তাকফিরের শর্ত, প্রতিবন্ধকতা ও কারণ – শাইখ আবু মুহাম্মাদ আসিম আল মাকদিসি হাফিযাহুল্লাহ

0
24
আলোচ্য অংশটি নেয়া হয়েছে শাইখ আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসির রচিত “ الرسالة الثلاثينية – নামক গ্রন্থের শাইখ হারিস বিন গাযী আন-নাযযারি রাহিমাহুল্লাহ প্রণীত মুখতাসার থেকে। এ গ্রন্থটি মূল আরবীতে পড়তে পারেন নিচের লিঙ্ক থেকে – https://azelin.files.wordpress.com/2015/07/shaykh-abc5ab-mue1b8a5ammad-al-maqdisc4ab-22the-thirtieth-message-in-warning-from-the-extremists-in-the-use-of-takfc4abr22.pdf
ইনশাআল্লাহ অতি শীঘ্রই বাংলায় অনুদিত বইটি প্রকাশিত হবে। তাকফিরের ব্যাপারে শাইখ আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসি এবং ইরজা ও গুলুহ থেকে মুক্ত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাহর সঠিক অবস্থান জানার জন্য, ইনশাআল্লাহ এ কিতাবটি অত্যন্ত উপকারী হবে। ভাসাভাসা আলোচনার পরিবর্তে যারা বিস্তারিত ও বিশদ আলোচনা পড়তে পছন্দ করেন, এবং আমানতদারিতা ও ইনসাফের নীতির উপর আমল করেন, আশা করি তাঁরা উপকৃত হবেন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

তাকফিরের শর্ত, প্রতিবন্ধকতা কারণ

আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা আমাদের প্রতি এবং আপনার প্রতি রহম করুন! জানা আবশ্যক, এই স্পর্শকাতর শরঈ’ হুকুমটির অনেক শর্ত, প্রতিবন্ধক ও কারণ রয়েছে। আপনাকে এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে, এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং জানতে হবে।
এর প্রতি লক্ষ্য রাখা, বোঝা ও শেখার ক্ষেত্রে অনেকেই ত্রুটি করেছে। ফলে তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের ওপর তাকফিরের তরবারি ও দাঁত এমনভাবে বসিয়ে দিয়েছে, তাতে নেককার, গুনাহগার আর কাফেরের মাঝে কোনো তারতম্য করেনি।
এই স্পর্শকাতর বিষয়টিতে স্পষ্ট দলিলের ওপর থাকার জন্যে আমি এখানে তাকফিরের শর্ত, প্রতিবন্ধক ও কারণসমূহের ব্যাপারে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করছি। আর ‘তাকফিরের বিচ্যুতিসমূহ’ পরিচ্ছেদে অতিরিক্ত বিবরণ ও উদারহণ আসবে; কারণ সেটাই হলো এর বাস্তব প্রয়োগ ও বিশদ বিবরণের স্থান।
প্রথমত: شروط (শর্তাবলি) :
শরিয়তের পরিভাষায় شرط হলো, যার উপস্থিতি কোনো কিছুর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিকে আবশ্যক করে না, তবে তার অনুপস্থিতিمشروط (শর্তকৃত বিষয়টি) এর অনুপস্থিতিকে আবশ্যক করে।
অর্থাৎ এভাবে বলি, আমাদের আলোচ্য বিষয়ে শর্ত হচ্ছে যার উপস্থিতির ওপর তাকফিরের হুকুমটির উপস্থিতি নির্ভর করে। ফলে তার উপস্থিতি হুকুমের উপস্থিতিকে আবশ্যক করে না, কিন্তু তার অনুপস্থিতি হুকুমের অনুপস্থিতিকে বা বাতিল হওয়াকে আবশ্যক করে।
উদাহণস্বরূপ, إختيار (স্বাধীনতা) থাকা তাকফিরের একটি শর্ত, যা مانع الإكراه (বলপ্রয়োগ জনিত প্রতিবন্ধকতা) এর বিপরীত। সুতরাং যখন إختيار থাকবে না তখন তাকফিরের বিধানও প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু إختيار এর উপস্থিতিই কারও কুফরিতে লিপ্ত হওয়া বা তা গ্রহণ করে নেয়াকে আবশ্যক করে না।
তাকফিরের শর্তাবলি তিনভাগে বিভক্ত :
প্রথম প্রকার: شروط في الفاعل (কর্তার শর্তাবলি) :
১। مكلف তথা প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিস্ক হওয়া।
২। متعمد قاصد لفعله অর্থাৎ উক্ত কাজের ইচ্ছা থাকা।
৩। مختار له بإرادته অর্থাৎ ইচ্ছায় স্বাধীন হওয়া।
এই প্রকারটির (অর্থাৎ شروط في الفاعل এর) আলোচনা তার বিপরীত موانع তথা প্রতিবন্ধকসমূহের আলোচনায় আসবে। কারণ, موانع হলো شروط এর বিপরীত, যা সামনে আসবে।
দ্বিতীয় প্রকার : شروط في الفعل (কাজের শর্তাবলি), অর্থাৎ যে কাজটি হুকুমের কারণ, তার মধ্যে প্রযোজ্য শর্তাবলি।
এর সবগুলো শর্তের মূলকথা হলো : কাজটি সন্দেহাতীতভাবে কুফরি হওয়া। আর শর্তগুলো হচ্ছে :
১। ব্যক্তির কথা বা কাজটি কুফরের অর্থ বোঝাতে স্পষ্ট হওয়া।
২। উক্ত কথা বা কাজের ফলে যে শরঈ’ দলিলটি তাকে কাফের সাব্যস্ত করে, উক্ত দলিলটিও কাফের সাব্যস্ত করতে স্পষ্ট হওয়া।
এই প্রকারটির আলোচনা ও দৃষ্টান্তসমূহ এর শর্তদ্বয়সহ ‘তাকফিরের বিচ্যুতিসমূহ’ পরিচ্ছেদে মুহতামাল বিষয়সমূহের দ্বারা তাকফির করার আলোচনা প্রসঙ্গে আসবে।
তৃতীয় প্রকার : شروط في إثبات فعل المكلف (ব্যক্তির কাজটি প্রমাণিত হওয়ার জন্য শর্তাবলি)। অর্থাৎ কাজটি বিশুদ্ধ শরঈ’ পদ্ধতিতে প্রমাণিত হওয়া; কোনো ধারণা, অনুমান, সন্দেহ বা সংশয় দ্বারা না হওয়া।
আর তা হবে :
১। হয়তো স্বীকারোক্তি দ্বারা।
২। অথবা প্রমাণ, তথা দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য দ্বারা।
‘তাকফিরের বিচ্যুতিসমূহ’ আলোচনা প্রসঙ্গেও এর আলোচনা আসবে।
দ্বিতীয়ত: موانع (প্রতিবন্ধকসমূহ) :
موانع হলো এমন বাহ্যিক ও সুনির্দিষ্ট গুণ, যার উপস্থিতি হুকুমের অনুপস্থিতিকে আবশ্যক করে অর্থাৎ হুকুমকে বাতিল করে দেয়। তবে এর অনুপস্থিতি হুকুমের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কোনোটিকেই আবশ্যক করে না। যেমন, বলপ্রয়োগ তাকফিরের একটি প্রতিবন্ধক। সুতরাং তার উপস্থিতি, তথা যদি কাউকে কুফরের ব্যাপারে বলপ্রয়োগ করা হয়, তবে তা কুফরের বিধানটির অনুপস্থিতি বা বাতিল হওয়াকে আবশ্যক করবে। তবে বলপ্রয়োগ না থাকা কোনো হুকুমের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিকে আবশ্যক করে না। অর্থাৎ শরিয়তের আওতাভুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন থাকা বা বলপ্রয়োগাধীন না থাকাই তার কুফরি করা বা না করাকে আবশ্যক করে না; বরং সে কুফরি করতেও পারে, নাও করতে পারে। এ কারণে موانعও শর্তাবলির মতো তিন প্রকার হবে। এগুলো পুরোপুরি শর্তাবলির প্রকারসমূহের বিপরীত :
প্রথম প্রকার : موانع في الفاعل (কর্তার মাঝে প্রতিবন্ধকসমূহ) :
তা হচ্ছে কর্তার এমন عارضي (প্রাসঙ্গিক বা পরিপার্শ্বিক) সমস্যা, যার ফলে কথা ও কাজে তার জবাবদিহিতা থাকে না। এগুলো عوارض الأهلية বা ‘যোগ্যতার সমস্যা’ বলে পরিচিত। তা দুই প্রকার :
[ক] এমন সমস্যাবলি, যেগুলোকে (سماوية) আসমানি বলা হয়ে থাকে। কারণ তা অর্জনে বান্দার কোনো ভূমিকা থাকে না। যেমন, শিশু হওয়া, পাগল হওয়া, জ্ঞান লোপ পাওয়া, ভুলে যাওয়া ইত্যাদি। অতএব, এ প্রতিবন্ধকসমূহ তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে গুনাহ ও শাস্তি উঠিয়ে নেবে। কারণ, এ ব্যাপারে তার ওপর শরিয়তের আদেশই ওঠে গেছে।
