নিকটবর্তী শত্রু
আমিরুল কায়েদা ফিল জাজিরাতুল আরব শায়খ কাশিম আর রিমি হাফিজাহুল্লাহ

আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লাহ বলছেন:

وَإِن نَّكَثُواْ أَيْمَانَهُم مِّن بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُواْ فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُواْ أَئِمَّةَ الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لاَ أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنتَهُونَ
আর যদি ভঙ্গ করে তারা তাদের শপথ প্রতিশ্রুতির পর এবং বিদ্রুপ করে তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে, তবে কুফর প্রধানদের সাথে যুদ্ধ কর। কারণ, এদের কেন শপথ নেই যাতে তারা ফিরে আসে। [ সুরা তাওবা ৯:১২ ]


আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লাহ আরো বলছেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ قَاتِلُواْ الَّذِينَ يَلُونَكُم مِّنَ الْكُفَّارِ وَلِيَجِدُواْ فِيكُمْ غِلْظَةً وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন। [ সুরা তাওবা ৯:১২৩ ]

বর্তমানে আয়িম্মাতুল কুফর (কুফরের নেতৃবর্গ) কারা, যাদের ব্যাপারে বর্তমানে সকলে ঐক্যমত্য? কে সেই প্রধান, যে সকল মানুষের কলকাঠি নাড়ছে? যে টিকে থাকলে তার দাওয়াত টিকে থাকবে এবং ধ্বংস হয়ে গেলে তার দাওয়াতও ধ্বংস হয়ে যাবে? সে হল আমেরিকা। কেউ এ ব্যাপারে সন্দেহ করবে না।

তাই আপনারা যখন বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি বুলাবেন, যে কে সকল মানুষকে জড়ো করছে, ঐক্যবদ্ধ করছে, তখন দেখবেন, সে আমেরিকা ছাড়া কেউ নয়। এটা একটি বাস্তব বিষয়। তাদের মন এটাকে বদ্ধমূল করে নিয়েছে। এটা বড় মনে করা বা সম্মান করা নয়; বরং এটি একটি বাস্তবতা।

যেমন আমাদের নিকট কুরাইশও আছে, আমাদের নিকট গাতফানও আছে, তো আমরা কুরাইশ সম্পর্কে কথা বলছি।

তাহলে আয়িম্মাতুল কুফর কারা? এখন যদি আমি এই অঞ্চল সম্পর্কে কথা বলতে চাই, তাহলে আয়িম্মাতুল কুফরকে এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ করে ফেলবো। কিন্তু যখন যুদ্ধ সম্পর্কে কথা বলবো, আর বর্তমানে তো পূরো পৃথিবীর যুদ্ধকে একটি যুদ্ধ হিসাবে গণ্য করা হয়, তখন দূরবর্তীরাও নিকটবর্তী হয়ে যাবে। এখন যদি আমি এসে হাযরা মাউতের একটি কোণাকে নির্বাচন করি এবং আমার সকল কর্ম ও সকল জিহাদকে এই অঞ্চলের উপরই নির্ভরশীল করি, তাহলে এটা ভুল হবে। কোথায় উম্মাহর দেহ, ‘যার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে তার জন্য সমস্ত দেহে জ্বর ও অনিদ্রার মাধ্যমে সাড়া পড়ে যাবে?

আমরা এক জাতি। যে ওখানে আছে, সেই হুবহু এখানেও আছে। যখন আমি আমার নিজের প্রতি দেখবো, তখন আমি ভূ-সীমায় বিশ্বাস করবো। তখন আমি নিজেকে উম্মাহ থেকে পৃথক করে ফেললাম, নিজেকে যুদ্ধ থেকে পৃথক করে ফেললাম।

