমার আসার কারণ। তার হৃদয় যেন আমার হৃদয়ের সাথেই স্পন্দিত হয়।

আমি তাকে একজন সত্যিকার ইমানদার নারী মনে করি…। আমার ইচ্ছার বিরোধিতা করেন নি। বরং আমার কাছে তার চাওয়া এটাই ছিল। তার হৃদয়টা কেবল তার ছিল না বরং পুরো উম্মাহর ছিল। তাই তিনি আবেগ ও অনুভূতিকে পদদলিত করে রবের নির্দেশকে সামনে রেখেছিলেন।

আম্মার সাথে অনেক কথা বললাম…। এটাই ছিল বিদায়ী আলাপ…। আমি আবেদন করলাম আম্মা যেন স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি দেন। আম্মা মাথা নিচু করে ফেললেন। বললেন, ‘আমার একথা মুখে বলার শক্তি নেই, বাবা!’ আমি তার মাথায় চুমু খেয়ে আব্বার কাছে ফিরে এলাম।

আব্বাকে জানালাম, আম্মা রাজি আছেন। আব্বা খুব অবাক হলেন। দীর্ঘ সময় চুপ থাকলেন। একটু পরে আবার অসম্মতি প্রকাশ করলেন। তিনি বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার কী হবে? ভবিষ্যত কী হবে? বিয়ে শাদির কী হবে?…’

আম্মা আমার সাথে ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিলেন। আর আমি দীর্ঘ সময় ধরে আব্বাকে রাজি করানোর চেষ্টা করছিলাম…। প্লেনের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। ফ্লাইটের আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি।

সেদিন সকালে আব্বাকে রাজি করাবার শেষ চেষ্টা করছিলাম। আমি বারবার অনুরোধ করছিলাম। খুব পীড়াপীড়ি করছিলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমার মন তার ভালোবাসায় কাঁদছিল। অবশেষে আল্লাহ আব্বার মনকে ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি দীর্ঘ এক নিরবতা দিয়ে কথা শেষ করলেন।

যখন আমি প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছি সেই মু্হূর্তে আব্বার মৌন সম্মতি পেয়ে গেলাম। আব্বার মাথায় চুমু খেয়ে ব্যাগটা গাড়িতে নিয়ে রাখলাম…। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। এক ফোটা অশ্রুও ঝরে নি তখন তার চোখ থেকে।

সকাল বেলার কফি আব্বার জন্য ছেড়ে গেলাম…। মায়ের হাতের সেই কফি ছেড়ে আসার পর অন্য কোন কফিতে আর স্বাদ পাই নি…।

“ওরা কেল্লা ও দেয়াল গড়ে আমাদেরকে স্বজন থেকে আলাদা করে রেখেছে…। আবার আমাদেরকেই বানিয়েছে অপরাধী…। আমাদেরকে কারাবাসের ভয় দেখায়…। আল্লাহর কাছেই বাদী-বিবাদী একত্রিত হবে।”

#অনুভব

তোমার ব্যথিত উম্মাহর অশ্রু ঝরেই চলেছে। অবনত দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। রক্ত ঝরা হাতটি তোমার দিকে বাড়িয়ে আছে। হয়তো তুমি বীর হয়ে তার সাহায্যে এগিয়ে যাবে…

অলসভাবে বসে থাকার সময় নেই…

এখন তোমার জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য হাজারগুণ বেড়ে গিয়েছে…

তাওয়াক…!

 

‘তাওয়াক’ এর গল্প
(শামের বরকতময় জিহাদের ময়দানে শাহাদাতবরণকারী এক মুজাহিদের ডায়েরি)
পর্ব: ২

অনুবাদ: আশ-শাম মিডিয়া

প্রশিক্ষণ শিবিরের কয়েকটি দৃশ্য

“আওস” আলবেনিয়ার একটি মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন… দুনিয়ার শাহাদাহ (সার্টিফিকেট) ত্যাগ করে আখিরাতের শাহাদাহ খুঁজতে জিহাদের ময়দানে এসেছেন!

“আব্দুর রহিম আজারবাইজানী”, বয়স ২১ বছর… তার পরিবারের মধ্যে তিনি একাই ইসলাম গ্রহণ করেছেন। বাকিরা এখনো কুফরের ওপরেই আছে। ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে বের হয়েছেন আল্লাহর দিকে হিজরতের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য…

“আবু মুসলিম আশ-শীশানী”… গাম্ভীর্যপূর্ণ শান্ত চেহারা, দীর্ঘ চুল। দৃঢ় মনোবল। কিন্তু তার চোখদুটি থেকে যেন রাহমাহ (দয়া ও করুণা) উপচে পড়ছে…

তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার ছেলেদের কথা। জবাবে বলেছিলেন, ‘বয়স ১৫ হলেই তাদেরকে একে একে পাঠিয়ে দেব জিহাদের ময়দানে’।

“শামিল” দাগেস্তানী, বয়স ১৫ বছর… ওর বয়স শুনে অবাক হয়েছিলাম। বলেছিলাম, ‘এখানে এসেছ কিভাবে?’ ও বলেছিল, ‘আমরা সপরিবারে হিজরত করেছি। আমার মা চেচনিয়ায়ও জিহাদ করেছেন, এখানেও এসেছেন জিহাদ করতে।

“আবু যর দাগেস্তানী”… প্রশিক্ষণের কঠিন পরিশ্রমের পর সাথি ভাইরা সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। কিন্তু তার তাবুতে মিটিমিটি আলো জ্বলতে দেখা যেত। আর শোনা যেত তাহাজ্জুদের সালাতে সুরা আনফাল তিলাওয়াত!

“আব্দুর রহমান আজারবাইজানী”… একদিন কুরআন তিলাওয়াত শুনছিলেন। এমন সময় তার দুই পায়ের মাঝে মাটিতে পিপড়ার বাসা দেখতে পেলেন। তার মায়া হল। বন্ধুদের থেকে কয়েক টুকরা বিস্কুট নিয়ে গুড়ো করে ছড়িয়ে দিলেন সেখানে। দৃশ্যটা ছিল মনে দাগ কাটার মত।

এদের মধ্যে একজনের এখানে পৌঁছাতে সময় লেগেছে ২৩ দিন। অনেক বিপদাপদ ও কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছেছেন তিনি… কারো লেগেছে এক মাস, আবার কারো তিন মাস… কিসের আকর্ষণ তাদেরকে এখানে এনেছে?!

আমাদের সাথে এমন কিছু লোকও ছিলেন যাদের ওজন ১৩০ কেজির বেশি। তারাও প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করছেন। শারিরিক যোগ্যতা অর্জন থেকে শুরু করে দুশমনের ছাউনিতে হামলার কৌশল পর্যন্ত সব প্রশিক্ষণই নিয়েছেন… যারা শারীরিকভাবে সক্ষম তাদের জন্য কিছু বাকি রেখেছেন কি?

কিছুদিন অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ চলছিল। তারপর এক সময় আবার আমাদের রবের রহমতে আকাশ ছেয়ে গেল। মুষলধারে বৃষ্টি নামল… এমন সময় বৃষ্টির ফোটাগুলোর রিমঝিম শব্দ ছাপিয়ে একটি ঘোষণা কানে এল: “সবাই গুছিয়ে নাও… যাত্রার সময় হয়ে গেছে…”

বিদায়ের আবেগময় মুহূর্তে ভাবছিলাম, ইমানের ভ্রাতৃত্ব তাগুতী সীমারেখার বিভেদকে কিভাবে মুছে ফেলেছে!…

আমরা বাসে চড়লাম। এ যেন জান্নাতে যাবার বাস। অন্যরা হাত নেড়ে বিদায় জানালো। একজন নিচুস্বরে বলল, ‘ভাই, কখনও নিস্তেজ হয়ে যেও না যেন’!