তবে বান্দার হকের জন্য তাকে ধরা হবে। যেমন, নষ্ট করে ফেলা জিনিসের মূল্য দিতে হবে, দিয়্যত ওয়াজিব হবে এবং এ ধরনের যে বিধানগুলো আছে, সেগুলো কার্যকর হবে। কারণ, এগুলো হলো প্রাকৃতিক বিধান।
এই প্রতিবন্ধকগুলোর বিপরীত শর্তগুলো হচ্ছে :
১। ‘প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া’ শর্তটির বিপরীত প্রতিবন্ধক হলো শিশু হওয়া।
২। ‘সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া’ শর্তটির বিপরীত প্রতিবন্ধক হলো পাগল হওয়া বা জ্ঞান লোপ পাওয়া।
৩। ‘ইচ্ছা থাকা’ শর্তটির বিপরীত প্রতিবন্ধক হলো ভুলে যাওয়া।
[খ] عوارض مكتسبة (মানবার্জিত প্রতিবন্ধকসমূহ) : যেগুলো অর্জনে বান্দার কিছুটা اختيار বা স্বাধীনতা থাকে। মানবার্জিত প্রতিবন্ধকগুলো হচ্ছে :
(১) الخطأ (ভুল করা) : যেমন মুখ ফসকে বের হয়ে যাওয়া, অর্থাৎ ইচ্ছা না থাকা। ফলে কুফরি কথা বললো, কিন্তু তা তার ইচ্ছায় ছিল না বা কাফের বানিয়ে দেয় এমন কথা বা কাজ সে করতে চায়নি, বরং তার ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। এই প্রতিবন্ধকটি বাতিল হয়ে যাবে তার বিপরীত ইচ্ছার শর্তটি পাওয়া গেলে। তার দলিল হলো, আল্লাহ সুবহানাহুতা’লার বাণী –
وليس عليكم جناح فيما أخطأتم به ، ولكن ما تعمدت قلوبكم
“তোমাদের দ্বারা কোনো ভুল হয়ে গেলে সেজন্য তোমাদের কোনো গুনাহ হবে না। কিন্তু তোমরা কোনো কাজ অন্তর দিয়ে জেনে-বুঝে করলে (তাতে তোমাদের গুনাহ হবে)।” (আহযাব-৫০)
ঐ ব্যক্তির ঘটনাও আরেকটি প্রমাণ—এক ব্যক্তি মরুভূমিতে তার সওয়ারি হারিয়ে ফেলে, তারপর যখন তা পায়, তখন আনন্দের আতিশয্যে ভুলবশত বলে ফেলে, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা আমি তোমার মনিব’। ঘটনাটি রাসুল ﷺ বলেছেন।
এই প্রতিবন্ধকটির মতোই আরেকটি হলো, অন্যের কাছ থেকে বর্ণনা করতে কুফরি কথা বলা।
যেমন আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা তার কিতাবে কাফেরদের যে সমস্ত কথাবার্তা বর্ণনা করেছেন কেউ তা পাঠ করলো। যেহেতু আল্লাহই তার কিতাব তিলাওয়াত করার আদেশ করেছেন তাই তার পাঠকারীকে নিঃসন্দেহে তাকফির করা হবে না; বরং সে সওয়াব পাবে। অনুরূপভাবে সাক্ষী ব্যক্তি, যে কুফরি কথা শুনেছে। তার জন্য উক্ত কথা কাজি বা অন্য কারও কাছে বর্ণনা করা। অনুরূপ কাফেরদের কথাবার্তা বর্ণনা করা, তার বিভ্রান্তি বর্ণনা করার জন্য বা তার জবাব দেওয়ার জন্য। এ সবগুলো জায়েয, বরং ওয়াজিব। এর কারণে তার বক্তাকে কাফের বলা যাবে না। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কুফর বর্ণনাকারী কাফের নয়। কিন্তু এর ব্যতিক্রম হলো, যারা তাকে ভাল মনে করে ও সমর্থন করে তার প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে তা বর্ণনা করে; এটা নিঃসন্দেহে কুফর। আর এ সমস্ত অবস্থা চিহ্নিতকরণে অবস্থার লক্ষণসমূহের ভূমিকা রয়েছে।
কাজী ইয়াজ (রহঃ) বলেন, “কারও এমন কথা অন্যের কাছ থেকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে তার বর্ণনা ভঙ্গি লক্ষ করা হবে। আর বর্ণনা ভঙ্গির অবস্থাভেদে এর হুকুম চার ধরনের হবে: কখনো তা বর্ণনা করা ওয়াজিব হবে, কখনো মানদূব হবে, কখনো মাকরূহ হবে আবার কখনো হারাম হবে।”
(আশ শিফা ২/৯৯৭-১০০৩)
দৃষ্টি আকর্ষণ:
এ আলোচনা থেকে বুঝতে পেরেছেন, ‘ইচ্ছা না থাকা’ বলে সেই প্রতিবন্ধক বুঝানো হয় না, যেটাকে বর্তমান যামানার অনেক মুরজিয়ারা শর্ত করে থাকে এবং যা তাকফিরের অসম্ভব শর্তের মতো। তারা এর দ্বারা তাগুতগোষ্ঠী, যিন্দীক ও মুরতাদদের পক্ষে অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। তারা দাবি করে থাকে, কোনো মানুষ যদি কুফরি কথা বা কাজ ইচ্ছাকৃতও করে, তথাপি তাকে ততক্ষণ তাকফির করা যাবে না, যতক্ষণ সে এর দ্বারা দ্বীন থেকে বের হওয়া ও কুফরি করার ইচ্ছা না করে। এখানে ‘ইচ্ছা না থাকা’ প্রতিবন্ধকটির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ভুল করা, যা ইচ্ছার বিপরীত এবং যা তাকফিরের শর্ত। অথবা কারও কুফরি কথা বলা বা কাজ করার ইচ্ছা না থাকা, বরং তার অন্যকিছু উদ্দেশ্য থাকা। যেমন, কুফরি কথা বর্ণনা করলো, অথবা তা থেকে সতর্ক করলো, অথবা অর্থ না বুঝে কুফরি কথা বললো, অথবা এ জাতীয় ভুল করলো, যেমনটা আগে আলোচিত হয়েছে।
পক্ষান্তরে দ্বীন থেকে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করা বা উক্ত কথা বা কাজের মাধ্যমে কুফরি করার ইচ্ছা করা, এটা তো কম লোকই ইচ্ছা করে বা স্পষ্টভাবে বলে। এমনকি ইহুদি ও খৃষ্টানদেরও যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তারা যে ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলে, বা ওযায়েরকে আল্লাহর পুত্র বলে, বা এ জাতীয় অন্যান্য কুফরিগুলো করে, এর দ্বারা কি তারা কুফরি করার ইচ্ছা করে? তাহলে তারা তা অস্বীকার করবে এবং এর মাধ্যমে কুফরি করার কথা নাকচ করে দেবে।
যেমন, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) আস সারিমিল মাসলুল কিতাবে ১৭৭-১৭৮ নং পৃষ্ঠায় বলেন, “মোটকথা, যে কোনো কুফরি কথা বলে, বা কুফরি কাজ করে, এর কারণে তাকে কাফের আখ্যা দেওয়া হবে। যদিও এতে সে কাফের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা না করে। কেননা কেউই কুফরি করার ইচ্ছা করে না, একমাত্র আল্লাহ ব্যতিক্রম যা চান।”
এখানে সারকথা হলো, ইচ্ছা থাকার শর্ত করা ইচ্ছা না থাকাকে প্রতিবন্ধক মনে করার ক্ষেত্র শুধু কুফরি কাজটির ইচ্ছা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ; কাজটির মাধ্যমে আলাদা করে কুফরের ইচ্ছা করা জরুরি নয়।
(২) التأويل (ব্যাখ্যা করা):
এখানে ব্যাখ্যা করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, শরঈ’ কোনো দলিলকে অনুপযুক্ত জায়গায় প্রয়োগ করা, কোনো ইজতিহাদ তথা অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে, অথবা শরঈ’ বর্ণনা না বুঝা থেকে সৃষ্ট সংশয়ের কারণে, অথবা শরঈ’ বর্ণনা ভুল বুঝে সেটাকে সঠিক মনে করার কারণে, অথবা যা দলিল নয় তাকে দলিল বোঝার কারণে। যেমন দুর্বল হাদিসকে সহিহ মনে করে তা দিয়ে দলিল পেশ করা। ফলে একজন শরঈ’ দায়িত্বশীল ব্যক্তি কোনো কুফরি কাজে লিপ্ত হয়, কিন্তু সে সেটাকে কুফরি বলে মনে করত না। এর ফলে ‘ইচ্ছা থাকা’ শর্তটি পাওয়া যাবে না। ফলে ব্যাখ্যার এই ভুলটি তাকফিরের জন্য একটি প্রতিবন্ধক হয়ে যাবে।
সুতরাং, যদি তার কাছে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় এবং তার ভুল স্পষ্ট করে দেওয়া হয় এবং এরপরও সে নিজ কর্মে অনড় থাকে, তখন তাকে তাকফির করা হবে।