বর্তমানে আহলুস সুন্নাহর অবস্থা: উদাহরণ স্বরূপ, বর্তমানে ইয়ামানে আমাদের নিকট হুথিরা দুর্বল। কিন্তু তাদের নেতৃত্ব একক। ফলে তারা সকল স্থানে লড়াই পরিচালনা করতে পারছে। আহলুস-সুন্নাহ অনেক, তাদের সামনে সম্ভাবনা অনেক, কিন্তু তাদের পরিচালনাকারী একক নেতৃত্ব নেই। ফলে এক পক্ষ দলীয় শক্তিতে কাজ করে, আর অপর পক্ষ শুধু নিজ শক্তিতে কাজ করে। অর্থাৎ শুধু যেই গোত্রটি লড়াই করছে, তারাই।
তাই যদি হুথিরা তাদের সীমানা থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে! অমুক অঞ্চল থেকে বের হয়ে গেল, তো যুদ্ধ শেষ! এটা ভুল।

কিন্তু যখন যুদ্ধ একটি হবে, যখন আমরা উম্মাহর দৃষ্টিতে দেখবো যে, কে প্রকৃত শত্রু?

উম্মাহর দৃষ্টিতে; ইয়ামান, ইরাক, আফগানিস্তান বা সোমালিয়ার দৃষ্টিতে নয়।

বরং উম্মাহর দৃষ্টিতে: কারা প্রকৃত শত্রু? তারা হল আমেরিকানরা।

শরয়ীভাবে কি আমাদের জ্ন্য শুধু নিজের দৃষ্টিতে দেখা বৈধ হবে, নাকি উম্মাহর দৃষ্টিতে দেখতে হবে? এটা কি শুধু রাজনীতি? না বরং বিষয়টি হল শরয়ী মূলনীতির।

আমার জন্য শুধু নিজের দৃষ্টিতে দেখা জায়েয নেই, বরং উম্মাহর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। আমি উম্মাহর হককে নিজের হকের উপর প্রাধান্য দিব। যখন আমি নিজের হককে উম্মাহর হকের উপর প্রাধান্য দিব, তখন আমি জালিম। আমি শরয়ী গুনাহের মধ্যে লিপ্ত হলাম।

তাই আমরা এখন মুসলিমদের রক্ত নিয়ে কথা বলবো, যা শ্রেষ্ঠ যুবকগণ ময়দানে পেশ করেছে। যারা ময়দানে যুদ্ধ করছে। তাই আসুন, আমরা কথা বলার সময় উম্মাহর দৃষ্টিতে দেখি, একটি পরিপূর্ণ যুদ্ধের দৃষ্টিতে দেখি। প্রান্তিকতাপূর্ণ দৃষ্টিতে না দেখি। এমনটা করলে আপনি উম্মাহর ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন।

আমরা একমত হলাম যে, প্রথম শত্রু হল আয়িম্মাতুল কুফর (কুফরের নেতৃবর্গ) আমেরিকানরা। তারপর ধারাবাহিকভাবে…একের পরে এক ছোট থেকে ছোট… আপনার সূত্র যে পর্যন্ত পৌঁছে।
এই হল আয়িম্মাতুল কুফর। এবার আমরা আসি, আমাদের নিকটবর্তী কুফ্ফার কারা?

উদাহরণ স্বরূপ বর্তমানে আমরা ইয়ামানে আছি, আমাদের যুদ্ধ বা যে আমাদের উপর হামলা পরিচালনা করছে, সে হল আব্দে রাব্বিহ। আচ্ছা আব্দে রাব্বি কি আমাদের কোন ক্ষতি করেছে? না আমরা তার কোন ক্ষতি করেছি? এক্ষেত্রে কোন তুলনা নেই। ছোটও মারে, বড়ও মারে, প্রত্যেকেই মারে। সে হল দুর্বল, শক্তিহীন। কিন্তু আমাদের উপর আঘাত করছে কারা? আমেরিকানরা। এটাই হল বাস্তবতা।

কে কার্যগতভাবেই আমাদের নিকটবর্তী, পুস্তকে বা কথায় নয়, সে কি আব্দে রাব্বি? আব্দে রাব্বিহ আছে রিয়াদে। কিন্তু আমেরিকান ও আমাদের মাঝে মোটামোটি ৪০ মাইল, অর্থাৎ ৬০ কিলো সামুদিক পথের দূরত্ব। আর আকাশ পথে তাদের মাঝে ও আমাদের মাঝে দূরত্ব মাত্র তিন কিলো বা ৪ কিলো। তাহলে আমাদের নিকটবর্তী শত্রু কে?