এক বছর পার হয়ে গেছে। আজ বৃষ্টির ফোটাগুলো ঝরে পড়ার সাথে সাথে সেই দিনগুলো মনে পড়ছে। মনে পড়ছে সেই ভাইদের কথা। তাদের অনেকেই আজ শহীদ। কেউ আহত, কেউ বন্দী। আবার কেউ ফিরে গেছে নিজ দেশে… তাদের মধ্যে অল্পই বাকি আছে।

#অনুভব

তোমার রবের দোহাই, আমাকে বল, তুমি আরামে ঘুমাতে পার কিভাবে যখন তোমার কিছু ভাইয়ের রক্ত প্রবাহিত হয়? যখন তারা জীবন-মরণের তুমুল লড়াইয়ের লিপ্ত? রাতের অন্ধকারে একটু জেগে ওঠ। কয়েক রাকাত সালাত আর রবের দরবারে ফরিয়াদ- এই দুইয়ের মাধ্যমে ঘন কালো আঁধারেও একটু আলো জ্বালিয়ে দাও।

ভাই, দোয়া করতে ‘শব্দের বিশাল ভাণ্ডার’ জানা থাকার প্রয়োজন নেই। দরকার নেই সাহিত্যপূর্ণ ভাষার। কেবল প্রয়োজন তরবারির মত পরিস্কার একটি হৃদয়ের, যা সৃষ্টিকর্তার সামনে ভেঙ্গে পড়বে। সত্যবাদিতার সাথে তাঁর সামনে লুটিয়ে পড়বে। তখন তার জন্য খুলে যাবে আকাশের দরজাগুলো! ওঠ, মিনতি জানাও রবের দরবারে। তুমি ভাবতেও পারবে না তোমার দোয়ায় কী হতে পারে। হতে পারে কোন দোয়া তাগুতের সিংহাসনকে টুকরো টুকরো করে দিবে। ঘটনা প্রবাহের দিক পরিবর্তন করে দিবে… ওঠ, হাত তোল। সবচেয়ে বড় অকর্মা তো সে যে দোয়াও করতে পারে না!

তাওয়াক…!

‘তাওয়াক’ এর গল্প
(শামের বরকতময় জিহাদের ময়দানে শাহাদাতবরণকারী এক মুজাহিদের ডায়েরি)
পর্ব: ৩

অনুবাদ: আশ-শাম মিডিয়া

‘জাযিরাহ’-এ হামলার রাত্রি

ক্যাম্পে আমরা ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম… হঠাৎ জরুরি অপারেশনের জন্য বের হবার নির্দেশ এলো। কারণ শত্রু বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। আমরা গুলির বেল্ট ও অস্ত্রশস্ত্র কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে আমীরের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকলাম।

‘আল্লাহর অশ্বারোহীরা, আরোহন কর!’ শোনা মাত্রই চোখ থেকে ঘুম পালিয়ে গেল। ভাইয়েরা শরীর থেকে ক্লান্তি ও অবসাদের ধুলা ঝেড়ে ফেলল। উদগ্রীব হয়ে রইল শত্রুর মোকাবেলার জন্য, তাদের রক্ত প্রবাহিত করার জন্য… ভাইদের প্রত্যেকে অপর ভাইয়ের মনোবল বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

গাইড আসার পর আমরা মুজাহিদদের রিবাতের পয়েন্ট উদ্দেশে রওয়ানা হলাম… উঁচুনিচু আঁকাবাঁকা পথ আর পথ সুগম করতে মুজাহিদদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দেখে চমকে গেলাম!

প্রায়ই আমাদের গাড়ি কোন বাড়ির আঙিনার এক দিক থেকে ঢুকে অন্য দিক থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল। কখনো কোন বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে নেমে অন্য পাশ থেকে উঠে যাচ্ছিলাম… এত কিছুর কারণ মূল পথটি স্নাইপারের নজরদারিতে ছিল!

পথ সুগম করতে এবং বাঁধাগুলো শাবল ও গাইতি দিয়ে ভেঙে দিতে মুজাহিদ ভাইয়েরা যে কঠোর পরিশ্রম করছিল, তা দেখলে আপনার নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হত। মনে পড়ে যেত (আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক রাহ. এর সেই বিখ্যাত কবিতা): ‘ওহে হারামাইনে ইবাদতকারী, যদি দেখতে আমাদেরকে…’

আমরা মুজাহিদদের অবস্থানে পৌঁছে গেলাম… সেখানে ইমানদীপ্ত নুরানী চেহারার মুজাহিদদেরকে দেখতে পেলাম। তারা শত্রুর মুখোমুখি হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, রবের দরবারে মিনতি করছিল আর যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরি করছিল।

আমাদের শাইখ আব্দুল্লাহ মুহাইসিনীকেও সেখানে দেখলাম। তিনি মুজাহিদদের সাথে কাতারবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দোয়া ও ফরিয়াদে মশগুল ছিলেন। তাকে বলতে শুনলাম, ‘আল্লাহ, তোমার মাজলুম বান্দাদের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের তাওফিক দিয়ে আমাদের ওপর অনুগ্রহ কর…’

ভারি অস্ত্রের গোলাবর্ষণ শুরু হল… ৫৭ মি.মি. কামান চালক আবু মুয়াবিয়াহ জাযরাবী আমাদেরকে সরে যেতে বলল। সে তাকবির দিয়ে ফায়ার করছিল। প্রচণ্ড শব্দে মাটি কেঁপে উঠছিল, সেই সাথে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছিল আগুনের একটি গোলক!

ভারি অস্ত্রের গোলাবর্ষণ চলছিল, এমন সময় ওয়ারলেসে আড়ি পেতে ‘হিযবুল লাত’ (অর্থাৎ, মুশরিকদের উপাস্য ‘লাত’ এর বাহিনী। এটা মুজাহিদীনের দেয়া নাম। আর ওরা নিজেদেরকে ‘হিযবুল্লাহ’ বলে।) এর একজন সৈন্যের কথা শুনতে পেলাম। মনে হল সে আমাদের অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছে। কামান চালককে বলল এদিকে ফায়ার করতে। কিন্তু কামান চালক দ্বিধায় পড়ে গেল। তখন কমান্ডার বলল, ‘তুমি তোমার মত ফায়ার চালিয়ে যাও, ওরা কোথায় বোঝা যাচ্ছে না।‘

‘ইনগিমাসি হামলা’র জন্য কিছু মুজাহিদ নির্বাচন করা হল। (এটা মুজাহিদীনের হামলার বিশেষ একটি পদ্ধতি। অর্থাৎ, হামলা চালিয়ে শত্রু ছাউনিতে ঢুকে পড়া।) ইনগিমাসি মুজাহিদরা আল্লাহর ওয়াদার প্রতি আস্থা রেখে ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে গেল দুশমনের আস্তানা গুড়িয়ে দিতে। বারবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছিল তারা…

ইনগিমাসিরা মুজাহিদদের ভবনগুলো ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেল। তখন তাদের ও কুফফারদের ভবনগুলোর মাঝে কেবল খোলা মাঠ ছিল।

আকাশের দিকে তাকাল তারা। সুন্দর গোলাকার চাঁদটা যেন ফিসফিস করে বলছিল, ‘তোমাদের সাথে সাক্ষাত করতে খুব ইচ্ছা করছে!’

ইনগিমাসি মুজাহিদীন তীব্র স্রোতের গতিতে ছুটে পার হল খোলা জায়গাটা। কখনো ক্রোলিং করে কখনো গড়িয়ে, আবার কখনো দৌড়ে।

তারা শত্রুদের প্রথম দুটি ভবনের কাছে পৌঁছে ছোট ছোট তিনটি ‘সারিয়া’য় (ছোট গ্রুপে) ভাগ হয়ে গেল, যেন সবদিক থেকে হামলা করা যায়…

ককেশীয়দের গ্রুপটি ডান দুশমনদের ডান দিকে অবস্থান নিল। প্রথম আক্রমণ তারাই করল…

এমন দুঃসাহসী হামলার মুখে বাতিলের সৈন্যরা একেবারেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। বাম দিকে ছুটে পালাল তারা…

‘শারঈ’দের গ্রুপটি আগে থেকেই ওৎ পেতে বসে ছিল। একদল লোককে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে দেখল তারা। ‘শারঈ’দের আমীর বললেন, ‘সিমসিম সিমসিম’। (শব্দটির অর্থ ‘তিল’।) কোন জবাব এল না। তখন সবাই গুলিবর্ষণ করল ওদের ওপর!