এর দলিল হলো, এই ধরনের ব্যাখ্যাকে ঐ সব ভুলের অন্তর্ভুক্ত ধরার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন, যেগুলো আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যা পূর্বোক্ত দলিলাদির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের ইজমার ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল কুদামা ইবনে মাজউনের ঘটনার প্রেক্ষিতে, যখন তিনি নিম্নোক্ত আয়াত দিয়ে দলিল পেশ করে তার সাথীদের নিয়ে মদ পান করেছিলেন :
ليس على الذين أمنوا وعملوا الصالحات جناح فيما طعموا إذا ما اتقوا وآمنوا وعملوا الصالحات ثم اتقوا وآمنوا ثم اتقوا وأحسنوا والله يحب المحسنين
“যারা ইমান এনেছে সৎকর্ম করেছে, তারা পূর্বে যা – কিছু খেয়েছে তার কারণে তাদের কোনোও গুনাহ নেই- যদি তারা আগামীতে তা হতে বেঁচে থাকে, ইমান রাখে সৎকর্মে রত থাকে এবং (আগামীতে যেসব জিনিস নিষেধ করা হয় তা থেকে) বেঁচে থাকে ঈমানে প্রতিষ্ঠিত থাকে আর তারপরে তাকওয়া ইহসান অবলম্বন করে। আল্লাহ ইহসান অবলম্বনকারীদের ভালবাসেন।” (মায়িদাহ: ৯৩)
ঘটনাটি আব্দুর রাজ্জাক তার মুসান্নাফে বর্ণনা করেছেন,
কুদামা (রাঃ)-কে হযরত উমার (রাঃ) বাহরাইনের গভর্নর বানিয়েছিলেন। এরপর যখন তার বিরুদ্ধে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) অন্যান্যরা সাক্ষ্য দেন এবং তাঁদের সাথে তাঁর স্ত্রীও সাক্ষ্য দেন যে, তিনি মদ পান করেছেন, তখন উমার (রাঃ) তাঁকে ডেকে এনে পদচ্যুত করেন। তারপর তাঁর ওপর হদ প্রয়োগ করতে উদ্যত হলে কুদামা (রাঃ) উল্লেখিত আয়াত দিয়ে দলিল পেশ করেন। তখন উমার (রাঃ) বলেন, তুমি ব্যাখ্যায় ভুল করেছ। তোমার নিতম্ব গর্ত অনুসন্ধানে ভুল করেছে।…
ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) আস সারিমিল মাসলুল কিতাবে বলেন,
“অবশেষে তার সিদ্ধান্ত পরামর্শ পরিষদের সিদ্ধান্ত এ ব্যাপারে ঐক্যমত হলো যে, তাঁর তাঁর সাথীদের কাছ থেকে তাওবা চাওয়া হবে, যদি তারা একে হারাম বলে স্বীকার করে নেয়, তাহলে তাদের দুররাহ মারা হবে, আর যদি হারাম বলে স্বীকার না করে, তবে তাদের কাফের সাব্যস্ত করা হবে।” (পৃ: ৫০৩)
তারপর উমার (রাঃ) তাঁর ভুলটি বুঝিয়ে দিয়ে বলেন: তুমি যদি আল্লাহকে ভয় করতে, তবে যা তোমার ওপর হারাম করা হয়েছে তা থেকে বেঁচে থাকতে। মদ পান করতে না..। এতে হযরত কুদামা (রাঃ) পূর্ব মত থেকে ফিরে আসলেন, আর উমার (রাঃ)-ও তাঁকে কাফের সাব্যস্ত করলেন না, বরং তাঁর ওপর মদ পানের শাস্তি প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত হলেন। আর এ ব্যাপারে কোনো সাহাবিও তাঁর বিরোধিতা করলেন না।
উলামায়ে কেরাম এই ব্যাপারে স্পষ্ট বিবরণ পেশ করেছেন যে, কোনো শরঈ’ দলিল ছাড়া কোনো শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা, এটা কোনো বৈধ ব্যাখ্যা নয়। কারণ এভাবে করেই পরবর্তীকালের লোকেরা শরঈ’ বিবরণসমূহের ওপর নিজেদের মনগড়া কর্তৃত্ব চর্চা করেছিল, আর বলেছিল, আমরা তো ব্যাখ্যা করছি। মানুষের কাছে সাজিয়ে তোলার জন্য তারা বিকৃতিকে ব্যাখ্যা বলে নাম দিয়েছিল, যাতে মানুষ তা গ্রহণ করে। আর যারা মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ভ্রান্ত বিষয়কে সাজিয়ে ও প্রলেপ দিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে, তাদের নিন্দা করে আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা বলেন,
وكذلك جعلنا لكل نبي عدواً شياطين الإنس والجن يوحي بعضهم إلى بعض زخرف القول غرورا
“এবং (তারা যেমন আমার নবির সাথে শত্রুতা করেছে) এভাবেই আমি (পূর্ববর্তী) প্রত্যেক নবির জন্য কোনোও না কোনো শত্রুর জন্ম দিয়েছি অর্থাৎ মানব জিনদের মধ্য থেকে শয়তান কিসিমের লোকদেরকে, যারা ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে একে অপরকে বড় চমৎকার কথা শেখাত।” (আনআম: ১১২)
(৩) مانع الجهل (অজ্ঞতাজনিত প্রতিবন্ধক): এটা তখনই ওযর বা প্রতিবন্ধক হিসাবে গণ্য হবে যখন তা এমন অজ্ঞতা হবে, যা একজন মুকাল্লাফ (বিধানাবলির আওতাধীন ব্যক্তি) দূর করতে সক্ষম না।
কিন্তু যদি অজ্ঞতা এমন হয় যে, একজন ব্যক্তি তা দূর করতে সক্ষম, কিন্তু সে শৈথিল্য ও বিমুখতাবশত অজ্ঞতা দূর করলো না, তাহলে এটা নিজের অর্জিত অজ্ঞতা, যা ওযর হিসাবে গৃহীত নয়। শরঈ’ভাবে তাকে এ ব্যাপারে জ্ঞাত বলেই ধরা হবে, যদিও বাস্তবে সে জ্ঞাত নয়। কারণ এটাই তো আল্লাহর দ্বীন থেকে বিমুখতা অবলম্বনকারীর অবস্থা, অর্থাৎ যার কাছে ভীতি প্রদর্শনকারী আল্লাহর কিতাব পৌঁছেছে কিন্তু সে তা শেখা ও এর ব্যাপারে চিন্তা করা থেকে বিমুখ থেকেছে। সে-ই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝার ব্যাপারে অবহেলা করেছে, যার জন্য আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা সমস্ত সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টি করলেন…। আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা বলেন,
فما لهم عن التذكرة معرضين كأنهم حمر مستنفرة فرت من قسورة
“তাদের কী হলো, তারা উপদেশবাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে? যেন তারা বন্য গাধা, যা কোনো সিংহের ভয়ে পলায়ন করছে।” (মুদ্দাস্‌সির: ৪৯-৫১)
আল্লাহ সুবহানাহু অন্যত্র বলেন,
وأوحي إلي هذا القرآن لأنذركم به ومن بلغ
… বলে দিন, আল্লাহই আমার এবং তোমাদের মধ্যে সাক্ষী। আমার প্রতি ওহীরূপে এই কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরও সতর্ক করি এবং যাদের কাছে এই কুরআন পৌঁছবে তাদেরও।” (আনআম: ১৯)
এ কারণেই উলামায়ে কেরাম তাদের শরঈ’ মূলনীতিসমূহের আলোচনায় এ ব্যাপারে স্পষ্ট বিবরণ পেশ করেছেন। যেমন, ইমাম করাফি (মৃত্যু: ৬৮৪ হি:) বলেছেন,
‘যে অজ্ঞতা মুকাল্লাফের (বিধানাবলির আওতাধীন ব্যক্তির) পক্ষে দূর করা সম্ভব, তা অজ্ঞ ব্যক্তির জন্য ওযর হিসাবে গৃহীত হবে না’। (দেখুন, আলফুরুক ৪/২৬৪ পৃষ্ঠা। এছাড়া ২/১৪৯-১৫১ পৃষ্ঠাও দেখুন)
বস্তুত: ঐ সব লোকের ক্ষেত্রেই অজ্ঞতাকে প্রতিবন্ধক হিসাবে ধরা হবে, ওযর বলে গ্রহণ করা হবে, যাদের মাঝে মূল তাওহিদের বিশ্বাস বিদ্যমান; শুধু এমন কিছু মাসআলার ব্যাপারে অস্পষ্টতা রয়েছে, যেগুলো কখনো অস্পষ্ট বা কঠিন হতে পারে, অথবা যেগুলোর সংজ্ঞা ও বিবরণের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের মাসআলাসমূহের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর নাম ও গুণাবলির মাসআলা। তাওহিদে বিশ্বাস স্থাপনকারী কোনো ব্যক্তি যদি এ ক্ষেত্রে ভুলের স্বীকার হয়, তাহলে তার ওযর গ্রহণ করার ব্যাপারে শরঈ’ দলিল রয়েছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে সংজ্ঞা ও বিবরণ উল্লেখ করার মাধ্যমে দলিল স্পষ্ট করা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে তাকফির না করার ব্যাপারেও শরঈ’ দলিল রয়েছে।