আয়িম্মাতুল কুফর আমেরিকানরাই। এখানে আমাদের নিকটবর্তী শত্রু হল আমেরিকানরা।

আমি বলেছি যে, আমরা যখন বাস্তব অবস্থার দিকে আসবো, আর আমি কোন মনস্তাত্তিক বিষয় নিয়ে কথা বলছি না; বরং বাস্তবঘটিত বিষয় নিয়ে কথা বলছি। কাফেরদের মধ্যে কে আমাদের নিকটবর্তী, এমনকি আব্দে রাব্বিহির উপস্থিতির সময়েও, এমনকি মুরতাদ সরকার তার শক্তিসহ উপস্থিত থাকার সময়েও, কে তখন আমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে এবং আমদের উপর আক্রমণ করতে পারবে? এই দালাল সর্বোচ্চ যা করতে পারবে তাতে হয়ত একটি কাঠের টুকরা জলবে। সর্বশেষ যা করতে পারবে তা হচ্ছে আপনি যে ঘরে আছেন, তা দেখিয়ে দিবে, যাতে তারা বোমা বর্ষণ করতে পারে। তারা এতটুকুই করতে পারবে। কিন্তু তারা নিজেরা আমাদের থেকে পালায়ন করবে।

এটি একটি বাস্তবঘাটিত বিষয়। এবার আমরা আরেকটি বাস্তব বিষয়ের আলোচনায় আসি: আব্দে রাব্বিহির টিকে থাকা কি তার ইচ্ছা মত? আমেরিকা ই তো তাকে ছুড়ে ফেলেছে। এজন্যই এখন দেখবেন, বিভিন্ন ভাষণে সে বলে: আমেরিকা আমাদের সাথে আছে, তারা আমাদের সমর্থন করেছে।

এটা কি কল্পনা করা যায় যে, সে আমেরিকার সন্তুষ্টি ছাড়া টিকে থাকতে পারবে? এটা অসম্ভব। তাহলে সর্বশেষে বোঝা গেল, এরা হল তাদের হাতিয়ার মাত্র।

তাহলে এখন আমি যখন যুদ্ধ করবো, তখন কি মাথার সঙ্গে যুদ্ধ করবো, নাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। যখন আমি ও আমার একজন শত্রু যুদ্ধ করবো, তখন আমি তাকে কোথায় আঘাত করে হত্যা করবো? আমি কি তাকে হত্যার সম্ভাব্য স্থানে আঘাত করবো, নাকি তার পায়ে আঘাত করবো? আপনি যদি তাকে বন্দী করতে চান, তবে হাতের উপযু্ক্ত স্থানে আঘাত করবেন। আর যদি তাকে খতম করে দিতে চান, তাহলে ঘাড়ের উপযুক্ত স্থানে, তথা মৃত্যুর স্থানে আঘাত করবেন।

ধরুন এখন আমার নিকট একজন শত্রু আছে। তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্য থেকে কোথায় আমি তাকে আঘাত করবো? নিশ্চয়ই আমি তাকে মৃত্যুর উপযুক্ত স্থানে আঘাত করবো।
তাহলে কে প্রকৃতপক্ষেই আমাদের নিকটবর্তী? আব্দে রাব্বিহি বা অন্যান্যরা নয়; তারা তো হাতিয়ার মাত্র। আমরা যখন মুরতাদদের দিকে তাকাবো, যারা আপনাকে শাসন করছে, দেখতে পাবো, তাদের সকল আইন-কানুন, সকল প্রশাসন ও রাজনীতি কেন্দ্রীয় মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ নিরাপত্তাবলয় একটি।