‘সিমসিম’ হল সংকেত, এর সঠিক উত্তর ‘ঈদ’। এই সংকেতের উদ্দেশ্য বন্ধু আর শত্রু আলাদা করা। আপনি ‘সিমসিম’ বলার পর যদি জবাব আসে ‘বিত্তিখ’ (অর্থাৎ, তরমুজ) তাহলে সিলেক্টর লিভারটি নিচের দিকে নামিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ব্রাশ ফায়ার করে দিতে পারেন

কুফফাররা পালিয়ে গেলে প্রথম দুটি ভবন মুজাহিদদের দখলে এসে গেল। তারা সেখানেই অবস্থান করল।

সেখানে আজকের ডিউটির কাগজপত্র পাওয়া গেল। আরো কিছু লাল ফিতা পাওয়া গেল যেগুলোতে লেখা ছিল, ‘ইয়া হুসাইন, ইয়া আলি’। আশুরার দিনের জন্য বানানো হয়েছিল সেগুলো।

‘হিযবুল লাত’ এর একজন সৈন্যর মোবাইল ফোন পাওয়া গেল। কল লিস্টের একদম ওপরের নাম্বারটাতে কল দিল ভাইয়েরা। বলল, ‘তোমাদের সহকর্মীকে মেরে ফেলেছি’… সম্ভবত মারাই গিয়েছে ফোনের মালিক

হিযবুল লাতের সৈন্যদের রেজিস্ট্রি খাতা পাওয়া গেল। খাতার শুরুতে ছিল তাওহিদ- ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’, আর শেষে ছিল কুফর- ‘ইয়া যাইনাব, ইয়া আলি…’ ওদের ওপর লাগাতার আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক…

ককেশীয় মুজাহিদদের তর সইছিল না। তারা ছুটে গেল অন্যান্য ভবনগুলোতে হামলার জন্য। আর কিছু ভাই থেকে গেল প্রথম দুটি ভবন পাহারায়।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছিল… যাদের ঘুম আসছিল তাদের কেউ ঠাণ্ডা মেঝেতেই শুয়ে পড়ছিল, কেউ আবার পালা করে বিছানায় ঘুমাচ্ছিল। কয়েকজন ঘুমাচ্ছিল, তাদের জেগে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিল আর ক’জন।

একদিকে কনকনে শীত, অন্যদিকে একটানা গোলাগুলির শব্দ। একের পর এক মর্টারের শেল বিস্ফোরিত হচ্ছিল। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল স্প্লিন্টার।

হঠাৎ এক ভাই চিৎকার করে সাহায্যের আবেদন করল। একটি স্প্লিন্টার তার মাথায় আঘাত করেছে!

ফজর হতে বেশি বাকি নেই। বৃষ্টির ফোটার মত গোলাবর্ষণ হচ্ছে। এর মধ্যে এক মুহূর্তও ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব না… এদিকে ভাইয়েরা একটির পর একটি ছাউনি শত্রুমুক্ত করে অনবরত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রশংসা কেবলই আল্লাহর।

মহান আল্লাহ শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টি করে দিলেন। ভাইদের তাকবির ধ্বনি আর প্রচণ্ড আঘাতের সামনে টিকতে পারছিল না তারা। ভাইয়েরা এগিয়েই যাচ্ছিল, আর ওরা শুধুই পালাচ্ছিল। ভাইদের হামলার জবাবে ওপাশ থেকে এল মাত্র কয়েকটা বুলেট।

ফজরের সময় হয়ে গেল। ভোরের আলো ফুটলো… পাঁচটি ভবন শত্রুমুক্ত হয়েছে। কিন্তু ফিরে যাবার পথে স্নাইপার ওৎ পেতে বসে আছে। এদিকে গোলাবারুদ কমে এসেছে, খাবারও শেষ। ফলে ভাইয়েরা ক্ষুধা ও অবরোধের মুখে পড়ল।

এক ভাই খাদ্য ও রসদ আনতে ফিরে যাচ্ছিল। স্নাইপারের ব্যাপারটি তার মাথায় ছিল না। স্নাইপারের গুলি খেয়ে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল সে। অন্যরা তাকে দেখতে পাচ্ছিল কিন্তু উদ্ধার করার উপায় ছিল না। কারণ কেউ কাছে গেলে তাকেও গুলি করবে স্নাইপার।

জিহাদের ময়দানের দুটি ‘সিংহ’ প্রাণ বাজি রেখে দুঃসাহসী উদ্ধার অভিযানে নামল। আহত ভাইকে উদ্ধার করতে দৌড়ে চলে গেল স্নাইপারের রেঞ্জের ভেতরে। স্নাইপারের বুলেট তাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু তারা তাকে উঠিয়ে নিয়ে নিরাপদেই ফিরে এল…

আহত ভাইয়ের রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। তার চিকিৎসা করার অথবা তাকে মেডিকেল টিমের কাছে পৌছে দেয়ার কোন উপায় ছিল না… সাথিভাই ও বন্ধুদের সামনেই একটানা ছয় ঘন্টা রক্তক্ষরণ চলল। অবশেষে সে মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে চলে গেল, তিনিও তাকে তাঁর সান্নিধ্যের জন্য নির্বাচিত করলেন ইনশাআল্লাহ।

সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত হল যখন আপনার সামনেই আপনার বন্ধুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, কিন্তু আপনি তার জন্য কিছুই করতে পারছেন না। তারপর আপনার সামনেই সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে… তখন আপনার মনে হবে রক্তের প্রতিটি ফোটার সাথে যেন আপনার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে।

তোমার সামনে ঢেকে রাখা দেহটির কথা ভেবে দেখ… একটু আগেও সে কষ্ট পাচ্ছিল কিন্তু এখন আছে মহাসুখে। তোমাকে ছেড়ে চলে গেল, আর তুমি থেকে গেলে তার সাথে মিলিত হবার আশা নিয়ে। কেমন মৃত্যু নসিব হয়েছে তার! যে মৃত্যু রুকু ও সিজদা অবস্থায় মৃত্যু থেকেও উত্তম!!

তোমার চলে যাওয়া বন্ধুর কথা ভেবে দেখ… প্রথমে তার হিম্মত আকাশ ছুঁয়েছিল, তারপর আল্লাহ তাকে সম্মান দিয়েছেন তার রূহকে তুলে নিয়ে। ভেবে দেখ, জান্নাতের হুরেরা এখন কিভাবে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে তাকে…

তাকে এভাবে দেখে তোমার খারাপ লাগছে। তারপর কপালে চুমু খেয়ে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছ।

ভাইয়েরা পাঁচটি ভবনে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল… কুফফারদের একটি বি.এম.বি. বারবার আসা যাওয়া করত দেখা গেল। তাতে সৈন্য ভর্তি করে আনা হচ্ছিল। কাফেররা ভবনগুলোর চারপাশে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান নিল। তাদের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। হুসাইন ও আলী রা. এর নাম ধরে সাহায্যের আবেদন করছিল তারা।

কঠিন অবস্থায় পড়ে গেল ভাইয়েরা। কুফফাররা তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। একেবারে নিকটে তারা। রসদ সামান্যই অবশিষ্ট আছে। ম্যাগাজিনগুলো শূন্য। আর ওদের মোকাবেলা করতে হলে একটি গ্রুপ হামলা করতে হবে, অন্য গ্রুপটিকে ফায়ারিং অব্যাহত রাখতে হবে।

অবরুদ্ধ ভাইরা সংখ্যায় ছিল ২০ জন। তাদের মধ্যে ৬ জন হতাহত। কেউ শহীদ, কেউ আহত। ভাইদের সংখ্যা ও রসদের পরিমাণ কম, তাই আমীর সিদ্ধান্ত নিলেন হামলা মুলতবী রেখে কেবল ওদের প্রতিরোধ করার, আর আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষায় থাকার।

অবরুদ্ধ ভাইদের ম্যাগাজিনের বুলেট একেবারে শেষ হয়ে যাবার আগ মূহুর্তে ক্ষীণ কণ্ঠের একটা আওয়াজ শোনা গেল, ‘লোড, লোড!’… তারপর আর কোন সাড়াশব্দ নেই। গোলাবারুদ নেই খাবারও নেই!

আশুরার দিন ভাইয়েরা জিহাদ ও ইনগিমাসে কাটাল। জিহাদের ময়দানে শত্রুর মোকাবেলার শক্তি অর্জনের জন্য সাওম না রাখাটাই সুন্নাহ। কিন্তু অবরুদ্ধ ভাইয়েরা রোজা রেখেছিল, কারণ খাবার ছিল না একেবারেই!

কুফফাররা এগিয়ে আসছিল, কিন্তু কাপুরুষগুলো ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছিল না। প্রতি সেকেন্ডে মর্টারের শেল এসে পড়ছিল। এমনকি দেয়ালগুলোও ভেঙ্গে পড়েছিল… কিন্তু ভাইদেরকে স্বয়ং আল্লাহ সঙ্গ দিচ্ছিলেন!