নতুন ইসলাম গ্রহণকারী অথবা যে এমন দূর পল্লিতে প্রতিপালিত হয়েছে, যেখানে শরিয়তের বিস্তারিত বিবরণসমূহ পৌঁছা কষ্টকর, তাদের ওযর গ্রহণ করার বিষয়টিও এরই অন্তর্ভুক্ত। যে বিষয়ে তারা জনে না সে বিষয়ে তাদের ওযরও গ্রহণ করা হবে, যদি তারা তাওহিদে বিশ্বাসী হয় এবং বড় শিরক ও সমকক্ষ সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকে।
(৪) مانع الإكراه (বলপ্রয়োগ-জনিত প্রতিবন্ধক):
এর বিপরীত শর্তটি হলো, مكلف তথা শরঈ’ দায়িত্বশীল ব্যক্তি স্বীয় কর্মে স্বাধীন হওয়া। এই প্রতিবন্ধকটির প্রমাণ মেলে আল্লাহর এই বাণীতে-
من كفر بالله من بعد إيمانه إلا من أكره وقلبه مطمئن بالإيمان
“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ইমান আনার পর তাঁর কুফরিতে লিপ্ত হয়, অবশ্য সে নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু তার অন্তর ঈমানে স্থির রয়েছে।” (নাহল: ১০৬)
উলামায়ে কেরাম বলপ্রয়োগ-জনিত প্রতিবন্ধকটি বিশুদ্ধভাবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য কতগুলো শর্ত উল্লেখ করেছেন,
১। এক বলপ্রয়োগকারী ব্যক্তি যে বিষয়ের হুমকি দিচ্ছে তা বাস্তবিকই কার্যকর করার ক্ষমতা রাখা, আর যাকে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে সে তা থেকে আত্মরক্ষা করতে অক্ষম হওয়া, এমনকি পলায়ন করতেও সক্ষম না হওয়া।
২। বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তির প্রবল ধারণা হওয়া যে, সে অমত করলে তার ওপর উক্ত শাস্তিটি কার্যকর করে ফেলবে।
৩। বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তির মাঝে ব্যক্তিগত অবাধ্যতার কোনো নিদর্শন পাওয়া না যাওয়া। উদাহণত: যতটুকু দ্বারা বিপদ দূর করা সম্ভব সে নিজ থেকে তার বেশি কুফরি কথা বললো বা কুফরি কাজ করলো।
উলামায়ে কেরাম শর্তও করেছেন যে, কুফরি কথা উচ্চারণের জন্য যে শাস্তির হুমকি দেওয়া হচ্ছে তা এমন হতে হবে, যা সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের নেই। উলামায়ে কেরাম এর উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন, ভীষণ নির্যাতন করা, অঙ্গ কেটে ফেলা, আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া, হত্যা করা বা এই জাতীয় শাস্তি।
এর কারণ হচ্ছে, যার উসিলায় বলপ্রয়োগকৃতদের ওযর গ্রহণ করা সংক্রান্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে—হযরত আম্মার (রাঃ)—তিনি তখনই কুফরি কথা বলেছিলেন, যখন তার পিতামাতাকে হত্যা করা হয়েছিল, তাঁর পাজর ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল, আল্লাহর পথে ভীষণ শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
তারা আরো শর্ত করেছেন যে, বলপ্রয়োগ অব্যাহতির পর তার ইসলাম প্রকাশ করতে হবে। যদি তখন ইসলাম প্রকাশ করে তাহলে সে ইসলামরে ওপর অটল থাকবে, আর যদি কুফরি প্রকাশ করে তবে যে সময় সে কুফরি কথা উচ্চারণ করেছে সে সময় থেকেই তার ব্যাপারে কুফরের হুকুম দেওয়া হবে। এর সাথে দৃষ্টি আকর্ষণ করা সঙ্গত মনে করছি যে, উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে স্পষ্ট বর্ণনা পেশ করেছেন, যার ব্যাপারে এই প্রমাণ উপস্থিত হবে যে, সে কুফরি কথা উচ্চারণ করেছে, আর তখন সে কাফেরদের কাছে আটকা ছিল, ভয় শংকার মাঝে তাদের কাছে বন্দী ছিল, এমন ব্যক্তির ব্যাপারে কুফরের হুকুম আরোপ করা হবে না।
কেননা যতক্ষণ সে তাদের কর্তৃত্বাধীন বন্দী বা আটক ছিল, ততক্ষণ তার ব্যাপারে বলপ্রয়োগের ধারণা করা যায় এবং তখন কাফেররাও তার ওপর যা ইচ্ছা শাস্তি কার্যকর করতে পারত। আর যদি এই সাক্ষ্য পাওয়া যায় যে, সে তা উচ্চারণ করার সময় নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ছিল, তাহলে তার ওপর কুফরের হুকুম আরোপ করা হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়োজন, উলামায়ে কেরাম যে প্রকার বলপ্রয়োগের ব্যাপারে আলোচনা করেন—বলপ্রয়োগের কারণে কুফরি কথা বলে বা কুফরি কাজ করে আবার পুনরায় ইসলামে ফিরে আসা, যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। পক্ষান্তরে কুফরের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা ও তাতে সবসময় বহাল থাকার ব্যাপারে বলপ্রয়োগ করা হলে, সেটাকে উলামায়ে কেরাম ধর্তব্য করেন না এবং তার অমুমোদনও দেন না। তাঁরা এই প্রতিষ্ঠিত থাকার মাঝে আর বলপ্রয়োগের গ্রহণযোগ্য ওযরের স্থানগুলোর মাঝে পার্থক্য করেন।
যেমন, ইমাম আসরাম (রহঃ) আবু আব্দুল্লাহ তথা ইমাম আহমাদ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন,
“তাকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলো, যাকে বন্দী করে তার সামনে কুফর পেশ করা হয়েছে, তাতে বাধ্য করা হয়েছে, তার কি ধর্ম ত্যাগ করার অনুমতি আছে? তিনি এটাকে খুব কঠিনভাবে অপছন্দ করলেন। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে এদের অবস্থা সমস্ত সাহাবাদের অবস্থার মত মনে হয় না, যাদের ব্যাপারে আয়াত নাযিল হয়েছে। তাদেরকে কুফরি কথা বলতে বাধ্য করা হত, তারপর ছেড়ে দেওয়া হত, তারা যা ইচ্ছা করতে পারতেন। কিন্তু এরা তো তাদেরকে কুফরির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখতে এবং স্বীয় দ্বীন পরিত্যাগ করতে বাধ্য করছে। দুটো এক নয়। কারণ যাদের কুফরি কথা উচ্চারণের জন্য বাধ্য করা হয়, তারপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাদের তো এতে কোনো ক্ষতি নেই। আর এই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে অবস্থানরত, সে তো স্থায়ী কুফরকে গ্রহণ করা, হারামসমূহকে হালাল করা, ফরজ ওয়াজিবসমূহকে বর্জন করা এবং অন্যায় নিষিদ্ধ কাজসমূহে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে তাদের আহ্বানগুলোকে গ্রহণ করে নিচ্ছে। সে যদি নারী হয়, তাহলে তারা তাকে বিয়ে করবে, তার থেকে তাদের কাফের বাচ্চা জন্ম দেবে। এমনিভাবে পুরুষ হলেও। তাদের বাহ্যিক অবস্থা এটাই যে, তারা প্রকৃত কুফর গ্রহণ করে নিয়েছে এবং সরল দ্বীন থেকে সরে গিয়েছে।’ ”
(আল-মুগনি, মুরতাদ অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ‘যাকে কুফরি কথা উচ্চারণ করতে বাধ্য করা হয়েছে তার জন্য উত্তম হলো অটল থেকে তা না বলা’…)
দ্বিতীয় প্রকার প্রতিবন্ধকসমূহ: موانع في الفعل
অর্থাৎ, যে কাজের কারণে তাকফির করা হয় উক্ত কাজের মধ্যে প্রতিবন্ধকসমূহঃ
১। কথা বা কাজটি কুফরের অর্থ বুঝাতে স্পষ্ট না হওয়া।
২। উক্ত কথা বা কাজটিকে কুফর প্রমাণ করতে যে শরঈ’ দলিলটি পেশ করা হয়েছে সে দলিলটি উক্ত কথা বা কাজটিকে কুফর বোঝাতে অকাট্য না হওয়া।