সেখানে একটি নিরাপত্তা কক্ষ রয়েছে। অত:পর সেখান থেকে তা সকল আরব দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে। আপনার জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কেন্দ্রের অনুগামী। তাই প্রতিটি জিনিস তাদের দিকে প্রত্যাবর্তনশীল। প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর ভিত্তিও বড় বড় জাতিগুলো তথা জাতিসঙ্ঘের সাথে। সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি সহ সব কিছুর গোড়া একটি।
প্রমাণিত হল: আয়িম্মাতুল কুফর (কুফরের নেতৃবর্গ) ও আমাদের নিকটবর্তী শত্রু একই।

আচ্ছা এবার আসুন আমরা দ্বিতীয় রূপটির দিকে তাকাই। এটাকে ভিন্ন দিক থেকে আহরণ করি। তা হল আঘাত করা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কেউ আপনাকে বলল: আমরা যে যুদ্ধ করছি, এর দ্বারা কি আঘাত করে দুর্বল করা হচ্ছে, নাকি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে?

আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা বলছেন:

{وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ} [الأنفال: 39]

অর্থাৎ সর্বশেষে আমাদের যুদ্ধ হল, যেন দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়, যেন আমরা শরয়ী শাসন দ্বারা শাসিত হতে পারি। তারপর আসবে, কর্তৃত্ব। আঘাত করার মাধ্যমে দুর্বল করার মধ্য দিয়েই সর্বশেষে এ স্তরে পৌঁছা যাবে।

তাই এটা অযৌক্তিক যে, একজন এসেই বলবে, আমি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ করবো। হাস্যকর কথা! কর্তৃত্বের যুদ্ধের সময় আসে ধাপে ধাপে। অনেকগুলো অভিযানের পরে। প্রতিদিন আপনার শত্রুকে আঘাত করতে করতে এ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন। তাই রাতারাতি বা দিনাদিন এ পর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব নয়।

এমনকি নবী সা: যখন মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, তখন কি প্রথমেই তিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ করেছেন, সাহাবিদেরকে নিয়ে মক্কা দখল করতে গিয়েছেন। এটা অসম্ভব, বরং তিনি ৮ বছর পরে গিয়েছেন। প্রথম প্রথম শত্রুকে তার দুর্বল স্থানে আঘাত করেছেন।

শত্রুর দুর্বল স্থান অনুসন্ধান করে তাতে আঘাত করুন। তার শক্তিশালী স্থান খোজে তাতে আঘাত করতে যাবেন না। এটা ভুল। শত্রু সবচেয়ে দুর্বল হয় সে চলন্ত অবস্থায়। একারণেই রাসূলুল্লাহ সা: তাদেরকে তাদের পথের মধ্যে, তাদের যাওয়ার পথে বা আসার পথে টার্গেট করেছেন।

নবী সা: বলেন:

“তোমরা নিক্ষেপ করো, আরোহন করো। আর তোমাদের নিক্ষেপ করাই আমার নিকট আরোহন করা অপেক্ষা উত্তম”।

তাই যদি আপনি শত্রুর ক্ষতি করলেন, কিন্তু সে আপনার ক্ষতি করতে পারল না, তবে এটাই উত্তম। বরং এটাই আপনার উপর ওয়াজিব, বিশেষ করে যখন আপনি জানবেন যে, সম্মুখ লড়াই আপনার সাথীদের জন্য অনেক বিপদজনক।

রাসূল সা: বলেছেন: “নিক্ষেপ করো এবং আরোহন করো।”

ঘোড়ায় আরোহন করে তরবারী এবং বর্শার মাধ্যমে যুদ্ধ করা হয়। কিন্তু যদি দূর থেকে নিক্ষেপ করো, তাহলে শত্রুর ক্ষতিসাধন করতে পারবে।