প্রবল গোলাবর্ষণ, শত্রুর বেষ্টনী, ক্ষুধা, শহীদ, আহত সাথিভাই, …, … এত কিছুর পরেও আল্লাহ তাআলা ভাইদের অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতা ঢেলে দিয়েছিলেন। বরং ভাইয়েরা কসম করে বলতে পারবে, এটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুখের কিছু মূহুর্ত!

সন্ধাবেলা যখন আঁধারের পর্দা নামল এবং ফিরে আসার পথ নিরাপদ হয়ে গেল তখন অবরোধও আর টিকল না। ভাইরা ফিরে এল… ফিরে আসা ভাইদের সাথে মুসাফাহা করলাম। তারা ছিল ধুলা মলিন ও ক্লান্ত, একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ছিল। একজন তো অচেতন হয়ে পড়েই গেলেন মাটিতে!

ক্লান্ত দেহগুলোকে আলিঙ্গন করলাম। এমন অসাধারণ কুরবানী ও ত্যাগের কারণে সবার মাথায় চুমু খেতে ইচ্ছা করছিল।

আমার মনে পড়ল আরেক শ্রেণীর মানুষের কথা। এই মুজাহিদরা যখন শত্রুর মোকাবেলায় মগ্ন ওরা তখন পিছন থেকে এদের পিঠে ছুরিকাঘাত করছে। ভাবতেই মাথা নিচু হয়ে গেল।

দীনের সংরক্ষিত জলাধারকে রক্ষা করতে ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে ভাইয়েরা। মনে পড়ছে ওইসব লোকের কথা যারা এদেরকেই গাদ্দার বলছে, এদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা করছে, সমালোচনার পাত্র বানিয়েছে এদেরকে… মনে মনে বললাম, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন!’

শহীদদের দেহগুলো আর আহত মুজাহিদদের রক্ত দেখে আমার মনে হতে লাগল, মুমিনদের এই দলটিই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে পবিত্র দল, কারণ এদের ত্যাগ অনেক বেশি।

এদের জীবনকাহিনী ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা উচিত। উম্মাহর কর্তব্য এদেরকে যোগ্য মর্যাদা দেয়া, নতুন প্রজন্মকে এদেরকে ভালোবাসার দীক্ষা দেয়া। তাদের পাওনা এটাই, তাদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী বানিয়ে জেলখানার ভূ-গর্ভস্থ সেলে ফেলে রাখা নয়।

আল্লাহর কসম, শহীদদের পায়ের জুতাগুলো তাবেদার রাষ্ট্রপ্রধানদের রাজমুকুটের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যারা দীনকে সাহায্য করছে তাদের নখের অগ্রভাগের কেটে ফেলা অংশটুকুও তাদের চেয়ে উত্তম, যারা দীনের নাম ব্যবহার করে দীনের সাথে গাদ্দারী করছে।

পাহারার জন্য প্রত্যেকের দুই ঘন্টা করে পিছন দিকের ভবনগুলোতে থাকার কথা। দুই ঘন্টা পাহারা দেবার পর তারা বিশ্রামের জন্য চলে যাবে, আর সেখানে আসবে অন্য কয়েকজন। কিন্তু আমার বন্ধু আবুল বারা’ ছয় ঘন্টা করে পাহারায় থাকত। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কারণ কী?’ ও বলেছিল, ‘আমি শাহাদাতের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছি, হয়তো একসময় এভাবেই শাহাদাত এসে যাবে’

ময়দান থেকে ফিরে আসার পর আবুল বারা’ আমাকে বলেছিল, কত অপারেশনে অংশগ্রহণ করলাম, শাহাদাত এল না। শহীদী হামলার মাধ্যমেই হয়তো এই অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটবে।

অপারেশনের পর ক্যাম্পে ফিরে আসার পথে সবার মনে হচ্ছিল গোনাহের বোঝার একটা বড় অংশ যেন আমাদের কাঁধ থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে… সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন, তিনি যেন কবুল করেন…

সালাম…

#অনুভব

আমাদের কলিজা শত্রুদের ধারালো অস্ত্রের খোঁচায় রক্তাক্ত… ওদের সীমালঙ্ঘন দেখে আমাদের অন্তর ব্যথিত… ওদেরকে আহলুস সুন্নাহ-এর মসজিদের মিম্বারগুলো নাপাক করতে দেখে আমাদের হৃদয় পীড়িত… সম্ভ্রান্ত নারীদের ও সন্তানহারা মা-দের চিৎকারে আমাদের মন তীব্র যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে।

ওহে মুজাহিদীন, আল্লাহর পরে তোমরাই তো আমাদের আশা, আমাদের হৃদয় প্রশান্ত করতে কিছু কর… আমাদের হৃদয়ের ক্ষত অনেক বড়। সুসংবাদ শুনিয়ে একটু কমিয়ে দাও আমাদের ব্যথা… ওদের ওপর হামলা চালিয়ে হৃদয়ের ক্ষতগুলো সারিয়ে দাও… ইনগিমাসি হামলা করে আমাদের হৃদয় জুড়িয়ে দাও।

বিপদগ্রস্ত মানুষের দৃষ্টি তোমাদের ওপর নিবদ্ধ… ক্লান্ত চোখগুলো তোমাদের সুসংবাদ পাবার অপেক্ষায় আছে… আহত হৃদয়গুলো তোমাদের বিজয়ের খবর শুনতে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছে… গাড়ি বোমা হামলা কর ওদের ওপর… মাইন পেতে রাখ ওদের জন্য… ওদেরকে উড়িয়ে দাও… বিনাশ করে ফেল… ওদের পায়ের নিচের মাটিতে আগুন জ্বালিয়ে দাও… তোমাদের হাতের গাইতিগুলো ওদের ওপর ব্যবহার কর, হত্যা কর ওদেরকে, জখম কর, বন্দী কর… হালাবের (আলেপ্পো) দক্ষিণাঞ্চলের মাটিকে ওদের কবরস্থান বানিয়ে দাও। ওহে গৌরবের পানীয় পরিবেশনকারী, একটু পান করাও আমাদেরকে।

ওহে বিজয়ের সুসংবাদদাতা, নতুন কোন খবর আছে কি?

তাওয়াক…!

‘তাওয়াক’ এর গল্প
(শামের বরকতময় জিহাদের ময়দানে শাহাদাতবরণকারী এক মুজাহিদের ডায়েরি)
পর্ব: ৪

অনুবাদ: আশ-শাম মিডিয়া

অজানা শত্রুর মুখোমুখি

সাহসিকতার অসাধারণ একটি গল্প। ঘটনাটি হালাবের দক্ষিণাঞ্চলের রক্তক্ষয়ী তুমুল লড়াই চলাকালীন সময়ের। আল্লাহর অনেক নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছে তাতে… সেটিকে বাস্তব কাহিনী মনে করার চেয়ে কাল্পনিক মনে করাটাই সহজ। আমি সরাসরি গল্পের নায়কের মুখে না শুনলে তা বর্ণনা করতাম না।

শত্রুরা যখন রাতের অন্ধকারে ‘তাল্লাহ আল-ইস’-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন (শিয়া) রাফেযীদের হামলা প্রতিহত করতে সেদিকে রওয়ানা হলেন মুজাহিদদের প্রতিরক্ষা বাহিনী। সেই বাহিনীর মধ্যে সেই ভাইদের গাড়িটিও ছিল।

হালাবের দক্ষিণাঞ্চলে যাবার পথে উত্তর হালাবের ‘কাফার হুমরাহ’-এ পৌঁছার পর আসরের আযান হয়ে গেল… ভাইয়েরা রাতের খাবার ও কিছু অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অগ্রসর হল।

চলতে চলতে মুজাহিদদের সীমানার শেষ চেকপোস্টটিও পার হয়ে গেল তারা। চেকপোস্ট পাহারায় থাকা মুজাহিদ ভেবেছিল তারা হয়তো সামনে গিয়ে ডানে অথবা বামে মোড় নেবে। তাই তাদেরকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করে নি সে।

মুজাহিদ জওয়ানরা আরো সামনে গিয়ে শত্রুদের এলাকায় ঢুকে পড়ল। তারা জানত না এটা শত্রুদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা… ক্যাম্প বানিয়ে থাকার জন্য একটা বাসার দিকে এগোলো। গাড়ি থেকে নেমে মাটির নিচের কক্ষে প্রবেশ করল। (বিমান হামলার সময় আশ্রয় নেয়ার জন্য এ ধরণের কক্ষ বানানো হয়।) তারপর রাতের খাবার খেতে বসল।