তাকফিরের বিচ্যুতিসমূহ শিরোনামের অধীনে ষষ্ঠ ও সপ্তম ভুলের মাঝে এ ব্যাপারে আলোচনা আসবে ইন-শা-আল্লাহ।
তৃতীয় প্রকার: موانع في الثبوت (প্রমাণিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকসমূহ):
এটা হচ্ছে প্রতিবন্ধকসমূহের বিচারিক দিক। এক্ষেত্রে যদি তার মাঝে কুফরের অবশ্য ফলাফলগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পেতে থাকে, যেমন মুসলমানদের রক্ত ও সম্পদ নিজের জন্য বৈধ করে নেয়, তাহলে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই প্রতিবন্ধকটি হচ্ছে এমন, অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর কুফরটি শরঈ’ভাবে প্রমাণিত হলো না। অর্থাৎ তার নিজের স্বীকারোক্তি বা ন্যায়পরায়ণ দুজন ব্যক্তির সাক্ষ্য, এর কোনোটাই হলো না। অথবা সাক্ষীদের কেউ পাগল হওয়ার কারণে বা শিশু হওয়ার কারণে বা অন্য কোনো কারণে এ ব্যাপারে অগ্রহণযোগ্য। অথবা এমন হলো যে, সাক্ষী অভিযুক্ত ব্যক্তির শত্রু, অথবা সাক্ষীর ন্যায়পরায়ণতা প্রশ্নবিদ্ধ, আর অভিযুক্ত ব্যক্তিও তার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং কসম করে তার কথা প্রত্যাখ্যান করে।
তাকফিরের প্রতিবন্ধকগুলো প্রসঙ্গে কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয়
(জ্ঞাতব্য : ১) তাকফিরের প্রতিবন্ধকগুলো বর্ণনা করা ওয়াজিব হচ্ছে, مقدورعليه তথা কর্তৃত্বাধীনের ক্ষেত্রে; ممتنع অর্থাৎ প্রতিরোধ বা যুদ্ধ পরিচালনাকারীর ক্ষেত্রে তা ওয়াজিব নয়:
পূর্বোক্ত আলোচনার পর যে বিষয়টি আপনাদেরকে জানতে হবে, তা হচ্ছে এই যে, এই প্রতিবন্ধকগুলো বর্ণনা করা কেবল কর্তৃত্বাধীনের কাছেই ওয়াজিব; প্রতিরোধকারীর কাছে তা বর্ণনা করা ওয়াজিব নয়।
الامتناع তথা প্রতিরোধ করার দুইটি অর্থঃ
১) পূর্ণ শরিয়ত বা আংশিক শরিয়ত পালন করতে অস্বীকার করা।
২) মুসলমানদের ক্ষমতাবলয় থেকে নিজেকে নিরাপদ করে নেওয়া, যাতে মুসলমানরা তাকে আল্লাহর শরিয়তের সম্মুখীন করতে না পারে।
উল্লেখ্য, উভয় প্রকারের মাঝে সমন্বয় আবশ্যক নয়। কখনো হতে পারে, কেউ শরিয়ত পালন করতে অস্বীকার করেছে, কিন্তু সে ইসলামি রাষ্ট্রে মুসলমানদের ক্ষমতাধীন রয়েছে। যেমন, কোনো একজন ব্যক্তি যাকাত অস্বীকার করলো এবং সে মুসলমানদের ক্ষমতাধীন ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাস করছে। কখনো উভয়টি একসাথেও হতে পারে। যেমন, শরিয়ত পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী ব্যক্তি দারুল কুফরের মাধ্যমে আত্মরক্ষা করলো, অথবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সেনাবাহিনী বা আইন-কানুনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুললো। যার ফলে মুসলমানেরা তাকে আল্লাহর হুকুমের সামনে উপস্থিত করতে এবং তার উপর আল্লাহর শাস্তি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে না।
মুসলমানদের ক্ষমতাবলয় থেকে নিরাপত্তা অবলম্বনকারী কখনো হাত দ্বারা যুদ্ধ করতে পারে, কখনো বা জবান দ্বারাও যুদ্ধ করতে পারে। (দেখুন আস সারিমুল মাসলুল, পৃ:৩৮৮)
উলামায়ে কেরাম ব্যাপারে স্পষ্ট বলেছেন যে, মুসলমানদের ক্ষমতা বলয় থেকে নিরাপত্তা আত্মরক্ষা অবলম্বনকারী থেকে তওবা চাওয়া ওয়াজিব নয়। সুতরাং যে আগ্রাসী মুসলমানদের দেশসমূহে আক্রমণ করে তা দখল করে নেয় এবং শাসনের চাবিকাঠি হাতে নিয়ে নেয়, তার থেকে তো কিছুতেই তওবা চাওয়া হবে না।
এখানে তওবা চাওয়ার দুটি অর্থ:
১) যার ওপর ধর্ম ত্যাগের বিধান আরোপ করা হয়েছে তার কাছ থেকে তওবা চাওয়া।
২) কারও ওপর ধর্ম ত্যাগের বিধান আরোপের আগে তার কাছে তাকফিরের শর্তাবলি ও তার প্রতিবন্ধকসমূহ বর্ণনা করা। আর এই প্রকারটির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।
(জ্ঞাতব্য: ২) এমন কতগুলো অজুহাত, যেগুলোকে মুরতাদরাসহ অন্যান্যরা ওযর হিসাবে পেশ করে থাকে, অথচ সেগুলো তাকফিরের প্রতিবন্ধক বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়:
১। কারও বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া, চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া, দুনিয়াবি কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ বন্ধ করে দেওয়া এ জাতীয় যেসব বিষয়গুলোর মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হয়ে থাকে, তার আশঙ্কা। ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
ومن الناس من يقول آمنا بالله فإذا أوذي في الله جعل فتنة الناس كعذاب الله
“মানুষের মধ্যে কতক লোক এমন আছে, যারা বলে, আমরা আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছি। তারপর যখন আল্লাহর পথে তাদের কোনো কষ্ট-ক্লেশ দেখা দেয়, তখন তারা মানুষের দেওয়া কষ্টকে আল্লাহর আযাব তুল্য গণ্য করে।” (আনকাবুত: ১০)
আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা অন্যত্র বলেন,
يا أيها الذين آمنوا لا تتخذوا اليهود والنصارى أولياء بعضهم أولياء بعض ومن يتولهم منكم فإنه منهم إن الله لا يهدي القوم الظالمين * فترى الذين في قلوبهم مرض يسارعون فيهم يقولون نخشى أن تصيبنا دائرة فعسى الله أن يأتي بالفتح أو أمر من عنده فيصبحوا على ما أسروا في أنفسهم نادمين * ويقول الذين أمنوا أهؤلاء الذين أقسموا بالله جهد أيمانهم إنهم لمعكم حبطت أعمالهم فأصبحوا خاسرين * يا أيها الذين أمنوا من يرتد منكم عن دينه
“হে মুমিনগণ! ইয়াহুদি খৃষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা নিজেরাই একে অন্যের বন্ধু! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদেরকে বন্ধু বানাবে, সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে হিদায়াত দান করেন না।
সুতরাং যাদের অন্তরে (মুনাফেকির) ব্যাধি আছে, তুমি তাদেরকে দেখতে পাচ্ছ যে, তারা অতি দ্রুত তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। তারা বলছে, আমাদের আশঙ্কা হয়, আমরা কোনো মুসিবতের পাকে পড়ে যাব। (কিন্তু) এটা দূরে নয় যে, আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ হতে অন্য কিছু ঘটাবেন, ফলে তখন তারা নিজেদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল, তজ্জন্য অনুতপ্ত হবে।
এবং (তখন) মুমিনগণ (পরস্পরে) বলবে, এরাই কি তারা, যারা জোরদারভাবে কসম করে বলত যে, তারা অবশ্যই তোমাদের সাথে। তাদের কর্ম নিস্ফল হয়ে গেছে এবং তারা অকৃতকার্য হয়েছে।
হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি নিজ দ্বীন থেকে ফিরে যায়…।” (মায়িদাহ: ৫১-৫৪)