এজন্যই নবী সা: আল্লাহর এই বাণীর তাফসীরে বলেন- {وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ} [الأنفال: 60]

জেনে রেখ, কুওয়াহ (শক্তি) হচ্ছে নিক্ষেপ করা! জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা! জেনে রেখ, কুওয়াহ শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা।

মানুষ সাধারণ অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করে, সেটা হচ্ছে তরবারী। যা সকলের জন্য একক অস্ত্র। আপনি অনেক মানুষকে দেখবেন, তরবারী ভাল পরিচালনা করতে পারে, কিন্ত তীর চালাতে পারে না। আবার যাকে দেখবেন, তীর ভাল চালাতে পারে, তার হাতেও অবশ্যই তরবারী থাকতে হয়, যাতে সেটা দিয়েও যুদ্ধ করতে পারে। পরিশেষে এটা সকলের অস্ত্র।

যেমন ধরুন আমাদের নিকট এক ভাই, তার নিকট একটি আর পি জি আছে। কিন্তু সবশেষে তার নিকট ক্লাশিনও আছে, যার মাধ্যমে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করবে। নবী সা: আপনাকে বলছেন: জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা, এটা এর গুরুত্বের কারণে।

নবী সা: সহীহ হাদিসে আরো বলেন: যুদ্ধ হল ধোঁকা। অর্থাৎ যুদ্ধের মূল ভিত্তি হচ্ছে ধোঁকা।

মুহাদ্দিসগণ বলেন: এখানে নবী সা: স্পষ্ট করছেন যে, সরাসরি ও মুখোমুখী যুদ্ধ করার চেয়ে ধোঁকার মাধ্যমে যুদ্ধ করাই উত্তম। কারণ সরাসরি যুদ্ধে যেমন আমি শত্রুর ক্ষতি করে, তেমনি শত্রুও আমার ক্ষতি করে।

কিন্তু আমরা যদি এ আলোচনার মধ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ ও দুর্বল করার যুদ্ধের আলোচনায় ফিরে আসি, তবে আমরা বলবো, এখন আমাদের সামনে আছে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, সোমালিয়া, মাগরিব, ইয়ামান, চেচনিয়া, পাকিস্তান, সুদান…অনেকগুলো অঞ্চলই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল, এমন একটি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল, যা ইসলামী শরীয়া দ্বারা শাসন করত। কিন্তু তারপর ফলাফল কি হয়েছিল? আমাদেরকে অবশ্যই এর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।

ফলাফল হল, আফগানিস্তানে আমেরিকা আসল। কয়েক দশক রাষ্ট্রকে একত্রিত করল। তারপর সকলে মিলে এই একটি দেশের উপর আক্রমণ করল। তারপর সকলে মিলে ইরাকে আক্রমণ করল, তারপর সিরিয়ায়, তারপর ইয়ামানে, তারপর সোমালিয়ায়, তারপর কতদিন পর্যন্ত এটা চলবে?!

আমরা যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলার এই স্পষ্ট আয়াতের দিকে ফিরবো- {وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ}

আমাদের সামনে আছে ফিৎনা, তথা কুফর ও শিরক।

{حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ}

তাই এই যুদ্ধের শেষ সীমা হল ফেৎনা শেষ হয়ে যাওয়া এবং দ্বীন পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যাওয়া। যখন ফেৎনা শেষ হয়ে যাবে, তখনই দ্বীন কায়েম হয়ে যাবে। “لا إله إلا الله” “কোন উপাস্য নেই আল্লাহ ছাড়া”। আগে খালি করা বা পরিস্কার করা, তারপর সুসজ্জিত করা।

আমি এখানে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলাম, তারপর তারা সমবেতভাবে সেখানে এসে আঘাত করল। তারপর আমি আরেক জায়গায় প্রতিষ্ঠা করলাম, তারা তাদের সকল শক্তি একত্রিত করে আমদেরকে এক এক করে ও জামাতবদ্ধভাবে আক্রমণ করল।