গাড়িচালক মুজাহিদ অন্য একজনকে সাথে নিয়ে বের হল এলাকাটি ঘুরে দেখতে। তারা একটি টিলার কাছাকাছি যেতেই ওপর থেকে নেমে এল একজন অস্ত্রধারী। কাছে এসে গাড়ির জানালার সামনে দাঁড়াল সে।

ভাইয়েরা বলল, ‘জওয়ানরা কোথায়?’
: ‘কোন জওয়ানরা?’ পাল্টা জিজ্ঞেস করল সে।
: ‘কেন, জাবহাতুন নুসরাহ!’… কথাটা বলেই ভাইয়েরা লক্ষ করল ইউনিফর্মের হাতার লোগোটার দিকে। সেখানে লেখা ছিল: ‘লাব্বাইকা ইয়া যাইনাব’!… (এটা হিযবুল্লাহ ও অন্যান্য রাফেযী/শিয়া মিলিশিয়াদের স্লোগান)

চালক ভাই রাফেযীর দিকে তাকিয়ে চাতুরির হাসি হাসল। বোঝাতে চেল, ‘মজা করলাম একটু।’ তারপর সাথের মুজাহিদের দিকে ফিরে নিচু স্বরে বলল, ‘ফায়ার!’ কিন্তু রাফেযী সৈন্যটি আগেই সতর্ক হয়ে গেছে। ওর অস্ত্রের সিলেক্টর লিভারটি নামানোর শব্দ শোনা গেল, গুলি করতে যাচ্ছে রাফেযী… কিন্তু আমাদের ভাইটি আল্লাহর দুশমনের চেয়েও বিচক্ষণ ও তৎপর ছিল। সবসময় শত্রুর মোকাবেলার প্রস্তুতি থাকত তার। রাফেযী গুলি করার আগেই দ্রুত রাইফেল উঠিয়ে ওর ওপর ঝেড়ে দিল কয়েকটা বুলেট!

যদি প্রথমতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ, অতঃপর আমাদের ভাইদের সার্বক্ষণিক প্রস্ততি না থাকত, সেখানেই শাহাদাতবরণ করত তারা…! গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। কী করবে বুঝতে পারছিল না। বুঝতে পারল কুফফারদের এলাকা এটা।

ওদিকে অন্য সাথিরা ক্যাম্পে বসে ছিল একেবারে নিশ্চিন্তে, এ ব্যাপারে কিছুই জানতে পারে নি। আরামসে খাওয়া দাওয়া করছিল তারা।

খাওয়া দাওয়া শেষে একজন ভাই ওপরে উঠে এল প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে। সুন্নাহ অনুযায়ী একটু দূরে চলে গেল… সে জানত না এটা শত্রু এলাকা!

সালাতের সময় আরেক ভাই ওপরে উঠে এল, পাতালকক্ষে তার ভালো লাগছিল না। একটু হেটে গিয়ে বেশি একাগ্রতার সাথে সালাত আদায় করতে পারবে এমন একটা জায়গা বেছে নিল। সেখানে সালাত আদায় করল… সেও জানত না এটা শত্রু এলাকা!

তাদের একজন কয়েকজন অস্ত্রধারীকে এগিয়ে আসতে দেখল। তারা কাছে এসে জিজ্ঞেস করল হুক্কার খাওয়ার কয়লা আছে কিনা। এমন প্রশ্নে অবাক হয়েছিল সে। কিন্তু পরে ভাবল, হয়তো ফ্রি সিরিয়ান আর্মির লোক হবে, যাদের অনেকেই ফেতনার শিকার।

যে ভাই আমাকে ঘটনা শুনিয়েছে, সেও তখন পাতালকক্ষ থেকে ওপরে উঠে এল। একজন লোক তার কাছ থেকে হেটে গেল। লোকটাকে সালাম দিল সে, লোকটা জবাব দিল… কিছুক্ষণ পর প্রায় ৫০ মিটার দূরে একটা উচু জায়গায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে দেখতে পেল একজন লোককে। লোকটার পোশাক কিছুটা নুসাইরি বাহিনীর (বাশারের বাহিনী) অফিসারদের মত!

ভাই তখন পিছন দিকে সরে এল। ম্যাগাজিনের বেল্ট আনতে আর মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে পাতালকক্ষে নেমে গেল। বুঝতে পারল, বিপদ আসন্ন… আবার ওপরে উঠে আসার চেষ্টা করল, কিন্তু সেই সুযোগ আর পেল না!

কয়েক ধাপ ওঠা মাত্রই সেই অফিসারের একেবারে মুখোমুখি হয়ে গেল! আর যে লোকটাকে সে সালাম দিয়েছিল, তার ডান পাশে এসে দাঁড়ালো।… তারপর আরো কিছু রাফেযীর চিৎকার শোনা গেল, তাকে অস্ত্র নামাতে বলছিল ওরা…

ভাই একটু পিছাতে লাগল, যেন একটু চিন্তা করার সময় পাওয়া যায়, সঠিক করণীয়টা নির্ণয় করা যায়। কিন্তু আল্লাহর দুশমন তাকে সেই সুযোগ দিল না। এক লাফে কাছে এসে রাইফেলের ম্যাগাজিন ধরে ফেলল, যেন গুলি ছুড়তে না পারে!

এমন কঠিন মূহুর্তে স্লায়ুগুলোতে টান পড়ে, বু্দ্ধি লোপ পায়। চিন্তা করার শক্তি থাকে না, নড়াচড়াও কঠিন হয়ে যায়। যদি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সঠিক করণীয়টা তার মনে উদিত না হত তাহলে নিশ্চিতভাবে বন্দী হত রাফেযীদের হাতে… বন্দুকটা রাফেযীর হাতে ছেড়ে দেয়ার আগে তার সাথে সমঝোতার কথা বলতে লাগল। কথার ফাকে নল ঘুরিয়ে দিল বাম পাশে দাঁড়ানো অফিসারের দিকে!

দুশমন বুঝতেই পারে নি, সে অফিসারের দিকে রাইফেল তাক করছে। ভেবেছিল সত্যিই সমঝোতার করতে চাইছে… ভাই অফিসারের দিকে কয়েক রাউন্ড গুলি করল। ঠিক মতই লাগল বুলেটগুলো। প্রশংসা কেবল আল্লাহরই…

যে দুশমনটি রাইফেলের ম্যাগাজিন ধরে ছিল, ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে কাঁপতে কাঁপতে পিছন দিকে সরে গেল। এত দুঃসাহস সে আশা করে নি। তখন রাইফেলের নল তার দিকে ঘুরিয়ে তার ওপরেও কয়েকটি বুলেট ঝেড়ে দিল। সেও ধরাশায়ী হল। প্রশংসা কেবল আল্লাহর…

কঠিন পরীক্ষার সময়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার আসে… ভাই যখন বন্দী বা নিহত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল, তখন আল্লাহ তাআলা সঠিক করণীয়টা শিখিয়ে দিলেন, তাকে সাহায্য করলেন। ফলে তার হাতে নিহত হল একজন রাফেযী, আহত হল আরেকজন। ফিরে আসার পথ ধরল সে।

সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ হল ‘অজানা শত্রু’র সাথে যুদ্ধ!… তখন ওদের ফাঁদে পা দেয়াটাই স্বাভাবিক। ওদের চক্রান্তের শিকার হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত। রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা কমই থাকে।

সেই ভাই আরেকজন ভাইকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে এল সেখান থেকে… আসার পথে চারিদিক থেকে শত্রুর বুলেট ছুটে আসছিল তাদের দিকে। কাছের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিল তারা।

প্রথমে একটি বাড়ির সীমানায় প্রবেশ করল, সেখান থেকে দেয়াল টপকে পরের বাড়িটাতে, সেটা থেকে তার পরেরটায়। এভাবেই এগোতে থাকল… অবশেষে উঁচু একটা বাড়ির কাছে পৌঁছুল। বাড়িটির আশেপাশের জায়গাটা পাথরে ভরা। লুকানোর উপযুক্ত জায়গা। পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল তারা।

মাগরিবের আজানের অল্প কিছু সময় বাকি ছিল। পাথরের আড়াল থেকে মাথা ওঠানোর উপায় ছিল না। কারণ শত্রুরা যে টিলার ওপর ক্যাম্প বানিয়েছে, সেটা মাথার ঠিক ওপরে ছিল। মাথা উঠালেই ঝাক বেঁধে ছুটে আসবে শত্রুর বুলেট!