সুতরাং এই সব আয়াতসমূহে ঐ সব লোকদের ধর্ম ত্যাগের কথা বলা হয়েছে, যারা শুধু ভয়ের কারণে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে এবং এ কথাও স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে যে, তাদের সব কর্ম বিনষ্ট হয়ে গেছে। আর এটা একমাত্র কুফরের কারণেই হতে পারে।
২। এ কারণে এটাও তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধক নয় যে, মুরতাদরা তাদের সহযোগীরা অসহায়ত্বের ওযর পেশ করে এবং এই ওযর পেশ করে যে, শাসকদের কারণে তাদের কিছু করার নেই।
কেননা তাদের যদি বাস্তবে গ্রহণযোগ্য ওযর থেকেও থাকে, তথাপি তা তো তাদের শিরক ও কুফরের সাহায্য করা এবং তার অনুসারীদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাহায্য করার অনুমোদন দেয় না। কেননা কেউ তো তাদের এই কাজটিতে বাধ্য করে না, কেউ তাদের ঐ সব পদের দায়িত্ব নিতেও বাধ্য করে না, যাতে এ ধরনের কুফরিসমূহ রয়েছে। বরং তারাই তা অর্জনের জন্য মৃত্যুর ঝুঁকিও নিতে চায় এবং তা লাভের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ ও মাধ্যম তালাশ করতে থাকে।
অতএব বুঝা গেল, আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা, অসহায় হওয়ার দলিল দিয়ে কাফেরদের কুফর শিরকের অনুসরণকারীদের ওযর গ্রহণ করেননি, যা অনেক আয়াতে স্পষ্ট। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وإذ يتحاجون في النار فيقول الضعفاء للذين استكبروا إن كنا لكم تبعاً فهل انتم مغنون عنا نصيباً من النار * قال الذين استكبروا إنا كل فيها إن الله قد حكم بين العباد
“এবং সেই সময়কে স্মরণ রাখ, যখন তারা জাহান্নামে একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়া করবে। সুতরাং (দুনিয়ায়) যে ছিল দুর্বল, সে আত্মগর্বীদের বলবে, আমরা তো তোমাদের অনুগামী ছিলাম। তা তোমরা কি আমাদের পরিবর্তে আগুনের কিছু অংশ গ্রহণ করবে?
যারা আত্মগর্বী ছিল তারা বলবে, আমরা সকলেই জাহান্নামে আছি। আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে ফয়সালা করে ফেলেছেন।” (গাফির: ৪৭-৪৮)
অন্যত্র বলেন,
ولو ترى إذ الظالمون موقوفون عند ربهم يرجع بعضهم إلى بعض القول يقول الذين استضعفوا للذين استكبروا لولا أنتم لكنا مؤمنين قال الذين استكبروا للذين استضعفوا أنحن صددناكم عن الهدى بعد إذ جاءكم بل كنتم مجرمين * وقال الذين استضعفوا للذين استكبروا بل مكر الليل والنهار إذ تأمروننا أن نكفر بالله ونجعل له أندادا ، وأسروا الندامة لما رأوا العذاب وجعلنا الأغلال في أعناق الذين كفروا هل يجزون إلا ما كانوا يعملون
“তুমি যদি সেই সময়ের দৃশ্য দেখতে, যখন জালিমদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে আর তারা একে অন্যের কথা রদ করবে। দুনিয়ায় যাদেরকে দুর্বল মনে করা হয়েছিল, তারা ক্ষমতা-দর্পীদের বলবে, তোমরা না হলে আমরা অবশ্যই মুমিন হয়ে যেতাম।
যারা ক্ষমতাদর্পী ছিল তারা, যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদের বলবে, হিদায়াত তোমাদের কাছে এসে যাওয়ার পর আমরাই কি তোমাদের তা থেকে ফিরিয়ে রেখেছি? প্রকৃতপক্ষে তোমরা নিজেরাই অপরাধী ছিলে। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হয়েছিল তারা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, না, বরং এটা তো তোমাদের দিবা-রাত্রের চক্রান্তই ছিল (যা আমাদেরকে হিদায়াত থেকে ফিরিয়ে রেখেছিল), যখন তোমরা আমাদের আদেশ করছিল আমরা যেন আল্লাহর কুফরি করি এবং তার সাথে (অন্যদেরকে) শরিক সাব্যস্ত করি। তারা যখন আযাব দেখবে তখন তারা অনুতাপ গোপন করবে এবং যারা কুফরি অবলম্বন করেছিল আমি তাদের সকলের গলায় বেড়ি পরাব। তাদের তো কেবল তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে।”
(সাবা: ৩১-৩৩)
৩। মুরতাদরা এবং তাদের সহযোগীরা নিজেদের মুমিন দাবি করে, অথবা এই দাবি করে যে, তারা যেসব কুফরিতে লিপ্ত হচ্ছে, তাতে তারাই সত্যের ওপর আছে, এটাও তাকফিরের প্রতিবন্ধকসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়।
কারণ আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা অনেক কাফেরদেরই এরূপ অবস্থা বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এটাকে তাদের জন্য তাকফিরের প্রতিবন্ধক হিসবে গণ্য করেননি।
যেমন আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা বলেন,
قل هل ننبئكم بالأخسرين أعمالا الذين ضل سعيهم في الحياة الدنيا وهم يحسبون أنهم يحسنون صنعا
“বলে দাও, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব, কর্মে কারা সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারা সেই সব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের সমস্ত দৌড়-ঝাপ সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, অথচ তারা মনে করে, তারা খুবই ভাল কাজ করছে।” (কাহফ: ১০৪)
তিনি আরো বলেন,
إنهم اتخذوا الشياطين أولياء لهم من دون الله ويحسبون أنهم مهتدون
“নিশ্চয়ই তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে আর তারা মনে করছে যে, তারা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত আছে।” (আ’রাফ: ৩০)
৪। যাকে কুফরির কারণসমূহের কোনো কারণে লিপ্ত হওয়ার ফলে বা ইসলাম ভঙ্গকারী বিষয়সমূহের কোনো বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার ফলে তাকফির করা হয়, সে ইসলামের কিছু কিছু বিধান পালন করে, যেমন নামায পড়ে বা আল্লাহ আল্লাহর রাসুলের ব্যাপারে স্বাক্ষ্য দেয় বা এজাতীয় আরো কিছু করে- এটাও তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধক নয়।
আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, মুশরিকদেরও অনেক আমল আছে এবং তাদের কারও মাঝে ইমানের শাখাসমূহের অনেক শাখা বিদ্যমান, কিন্তু এগুলো তার শিরককে মুছে ঢেকে দেয় না। যেমন আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা বলেন,
وما يؤمن أكثرهم بالله إلا وهم مشركون
“তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই এমন যে, তারা আল্লাহর প্রতি ইমান রাখলেও তা এভাবে যে, তাঁর সঙ্গে শরীক করে।”
৫। যে স্পষ্ট কোনো কুফরি কাজে লিপ্ত হয়েছে সে ধর্মীয় গুরু, সন্ন্যাসী, নেতা, শাসক বা অন্যান্যদের দ্বারা পথভ্রষ্ট হওয়াও তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إن الله لعن الكافرين وأعد لهم سعيرا * خالدين فيها أبدا لا يجدون وليا ولا نصيرا * يوم تقلب وجوههم في النار يقولون يا ليتنا أطعنا الله وأطعنا الرسولا * وقالوا ربنا إنا أطعنا سادتنا وكبراءنا فأضلونا السبيلا * ربنا آتهم ضعفين من العذاب والعنهم لعنا كبيرا