আমরা কেন আমাদেরকে যেটার আদেশ করা হয়েছে, সেটার প্রতি লক্ষ্য রাখবো না। এক দেহ। আমরা প্রত্যেকেই আয়িম্মাতুল কুফরের প্রতি মনোনিবেশ করবো, যারা আমদের নিকটবর্তী তাদের প্রতি মনোনিবেশ করবো। আমরা সকলে তাকে আঘাত করবো। তারা সবাই শেষ হয়ে যাবে, তখন আমরা প্রত্যেকে দাঁড়াবো। যারা ইরাকে আছে, তারা দাঁড়াবে, যারা আফগানিস্তানে আছে, তারা দাঁড়াবে, যারা সিরিয়ায় আছে তারা দাঁড়াবে, যারা ইয়মেনে আছে তারা দাঁড়াবে, মাগরিব, সোমালিয়ায় যারা আছে, সকেলে দাঁড়াবে। তাই শিরকের সমাপ্তিই অনিবার্যরূপে ইসলামের প্রতিষ্ঠা।

{وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ}

আমরা চাই না, শত্রুরা আমাদেকে ধোঁকা দেক, তারা তাদের পদ্ধতিতে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুক, আমাদেরকে ময়দানে বের করে আনুক। শত্রুরা তো সম্মুখ যুদ্ধে পারদর্শী। কেন? কারণ তাদের অনেক উপকরণ রয়েছে।
নবী সা: বলছেন: জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা। তো তাদের নিকটও নিক্ষেপ শক্তি রয়েছে। এখানে আমাদেরকে উদ্ধুদ্ধু ও সতর্ক করা হয়েছে।

আমাদেকে আদেশ করা হয়েছে নিক্ষেপের প্রতি গুরুত্ত দেওয়ার জন্য। তো তাদের নিকট এমন উপকরণ রয়েছে, যা আমদের নিকট নেই। আর আমরা এর উপর ভরসা করি না। কিন্তু আমাদের নিকট রয়েছে দু’টি বিষয়, আমরা তা গ্রহণ করবো। তা পরিত্যাগ করা গুনাহ। এগুলো হল উপকরণ। আর এর উপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া শিরক। তাই আমরা এর উপর নির্ভরশীলও হয়ে পড়বো না, আবার তা একেবারে পরিত্যাগও করবো না।

এখন শত্রু এই পদ্ধতিটি ভাল পারে, সম্মুখযুদ্ধের পদ্ধতিটি। আর আমরা ধোঁকা বা কৌশলের পদ্ধতিটি ভাল পারি। সুতরাং আমরা তাদেরকে আমাদের গণ্ডির ভিতর নিয়ে আসবো এবং আমাদের পদ্ধতিতে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। এমনটা নয় যে, তারা আমাদেকে টেনে আনবে। আমাদেরকে টোপ দিবে, প্রতিদিন টোপ দিতে থাকবে যে, তোমরা উম্মাহর যুবক ও বাহাদুরদেরকে বের কর। অত:পর যখনই ফল পেকে যেতে দেখবে, তখন তোমার জন্য একটি রূপরেখা আবিস্কার করবে। তোমাকে টোপ দিবে।

যখনই আমরা শত্রুর সাথে পরিপূর্ণ উদ্যমতার সাথে যুদ্ধ করি, তারপরই আমরা এমন একটি পর্যায়ে উপনীত হই, যখন পথ থেকে সরে পড়ি। আমাদের ভেতরেই থাকে বিভিন্ন গোপন শত্রু, আবার বাহির থেকেও শত্রু এসে আমাদের সাথে যুক্ত হয়… তাহলে এটা সরে পড়া নয়; বরং টোপের মুখে পড়া। আমাদের উপর আবশ্যক হল আমরাই তাদেরকে টোপে ফেলবো। আমরা তাদেকে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে দিব না।