সময় খুব ধীর গতিতে পার হচ্ছিল। খুবই কঠিন মূহুর্ত ছিল সেটা… মৃত্যুর অপেক্ষায় সময় কাটছিল। ভাইয়ের মনে হচ্ছিল, এখনি বুঝি রাফেযীদের রাইফেলগুলো দেখা যাবে মাথার ওপরে, আর তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলবে!

মৃত্যু অথবা বন্দীত্বের অপেক্ষায় সময় কাটানো খুব কঠিন কাজ… তখন মানুষ বারবার মারা যেতে চায়… ভাইয়ের ইচ্ছা হচ্ছিল বিস্ফোরক বাঁধা একটা বেল্ট পাবার, যেন রাফেযীদের ভেতরে ঢুকে পড়ে বিস্ফোরন ঘটাতে পারে, আর তাদের হাতে বন্দী হতে না হয়।

চারিদিকে রাতের অন্ধকার নামল। এশার সময় হয়ে এল প্রায়। তখনো গোলাগুলি চলছে। অন্ধকারে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিল তারা, যেভাবে আটার মধ্য থেকে চুল বেরিয়ে আসে… পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। দ্রুত কেটে পড়ল সেখান থেকে।

চারিদিকে তাকিয়ে দেখল তারা। চিন্তায় পড়ে গেল, পথ চেনা নেই। হয়তো কোন পথ ধরে এগোতে গিয়ে একেবারে রাফেযীদের আস্তানায় পৌঁছে যাবে! মহান রবের কাছে সাহায্য চেয়ে একদিকে চলতে লাগল… তারা চলছিল, কিন্তু বিপদ কাটছিল না!

পাথরের আঘাতে ভাইয়ের পা জখম হতে লাগল। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, মনে পড়ল বুটটি সেই ক্যাম্পেই ফেলে এসেছে। কিছুদূর হেটে যাবার পর হঠাৎ একটি সাঁজোয়া যান এগিয়ে আসার ভয়ংকর শব্দ শোনা গেল!…

এই দৃশ্য দেখার পর শিরার ভেতরে রক্ত যেন জমে যাচ্ছিল… গাড়িটি এগিয়েই আসছে… যখন একেবারে কাছে এসে পড়ল এবং শঙ্কায় প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে গেল, আল্লাহ তাদের চোখকে অন্ধ করে দিলেন। ফিরে গেল তারা!…

তারপর আরো কিছুদূর চলল। হঠাৎ সামনে তাদের একেবারে কাছে একজন রাফেযী সৈন্যকে দেখতে পেল। তার হাতে হালকা আলোর একটা লাইট জ্বলছিল। সেই আলোতে এলাকাটা দেখার চেষ্টা করছিল। ভাইয়েরা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। রাফেযী আশ্বস্ত হয়ে ফিরে যাবার পর আবার চলতে শুরু করল…

একটি ফসলের ক্ষেত পড়ল সামনে, তাতে ঢুকে পড়ল ভাইয়েরা। হঠাৎ পিছন থেকে ঝাকে ঝাকে বুলেট আসতে লাগল তাদের দিকে। দ্রুত একটি ইউক্যালিপটাস গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল তারা। কয়েক মিনিট থাকল সেখানে। ফায়ারিং বন্ধ হলে আবার চলতে শুরু করল। অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, জানা নেই সামনে কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

প্রথম দিকে গুলি আসা মাত্রই কোন কিছুর আড়ালে লুকিয়ে পড়ছিল অথবা বসে পড়ছিল। কিন্তু এত কঠিন পরিস্থিতি ও ভয়ভীতির পাশ কাটিয়ে যাবার পর তাদের এমন অবস্থা হল যে, চতুর্দিক থেকে ঝাকে ঝাকে গুলি আসলেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছিল না তাদের মধ্যে। তারা আসন্ন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিল!

একটা এলাকায় পৌঁছার পর একটু দূরে গাড়ির হেডলাইট জ্বলতে নিভতে দেখতে পেল। খুব অস্থির হয়ে গেল তারা। কারা ওরা? ভাইয়েরা নাকি রাফেযীরা? তখন আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। সেখানে গিয়ে বেঁচেও যেতে পারে, আবার মরতেও হতে পারে।

আরো কাছে গেল তারা। সংঘর্ষের সম্ভাবনা আছে, তাই প্রস্তুত থাকল… চিৎকার করে বলল, ‘তোমরা কারা?’ প্রশ্নোত্তরের পর নিশ্চিত হল, ওরা মুজাহিদ। ছুটে গিয়ে সালাম ও মুআনাকা (কোলাকুলি) করতে লাগল ভাইদের সাথে।

দীর্ঘ সময় টানটান উত্তেজনা ও মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকার পর তাদের দেহে নতুন করে রক্ত সঞ্চালিত হল। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহগুলো এলিয়ে পড়ল… বিশ্রামের জন্য সবচেয়ে কাছের জায়গাটিই বেছে নিল তারা।

সাথিদেরকে সব ঘটনা খুলে বলল। তাদেরকে জানাল চারজন সাথিকে হারানোর খবর। একেবারে শুরুতেই হারিয়েছে দুজনকে, যারা এলাকাটা ঘুরে দেখতে গিয়েছিল। শত্রু এলাকা থেকে বেরিয়ে আসার সময় ছেড়ে এসেছে আরও দুজনকে…

সেখানে থেকে যাওয়া ভাইদের জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। প্রায় অসম্ভব। কারণ শত্রু বাহিনীতে প্রচন্ড হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল, তার মধ্যেই ছেড়ে আসা হয়েছে ওদেরকে। সবাই দোয়া করল, আল্লাহ যেন তাদের শাহাদাত কবুল করেন, জান্নাতে যেন তাদের সাথে মিলিত করেন।

একজনের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হল, কিন্তু ফোন বন্ধ পাওয়া গেল। ভাইয়েরা সারা রাত চেষ্টা চালাল যোগাযোগের, কিন্তু ভালো কোন সংবাদ দিতে পারল না কেউ… দুশ্চিন্তা দূর হল না ভাইদের… ভাইয়েরা ধরেই নিল, হয় নিহত নয়তো বন্দী হয়েছে তারা।

ভোরের আলো ফুটল, সুর্য উঠল। সুর্যের আলোর ভাজে ভাজে লুকিয়ে থাকে যত খুশির খবর। আবার কল করল ভাইয়েরা। ফোন খোলা পাওয়া গেল এবার। রিসিভ করা হল ওপাশ থেকে। যে ভাইয়ের ফোন তার গলাই শোনা গেল। বলা হল: ‘আপনি কি অমুক?’

জবাব এল: ‘হ্যাঁ, আমি অমুক… আপনাদের জন্য খুশির খবর আছে, আমরা ভালো আছি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু দু’জন বাদে। আল্লাহর কাছে দোয়া করি তাদেরকে যেন শহীদ হিসাবে কবুল করেন!…’ মুজাহিদ জওয়ানরা ওদের বেঁচে যাওয়ার খবর শুনে খুশি হল, আবার দুজনকে হারানোর খবরে মন খারাপও করল… কিন্তু একটু পরেই সবার ব্যাপারে খুশির খবর পেল তারা!

এপাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘শহীদ দুইজন কে কে?’ বলল, ‘অমুক আর অমুক!’ সেই দুইজনের নাম বলল যারা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল এবং এখন তাদের সাথেই বসে আছে রুমের মধ্যে… এক মূহুর্ত নিরবতায় ছেয়ে গেল কামরাটি, তারপর তাকবীর ধ্বনিতে কেঁপে উঠল!

কেবল খুশিই ছিল না, বরং ঈদের দিন ছিল সেটা; জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ঈদগুলোর একটা ছিল… খবরটা শুনে সবার শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেল, চোখে পানি এসে গেল। শিরাগুলোতে রক্ত সঞ্চালিত হল সবেগে, প্রচণ্ড জীবনীশক্তি নিয়ে… সবার মুখে হাসির রেখা দেখা গেল!

আল্লাহ ভাইদেরকে একেবারে সুস্থ শরীরে একত্রিত করলেন… সবাই মিলিত হল অন্য সাথিদের সাথে। আনন্দ পূর্ণতা লাভ করল… সবাই নিজ নিজ কাহিনী শোনাতে লাগল, কেমন আশ্চর্যজনকভাবে তাদেরকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা।

প্রথমে যে দুজন এলাকা ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিল তারা বলল, যখন তারা বুঝতে পারল এটা শত্রু এলাকা, পিছনে ফিরে গেল… সেখানে থেকে যাওয়া দুই সাথিকে দেখতে পেল, তারা কুফফারদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল।

আল্লাহর কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখা গেল তখন… আল্লাহ ভাইদের বুলেটগুলো লক্ষ্যভেদ করাচ্ছিলেন, তাদের মনোবলও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারা কেবল বেরিয়ে আসার চেষ্টাই করছিল না, বরং হামলা করে শত্রুকে বেশি পরিমাণে হতাহত করতে সচেষ্ট ছিল!