“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ কাফেরদেরকে তাঁর রহমত থেকে বিতাড়িত করেছেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত আগুন। তাতে তারা সর্বদা এভাবে থাকবে যে, তারা কোনো অভিভাবক পাবে না এবং সাহায্যকারীও না।
যেদিন আগুনে তাদের চেহারা ওলট-পালট হয়ে যাবে, তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসুলের কথা মানতাম! এবং বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের নেতৃবর্গ আমাদের গুরুজনদের আনুগত্য করেছিলাম, তারা আমাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে।
হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদের প্রতি এমন লানত করুন, যা হবে অতি বড় লানত।” (আহযাব: ৬৪-৬৮)
এই বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে।
৬। মুরতাদ ইলমের অধিকারী, বা শ্মশ্রুমণ্ডিত বা অমুক ইসলামি দলের সদস্য বা শরিয়া বিষয়ে এত এত ডিগ্রিধারী বা এ জাতীয় যা কিছু রয়েছে, এগুলোও তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধক নয়, যেমনটা কেউ কেউ মনে করে থাকে।
কেননা স্বীয় যামানার সবচেয়ে বড় আলেম ছিল, এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা বলেছেন,
واتل عليهم نبأ الذي آتيناه آيتنا فانسلخ منها فأتبعه الشيطان فكان من الغاوين
“এবং (হে রাসুল!) তাদেরকে সেই ব্যক্তির ঘটনা পড়ে শোনান, যাকে আমি আমার নিদর্শন দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা সম্পূর্ণ বর্জন করে। ফলে শয়তান তার পিছু নেয়। পরিণামে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়”
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরেক স্থানে তার সৃষ্টির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দল তথা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদের ব্যাপারে বলেন,
ولو أشركوا لحبط عنهم ما كانوا يعملون * أولئك الذين آتيناهم الكتاب والحكم والنبوة
“তারা যদি শিরক করত, তবে তাদের সমস্ত (সৎ) কর্ম নিস্ফল হয়ে যেত। তারা এমন লোক, যাদেরকে আমি কিতাব, হিকমত নবুওয়াত দান করেছিলাম।” (আনআম: ৮৮-৮৯)
কিন্তু এখানে দুটি বিষয়ের মাঝে পার্থক্য করতে হবে: একটি হলো, এমন স্পষ্ট কুফর, যা ধর্ম থেকে বের করে দেয়। উপরে এইমাত্র এটার কথাই আলোচিত হয়েছে।
আরেকটি হলো, যা কুফর নয়, বরং এমন ভুল ইজতিহাদ বা গবেষণা, যার জন্য ইজতিহাদকারীকে ইজতিহাদের সাওয়াব দেওয়া হবে, অথবা ঐ সব ত্রুটি-বিচ্যুতি, যা কখনো কখনো উলামায়ে কেরাম ও তালিবুল ইলমদের হয়ে যায়। এর কারণে তাদের সাথে অশিষ্ট আচরণ করা বা তাদের ব্যাপারে জবানের অসংযত চর্চা করা বা তাদের ইলম থেকে বিমুখতা অবলম্বন করা বা যুবকদের তাদের কিতাবসমূহ থেকে দূরে রাখা উচিত হবে না। বিশেষত যখন তারা আল্লাহর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত ও তার সাহায্যকারী হয় এবং তাগুত ও মুরতাদগোষ্ঠী থেকে সম্পর্ক ছিন্নকারী হয়, তখন তো কিছুতেই না।
৭। নির্দিষ্ট কোনো কুফরি কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে যাদের তাকফির করা হবে, তারা সংখ্যায় অনেক, এটাও তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধক নয়। কেননা আল্লাহর দ্বীন কারও প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা বলেন,
وقال موسى إن تكفروا أنتم ومن في الأرض جميعاً فإن الله لغني حميد
“এবং মূসা বলেছিল, তোমরা এবং পৃথিবীতে বসবাসকারী সকলেই যদি অকৃতজ্ঞতা কর, তবে (আল্লাহর কোনোও ক্ষতি নেই। কেননা) আল্লাহ অতি বেনিয়ায, তিনি আপনিই প্রশংসার উপযুক্ত।” (ইবরাহিম: ৮)
আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা আরো বলেন,
وما أكثر الناس ولو حرصت بمؤمنين
“এতদসত্ত্বে অধিকাংশ লোক ইমান আনার নয়, তা তোমার অন্তর যতই কামনা করুক না কেন।”
(ইউসুফ: ১০৩)
আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা আরো বলেন,
وإن كثيرا من الناس بلقاء ربهم لكافرون
“বহু লোকই এমন, যারা নিজ প্রতিপালকের সাথে মিলিত হওয়াকে অস্বীকার করে।” (রূম: ৮)
৮। কুফরি কথা, ঠাট্টা, বিনোদন খেল-তামাশাচ্ছলে বলাও উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধক নয়। তার দলিল হলো আল্লাহ সুবহানাহুতা’লার বাণী-
ولئن سألتهم ليقولن إنما كنا نخوض ونلعب ، قل أبالله وآياته ورسوله كنتم تستهزءون لا تعتذروا قد كفرتم بعد إيمانكم
“তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো হাসি-তামাশা ফূর্তি করছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ, আল্লাহর আয়াত তার রাসুলকে নিয়ে ফূর্তি করছিলে? অজুহাত দেখিও না। তোমরা ইমান জাহির করার পর কুফরিতে লিপ্ত হয়েছ।” (তাওবা: ৬৫-৬৬)
আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা তাদের এই ওযর গ্রহণ করলেন না। অথচ তারা রাসুল ﷺ এর সাথে সংকটময় যুদ্ধে জিহাদের জন্য বের হয়েছে। আর ঐ সব কুফরি বাণীগুলো তারা ঠাট্টাচ্ছলে ও সফরের পথে সময় কাটানোর জন্য বলেছিল, যেমন, সওয়ারিরা রাস্তা পার করার জন্য পরস্পরে বিভিন্ন কথাবার্তা বলে থাকে, যেমনটি আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।
৯। কাফের আখ্যা দানকারীগণ যাদের কাফের আখ্যা দিয়েছেন, তাদের ওপর কুফরের শাস্তিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, এটাও তাকফিরের কোনো গ্রহণযোগ্য প্রতিবন্ধক নয়। যেমন, তাদের ওপর ধর্ম ত্যাগের শাস্তি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, কাফের শাসককে হটাতে পারবে না ইত্যাদি।
এ ব্যাপারে সত্য এবং সঠিক কথা হলো, যা আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা আমাদেরকে তাঁর প্রজ্ঞাময় কিতাবে আদেশ করেছেন:
فاتقوا الله ما استطعتم
“সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করে চলো।” (তাগাবুন: ১৬)
অনুরূপ আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা শুআইব (আঃ) এর ব্যাপারে বলেন:
إن أريد إلا الإصلاح ما استطعت
“নিজ সাধ্যমত সংস্কার করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই।” (হুদ: ৮৮)
এ হিসাবেই ফুকাহায়ে কেরাম তাদের প্রসিদ্ধ ফিকহি মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন, “কঠিন বিষয়টির কারণে সহজ বিষয়টি রহিত হয়ে যাবে না।” সুতরাং যখন কোনো সময় মুসলমানগণ কাফের শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে এবং তাকে হটাতে না পারবে তখন এর অর্থ এই হবে না যে, তারা তাকে তাকফির করাও ছেড়ে দেবে, বরং এটি একটি শরঈ’ হুকুম, যা তারা করতে সক্ষম।