দেখুন, শত্রুরা কিছু ব্যক্তির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা চাচ্ছে যেকোন উপায়ে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন করে দিতে। আপনাকে সম্মুখযুদ্ধে আনতে চাচ্ছে।

আমি যখন আজকে একটি অঞ্চলে এসে বলবো: আমি এখনই শরীয়া চাই, তখন আমি তো বলবো, দিব্যদৃষ্টিতে, কিন্তু আপনি এমন বিষয় ঘটালেন, যা অপরিপূর্ণ, এটা কি আপনার জন্য জায়েয হবে?
এখনও যুহর নামাযের সময় আসেনি, কিন্তু আমি নামায পড়ে আনন্দিত। অসময়ে নামায আদায় করে ফেললাম। তাহলে তো আমার নামাযই ছহীহ হবে না।

যখন আলেমগণ দারুল হরবে হুদুদ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন, এখন যদি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, তাহলে তো ওই সবগুলোই দারুল হরবে বাস্তবায়িত হবে। কত হাস্যকর! কারণ তার শর্ত পূরা হয়নি।

শাসক প্রস্তুত কর, প্রতিরক্ষা প্রস্তুত কর। এম নয় যে, কাযী সাহেব বিচার করছেন, আর পরের দিনই তাকে যমীনের উপর হত্যা করা হল। এই শাসকের কি নিরাপত্তা? শরীয়তের প্রভাব যমীনের মধ্যে শক্তিশালী হতে হবে। অন্যথায় তা দাবিই করবো না।

মহান আল্লাহ বলেন: {وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا} “নামসমূহ” শব্দটি একটি বড় জিনিস।

কারণ এর উপর একটি হুকুম নির্ভর করে। তাই আমি এটাকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করবো না। আপনি বললেন: আমি খলিফা, আমি আমির। প্রত্যেকেই নিজের একটা মত প্রকাশ করে।

তাই যখন অবস্থা সুদৃঢ় হবে, তখন আমরা বুঝতে পারবো, তখন আপনি এগুলো তার যথাযথ হকসহ গ্রহণ করবেন।

এই বিষয়টি বুঝতে পারলে প্রমাণিত হবে যে, এখানে একটি অঞ্চল, যাতে কিছু যুবক আছে, এখানে একটি অঞ্চল, এখানে একটি অঞ্চল, যখন আমারা তাতে নিজেদেরকে চাপিয়ে দিলাম, বললাম যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে, তখন এর ফলাফল কি হবে? এর ভিত্তিতে অনেক হুকুম আবর্তিত হবে। এখন আমরা সকল দলকে খতম করে দিলাম, তাহলে এর দ্বারা কারা উপকৃত হবে? অবশ্যই ঐ শত্রুরা, যাদের ব্যাপারে সকলে ঐক্যমত্য।
এটি শুধু একটি নাম নয়। অর্থাৎ সহজ মনে করে যে কেউ তা ব্যবহার করবে, এমন নয়। বরং নামের উপর অনেক হুকুম আবর্তিত হয়। একারণেই নামের ভিত্তিতে সওয়াব বা গুনাহের অন্তর্ভূক্ত হয়। তাই নাম দিয়ে দেওয়া এত সহজ নয়।

এখন আপনি সকল মানুষকে অচল করে দিলেন। এখন আমি আপনাকে বললাম: সে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, সে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

দ্বিতীয় বিষয় হল, এখন আমরা প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে আছি। শত্রুদেরকে প্রতিহত করতে হবে। এটাই আমাদের মাঝে ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাঝে বাধা হয়ে আছে। যখনই কোন স্থানে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেই শত্রুরা এসে তা ধ্বংস করে দিয়েছে। এজন্য এখন আমাকে এই প্রতিবন্ধক দূর করতে হবে। আমি আমার তরবারী তাক করবো এই প্রতিবন্ধকের বিরুদ্ধে। যদি প্রতিটি দল বছরে একটি করে অভিযান করে, তাহলেই থেমে যাবে।