একজন দুশমনের সাথে প্রচণ্ড গুলি বিনিময় হচ্ছিল ভাইদের। হঠাৎ তার হাত থেকে বন্দুকটা পড়ে গেল… আল্লাহ মুজাহিদ জওয়ানদের বুলেট লক্ষ্যভেদ করিয়েছেন, দুশমনের হাতে আঘাত করেছে মুজাহিদদের বুলেট!

এক ভাই একটা বাসায় ঢুকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ ভেতরে খস খস শব্দ শোনা গেল। পিছনে সরে এল সে, তখনই শব্দের উৎসটা দেখা গেল। বেরিয়ে এল এক দুশমন। আল্লাহর অনুগ্রহে সে ভাইয়ের উপস্থিতি টেরই পেল না।

ফিরে আসার পথে এক জায়গায় কিছু শত্রু দেখতে পেল তারা। একজন মুজাহিদ জওয়ান এগিয়ে গেল নিঃশব্দে। বোমার পিন খুলে ছুড়ে ফেলল ওদের ঠিক মাঝখানে, পর মূহুর্তেই শোনা গেল শত্রুবাহিনীর চিৎকার ও আর্তনাদ!

এটা এমন একটা চিত্র যা কল্পনাও করা যায় না! চতুর্দিক থেকে আপনাকে ঘিরে রেখেছে শত্রু বাহিনী, বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনাই যেখানে কম, সেখানে শত্রুকে আপনার শক্তি দেখাতে চাইছেন, যেন আপনি ওদের ওপর হামলা করতেই এসেছেন। আবার এতেই ওরা ঘাবড়ে যাচ্ছে, আর আপনি ফিরে আসছেন নিরাপদে!…

আরেকটা দৃশ্য, মুজাহিদ জওয়ানদের সাথে শত্রুবাহিনীর প্রচণ্ড গুলিবিনিময় চলছিল। হঠাৎ শত্রুপক্ষের ফায়ারিং থেমে গেল। তারপর অন্যদিকে ছুটতে লাগল ওদের বুলেটগুলো, যেদিকে আমাদের কোন ভাই ছিল না। অবাক করা ব্যাপার!

ভেবেছেন কি, কিসের জন্য শত্রুদের বুলেটের দিক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল? হতে পারে সেদিকে আসমান থেকে নেমে আসা ফেরেশতা ছিল, আল্লাহ তাদেরকে পাঠিয়েছিলেন মুজাহিদ জওয়ানদের সাহায্যে। আর আল্লাহ তো সবকিছু করার ক্ষমতা রাখেন!

আল্লাহ তাআলা জওয়ানদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। কেউ নিহত হয় নি। আহতও হয় নি কেউ। আর ওদিকে আল্লাহর শত্রুদের কমপক্ষে ১৫ জন হতাহত হয়েছে নিশ্চিভাবে!…

দক্ষিণ হালাবের লড়াইগুলোতে মুসলিম যুবকদের জন্য একটা বার্তা আছে। তা হল, ‘যার সাথে আল্লাহ থাকেন তাকে আর কেউ সাহায্য না করলে কী ক্ষতি? আর আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন না তাকে কে সাহায্য করতে পারে? অতএব মন থেকে ঝেড়ে ফেল সব ভয়ভীতি’…

আল্লাহর মুজাহিদদের সাথে থাকার স্পষ্ট নিদর্শনে পূর্ণ এই ঘটনাগুলোতে ইসলামী আকীদা লালনকারী যুবকদের জন্য একটি বার্তা আছে। তা হল, ‘জিহাদের ময়দানের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়, কারণ তোমাদের মৃত্যুর নির্ধারিত দিনটি আল্লাহ লিখে রেখেছেন। যুদ্ধের ময়দান কখনো সেই দিনটিকে এগিয়ে দিবে না।’

#অনুভব

এই মূহুর্তে ভাবছি, যদি আমাদের মনগুলো বৃষ্টির পানির মত নির্মল হত… যদি আমাদের কর্মগুলো বৃষ্টির পানির মত পবিত্র হত… যদি আমাদের দৃষ্টি বৃষ্টির পানির মত নিষ্কলুষ হত।

ভাবছি, যদি আমাদের উম্মাহ ওই শিশুদের মত মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত, যারা বৃষ্টির টিপটিপ শব্দ শুনেই দলবেঁধে মিলেমিশে ছুটে যায় বৃষ্টিতে ভিজতে, বৃষ্টির ঝরে পড়া ফোটাগুলোর নিচে! আহা কী আনন্দ!

তাওয়াক…!

‘তাওয়াক’ এর গল্প
(শামের বরকতময় জিহাদের ময়দানে শাহাদাতবরণকারী এক মুজাহিদের ডায়েরি)
পর্ব: ৫

অনুবাদ: আশ-শাম মিডিয়া

মুজাহিদীন ও শামের বরফ

বাতাসে ছড়িয়ে থাকা পেঁজা তুলার মত তুষার শান্ত শীতল শেষরাত্রিকে সাজিয়ে দিচ্ছিল। জ্বলন্ত লাকড়িগুলো শুষ্ক হাত-পায়ে তাপ সরবরাহ করছিল… ভাইয়েরা আল্লাহর দরবারে রুকু ও সিজদারত অবস্থায় আপন রবের রাহমাহ (দয়া ও করুণা) অন্বেষণ করছিল।

আযানের সময় ঘনিয়ে এলে আমরা ফজরের সালাত আদায় করতে মাসজিদের উদ্দেশে বের হলাম। বাইরে এসে দেখি রাস্তা-ঘাট বরফে ঢাকা। গাড়িটি নড়ানোর চেষ্টা করে ব্যার্থ হলাম। ফিরে এলাম ক্যাম্পে। দরজা খুলতে চাবিটা বের করলাম, হঠাৎ সেটা বরফের ফাঁকে পড়ে গেল। চাবিটা খুঁজতে বরফের ফাঁকায় হাত ঢোকালাম, অবশ হয়ে গেল হাত। হাত বাইরে এনে দেখি সেটাও একটা বরফখণ্ডে পরিণত হয়েছে।

তুষারপাতের এত সুন্দর দৃশ্য জীবনে প্রথমবার দেখছি। কিছু বরফ জমা করে বল বানিয়ে ফেললাম। আমার বন্ধু আবু আওসের দিকে ছুড়ে দিয়ে দৌড়ে পালালাম। তারপর শুরু হল ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া… আমরা যেন গোলাপবর্ণের স্বপ্নের মধ্যে আছি!

কিছু সময় চলল এভাবে, হাত পা ততক্ষণে ঠাণ্ডায় জমে গিয়েছে। ক্যাম্পের দরজায় নক করলাম, ভিতরে ঢুকলাম… আমার বন্ধু তার মোবাইলটা খুজে পাচ্ছিল না। ফিরে গিয়ে বরফের মধ্যে খুঁজতে লাগলাম। আলহামদুলিল্লাহ, পাওয়া গেল সেটা…

ভাইদের জন্য চা বানাতে রান্নাঘরে ঢুকলাম। পানিভর্তি কেটলি চুলায় দিলাম। সেখানে বন্ধু আবু আওস দারুণ একটা খুশির খবর শোনালো, আনন্দে ভরে গেল মন…

জামাতে ফজরের সালাত আদায় করলাম। সালাতের পর ইমাম সাহেব আমাদের উদ্দেশে কিছু কথা বললেন, নিয়ামাতের শোকর আদায় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করলেন তিনি। আমরা তো ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য ঘরের ভেতরে অবস্থান করছি, অথচ কত মানুষ এমন আছে যাদের ঘর নেই, আশ্রয় নেয়ার মত জায়গাও নেই!