সুতরাং তাদের এর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে হবে এবং শাসককে তাকফির করার অন্য যেসব ফলাফল রয়েছে, যেগুলো তারা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম সেগুলোর ব্যাপারেও আল্লাহকে ভয় করা উচিত।
অর্থাৎ তার সাহায্য করা, পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং তার কুফরি আইনের কাছে বিচার-ফয়সালা চাইতে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে, তাকে তাদের দ্বীনি বিষয়ের দায়িত্বশীল বানাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো উপায় থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে তাদের ওপর কর্তৃত্বশীল বানাবে না, তার বায়আতে প্রবেশ করবে না, তার পতাকাতলে যুদ্ধ করবে না, তাকে তার বাতিলের ওপর সাহায্য করবে না বা কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করবে না, ইত্যাদি যে যে বিষয়গুলো তারা করতে পারবে তা করবে। এছাড়া শাসকের কুফরি জানতে পারলে তার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে প্রেরণা জোগাবে এবং এর ফলে কোনো একদিন তাকে হটানোর মত যোগ্যতা সৃষ্টি হবে।
১০। কুফরিতে লিপ্ত ব্যক্তি মন্দভাবে প্রতিপালিত হয়েছে, এটাও তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধক নয়। অথচ এমন কতিপয় লোক এটাকে তাকফিরের প্রতিবন্ধক মনে করছে, যাদের অনুসরণ করা হয় এবং যাদের দিকে রীতিমত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করা যায়। তাও এমন লোকদের ব্যাপারে, যারা আল্লাহ, দ্বীন রাসুল ﷺ-কে গালিগালাজ করে।
অথচ অধিকাংশ কাফের মুশরিকরা তো মন্দভাবে প্রতিপালিত ও বেড়ে উঠার কারণেই কুফর ও শিরক করেছে। যেমন, চির সত্যবাদী নবি ﷺ বলেছেন,
“প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাত, তথা ইসলামের ওপর জন্মগ্রহণ করে, তারপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, অগ্নিপূজক বা মুশরিক বানায়।” (হাদিসটি ইমাম মুসলিম ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন)
সুতরাং এটা তাদেরকে কাফের আখ্যাদান করতে বাধা দেবে না।
১১। কোনো প্রকাশ্য স্পষ্ট কুফরিকে কল্যাণ বিবেচনা করে বা সময়োপযোগী মনে করে করা, অথবা ‘দাওয়াতের স্বার্থ’র নাম দিয়ে কুফরি করা, এগুলোও তাদের কাফের সাব্যস্ত হওয়ার জন্য প্রতিবন্ধক নয়। কেননা শিরক বা কুফরিতে কোনো গ্রহণযোগ্য কল্যাণ নেই।
কারণ এটা হচ্ছে আসমান-জমিনের সবচেয়ে বড় গুনাহ, যার দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহুতা’লার অবাধ্যতা করা হয়। এ কারণেই আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা বলেন,
إن الله لا يغفر أن يشرك به ويغفر ما دون ذلك لمن يشاء
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এর নিচের যে-কোনো গুনাহ যার ক্ষেত্রে চান ক্ষমা করে দেন।” (নিসাঃ ১১৬)
বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে:
রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো: কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়?
রাসুল বললেন, তা হচ্ছে এই যে, তুমি আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করলে, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।
(জ্ঞাতব্য: ৩) أسباب التكفير (তাকফিরের কারণসমূহ):
ফিকহি মূলনীতিবিদদের মতে শরিয়তে ‘কারণ’ হলো, এমন একটি বাহ্যিক সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, যার দ্বারা হুকুম সাব্যস্ত হয়, এই হিসাবে যে, শরিয়ত তার সাথে উক্ত হুকুমটিকে সম্পৃক্ত করেছেন। অথবা তার সংজ্ঞাটি এভাবেও বলা যায়, ‘কারণ’ বলা হয়, যার উপস্থিতির কারণে তার ফলাফল বা পরিণতিটির উপস্থিতি এবং তার অনুপস্থিতির দ্বারা পরিণতিটির অনুপস্থিতি অনিবার্য হয়।
যেহেতু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মত হলো, ইমান তিনটি রুকন বা ভিত্তি-বিশিষ্ট: বিশ্বাস, কথা কাজ। কারণে হুবহু এর বিপরীত তিনটি বিষয় হবে তাকফিরের কারণ। অর্থাৎ কুফরি কথা, অথবা কুফরি কাজ (এর মাঝে সব জিনিস পরিত্যাগ করাও অন্তর্ভুক্ত, যা পরিত্যাগ করা কুফর) অথবা সন্দেহ বা কুফরি বিশ্বাস।
সাধারণত: এগুলোই কুফরির কারণ।
তবে তাকফিরের সেই সব কারণ, যা দুনিয়াবি বিধানাবলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে সেগুলো কেবল কুফরি কথা বা কুফরি কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শরিয়ত দুনিয়াতে কাফের সাব্যস্ত করার কারণগুলোকে শুধু এর মাঝেই সীমাবদ্ধ করেছে। কারণ অবিশ্বাস ও সন্দেহ হলো, অপ্রকাশ্য কারণ, যা দুনিয়াবি বিধানগুলোতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে শরিয়ত তার সাথে কোনো দুনিয়াবি বিধানের সম্পর্ক রাখেনি এবং দুনিয়াতে তাকে তাকফিরের কারণও গণ্য করেনি। এটাকে সেই সত্ত্বার কাছে কারণ হিসাবে গণ্য করেছে, যিনি অন্তরের রহস্য ও গোপন বিষয়গুলো জানেন। এ কারণে এটা হচ্ছে কাফের সাব্যস্ত করার পরকালীন কারণ। তার সাথে দুনিয়াবি বিধি-বিধানের কোনো সম্পর্ক নেই।
এ কারণে যে কুফর গোপন রাখে, প্রকাশ করে না; বরং ইসলামের নিদর্শনগুলোই প্রকাশ করে তাকে বলা হয় মুনাফিক। দুনিয়াতে তার সাথে মুসলমানদের অনুরূপ আচরণ করা হবে। আর সে যে কুফরি বিষয়গুলোকে গোপন রাখত এর হিসাব আল্লাহ পরকালে নেবেন। ফলে তার পরিণাম হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তর। এ কারণে যখন মুকাল্লাফ (বিধানাবলির আওতাধীন ব্যক্তি) কুফরের প্রকাশ্য কারণসমূহের কোনোটিতে লিপ্ত হয়, তথা কুফরি কথা বলে বা কুফরি কাজ করে, আর তাকফিরের শর্তগুলো পাওয়া যায় এবং কোনো প্রতিবন্ধকও না থাকে, তখন তাকে তাকফির করা হবে, যদিও সে এ কথা বলে যে, সে এর দ্বারা কুফরি করা বা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করেনি। কেননা কেউই এর ইচ্ছা করে না, একমাত্র আল্লাহ যা ব্যতিক্রম চান। এমনকি খৃষ্টানদেরকেও যদি জিজ্ঞাস করা হয়, তোমরা কি ‘ঈসা আল্লাহর পুত্র’ এ কথার দ্বারা কুফরি করার ইচ্ছা করো? তারা না করবে এবং তা অস্বীকার করবে।
তাকফিরের কারণগুলোর ব্যাপারে একটি জ্ঞাতব্য:
মনে রাখবেন, যখনই কোনো মুকাল্লাফ কুফরের প্রকাশ্য কারণসমূহের কোনোটিতে লিপ্ত হয় আর তার ক্ষেত্রে তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধকও না থাকে, তখনই তাকে কাফের আখ্যা দেওয়া যাবে। তাকফিরের জন্য একাধিক কারণ জমা হওয়া শর্ত নয়; বরং একাধিক কারণ কুফরিকে আরো কঠিন ও বৃদ্ধি করবে। অতএব ইমানের মতো কুফরেরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here