সালাতের পরের যিকর শেষ করে ভাইয়েরা চা পান করতে আঙিনায় বেরিয়ে এল। অবাক হয়ে দেখল, পুরো এলাকা স্কেটিংয়ের (বরফের ওপরের খেলা বিশেষ) মাঠ হয়ে আছে। সবাই একে অন্যের হাত ধরাধরি করে চলতে লাগল যেন পিছলে পড়তে না হয়। তুষারও পড়ছিল মুষলধারে। এমন সময় আমি সবাইকে পিছনে রেখে সামনে এগিয়ে গেলাম। সামনের স্কেটিংয়ের মাঠ সহ ভাইদের একটা ছবি তুললাম…

ভাইয়েরা ভালোভাবেই নেমে এলেন স্কেটিং ফিল্ডে, কিন্তু মাঝামাঝি আসতেই বাঁধল বিপত্তি। এক ভাই একটু দূরে সরে গেল, একটা বরফের বল বানিয়ে হঠাৎ ছুড়ে দিল অন্যদের দিকে। ভাইয়েরা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল… তারপর বেঁধে গেল বরফ যুদ্ধ!

সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল, প্রত্যেকেই বরফের মিসাইল বানিয়ে ছুড়ে দিচ্ছিল অন্যদের দিকে…

হঠাৎ বরফের একটা গোলক গড়িয়ে নামতে লাগল ঢাল বেয়ে। ‘কুবরি’ নামের একজন যুবকের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে চলে গেল সেটা, তার কিছুই হয় নি আলাহামদুলিল্লাহ।

আমার দিকে ছুটে আসল বরফের একঝাক বুলেট। বরফের উৎস খুঁজে বের করে আমিও পাল্টা ফায়ারিং শুরু করলাম সেদিকে, আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত চলল বরফের গুলিবর্ষন…

এমন সময় অন্য একদিক থেকে বরফের একটা বোমা এসে লাগল আমার মুখে, আমি পড়ে গেলাম মাটিতে। ডান দিক থেকে এসেছে বোমাটি… পর মূহুর্তেই শোনা গেল ‘আবু বকর হামাবি’র হাসির শব্দ, দৌড়ে পালাতে দেখা গেল ওকে। আমি হাতা গুটিয়ে পিছু নিলাম, হঠাৎ দেবে গেলাম বরফের ভেতর। আমার দশা দেখে হাসছিল সে!

‘আবু আওস’ ‘আবু আব্দুল্লাহ’র দিকে বরফ-বোমা ছুড়ছিল, হাসতে হাসতে বলল, ‘আল্লাহর শপথ, বুলেটের মজুদ শেষ হয়ে গেলেও কুফফারদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাব, বরফের ব্লক বানিয়ে তা দিয়েই ওদের মোকাবেলা করব!’

‘আবু আব্দুল্লাহ’ ‘আবু আওসকে’ পাল্টা একটা বরফ-বোমা মেরে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। বলল, ‘রাজা বাদশাহরা যদি জানত আমরা কত আনন্দে আছি, তাহলে আমাদেরকে হিংসা করত!’

বরফ যুদ্ধ শেষ হল। সফলভাবে আকাশপথে হামলা (Air Strike) ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা (Surgical Strike) সম্পাদন করার পর ‘আবুল মুসান্না’ ভাইদের জন্য চা বানিয়ে ফেলল। তারপর সবাই একটি টেবিল ঘিরে বসে পড়ল। ভাইদের মন প্রফুল্লতায় ভরা ছিল…

গরম চায়ের কাপে চুমুক দেবার সময়ই জেগে ওঠে প্রিয়জনের সাথে সাক্ষাতের প্রবল ইচ্ছা। আবু ওমর হামাবীর মনে পড়ল তার পরিবারের কথা, যাদের সাথে দু’বছর দেখা সাক্ষাৎ নেই। মনের কথাটা ব্যক্ত করল ভাইদের কাছে: ‘কেবল পরিবারের উপস্থিতির আনন্দটাই বাকি থাকল, এটা ছাড়া আর কোন আনন্দের স্বাদ নিতে বাকি নেই আমার।’

একটু গরম হয়ে নিয়ে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম দুর্লভ কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে। গাড়িগুলো বরফের নিচে চাপা পড়ে ছিল… আরেকটু এগিয়ে অসাধারণ একটি দৃশ্য দেখতে পেলাম।

দেখলাম আমার সামনে কেবল সাদা বরফ, ‘নজদ’ এলাকার বালু যেভাবে টিলাগুলিকে ঢেকে ফেলে সেভাবে সবকিছু ঢেকে ফেলেছে বরফ… সৃষ্টিকর্তা কত পবিত্র…

আমি ছবি তুলছিলাম, চারিদিকে নিরবতা বিরাজ করছিল… হঠাৎ সেখানে একদল হামলাকারী উপস্থিত হল, সবাই মিলে আক্রমণ করল আমার ওপর। চারিদিক থেকে আমার দিকে বোমা ছুড়তে লাগল! পরমূহুর্তেই বুঝে ফেললাম, আমাদের কয়েকজন ভাই, যথা নিয়মে বরফ হামলা চালাতে এসেছিল আমার ওপর। সবার একটা ছবি তোলার শর্তে ওদেরকে ক্ষমা করলাম, ওরাও শর্ত মেনে নিল…

বরফ-বোমা হামলা বন্ধ হবার পরেও শিরায় শিরায় ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম। ঠাণ্ডার উৎস খুঁজতে গিয়ে আবিস্কার করলাম, প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের ফলে জ্যাকেটের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে কিছু বরফ!

ভাই আবু নাসেরের গাড়িটা আসতে দেখা গেল। আমরা লুকিয়ে পড়লাম। গাড়িটা কাছাকাছি আসতেই বরফ-বোমা হামলা চালালাম ওটার ওপর!

আমিও আবু নাসেরের গাড়িতে উঠলাম, মু’তাসিম বিল্লাহ ও অন্য একজন শাইখকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম, ঘুরে বেড়াতে লাগলাম বরফের ওপর… গাড়ি পিছলে ডানে বামে সরে যাচ্ছিল, আমরা যেন স্কেটিংয়ের মাঠে আছি। আরেকটু হলেই ধাক্কা খেত গাড়ি। আবু নাসের স্পিড কমিয়ে দিলে ভারসাম্য রক্ষা হল…

‘ওয়াদদাহ আল-কুসাইমি’ গাড়ি থেকে নামল, এক জায়গায় জমে থাকা বরফের ওপর পা রাখতেই উল্টো হয়ে পড়ে গেল, একেবারে পা ওপরে আর মাথা নিচে। দৃশ্যটা হাস্যকর ছিল।

আমরা বাজারের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে একদল মুহাজির ভাইকে দেখলাম যাদের মধ্যে আবু আব্দুল্লাহও ছিল, আনসার শিশুদের সাথে বরফ নিয়ে খেলা করছিল তারা। যেন সবাই এক পরিবারের। দৃশ্যটা ভোলার মত না।

যখন মুহাজিররা আনসার শিশুদের সাথে খেলছিল তখন বড় বড় স্পিকারে জিহাদী নাশীদ বাজছিল, যার আওয়াজ বাজার এলাকার বাতাসে প্রফুল্লতা ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। আর খেলার মধ্যে ফুটে উঠছিল মুমিনদের প্রতি মুজাহিদদের মমতা…

আমরা উদ্বাস্তু শিবিরের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম, হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য দেখলাম সেখানে। তাপমাত্রা ছিল শূণ্য ডিগ্রির নিচে, আর ওদের তাবু এত পাতলা ছিল যে তাতে ঠাণ্ডা অথবা চারিদিকে ভেসে বেড়ানো তুষার, কোনটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না!

এই সুন্দর মূহুর্তে সেই শহীদ বন্ধুদের কথা মনে পড়ছে যারা মনের ভেতরে সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে চলে গেছে… ইচ্ছা করছে তাদের সাথে দেখা করার। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন শীঘ্রই আমাকেও তাদের সাথে মিলিত করেন।

#অনুভব

“তুমি তোমার ভাইদের জন্য ন্যূনপক্ষে যতটুকু করতে পার তা হল, বিনয়ভরে হাত দুটি আকাশের দিকে তুলবে, তাদের জন্য মন খুলে দোয়া করবে, যেন তোমার দোয়াগুলো আকাশ থেকে অবতরণ করে দুর্বলদের জন্য শীতলতা ও শান্তি হয়ে, আর জালিমদের জন্য আগুন ও পাথরের টুকরা হয়ে!”

“তাদের যদি কামান ও জঙ্গিবিমান থাকে, তবে আমাদেরও আছে রাতের আঁধারে রবের সামনে দণ্ডায়মান হবার ক্ষমতা।”

তাওয়াক…!

About GazwatulSolder

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*