তাহলে বোঝা গেল, আমার দাবি করা এবং ফল আহরণ করতে চাওয়া মানে হল ফল নষ্ট করা। আমি কিছু হুদুদ কায়েম করলাম কয়েক মাস, কয়েক বছর তারপর? এটাই কি আমাদেরকে থেকে কাম্য? না, বরং আমি শত্রুকে প্রতিহত করবো, সেই তো আমাকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে বাাঁধা দিচ্ছে।

এমনটা বলবেন না যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করবো। আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করবেন এভাবে যে, আপনি সেই বাঁধা প্রতিহত করবেন, যা শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করতে বাঁধা দিচ্ছে। তাই আপনার উপর আবশ্যক হল, আপনি তাকে ধ্বংস করবেন; এমন নয় যে, তার নিকট আত্মসমর্পণ করে, অত:পর একটি কোণা বেছে নিয়ে তাতে শরয়ী হুকুম বাস্তবায়ন করবেন।

আগ্রাসী শত্রুকে প্র্রতিহত করা কি শরয়ী হুকুমের অংশ নয়? ঈমানের পর তার থেকে বড় ওয়াজিব কিছুই নেই যেমনটা শায়খুল ইসলাম বলেছেন। প্রত্যক্ষ কাজ হল, আগ্রাসী শত্রুকে প্রতিহত করা। কিন্তু আপনি দারুল হরবে হুদুদ কায়েম করতে আসলেন! যাইহোক, তখন আমি আপনাকে বলবো: আপনি তো কথার মাধ্যমে এটা অবলম্বন করলেন, কিন্তু শত্রু তো এখানেই?! তাহলে আপনি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে বাদ দিয়ে সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিপ্ত হলেন।

অর্থাৎ এটা একটি ওয়াজিব। আর ওয়াজিব থেকে ভিন্ন কাজে ব্যস্ত হওয়া মানে তাকে অবহেলা করা। আপনি এই ওয়াজিবটি ছেড়ে দিলেন। আপনি যতই আমল করেন, কিন্তু আপনি একটি ওয়াজিবে অবহেলা করলেন।
সবশেষে আমরা ফিরে যাই শত্রুর মাসআলায়। শত্রু দুই ধরণের, একটি হল: ভিরতগত শত্রু, আরেকটি হল বর্হিশত্রু। একটি হল, নিকটবর্তী শত্রু, আরেকটি হল দূরবর্তী শত্রু। গুরুত্বপূর্ণ কোনটা? গুরুত্বপূর্ণ সেটাই, যেটা তোমাদের উপর আঘাত করছে। তারা হল আয়িম্মাতুল কুফর, তারা আমাদের নিকটবর্তীও। আর এই শত্রুই আমাদের মাঝে ও আমাদের শরীয়ার মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ: আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার আলোচনায় একটি সুন্দর উপমা পেশ করতে গিয়ে বলেন:

তুমি এখন পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছতে চাচ্ছো। তুমি পায়ে হেটে পাহাড়ের দিকে যাচ্ছো। সামনে অনেক সাপ বিচ্চু দেখতে পেলে। তুমি যদি সেগুলোকে হত্যা করার কাজে লিপ্ত হয়ে যাও তাহলে তোমার সময় শেষ হয়ে যাবে, তুমি তোমার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। অথচ আপনি ইবাদতেও লিপ্ত। আপনাকে সাপ বিচ্ছু মারতে আদেশও করা হয়েছে, কিন্তু আপনার নিকট এর থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে। তা হল গন্তব্যে পৌঁছা। তাই আপনি যখন এ কাজে লিপ্ত হবেন, তখন আপনার সময় চলে যাবে, আপনি উদ্দেশ্য হারাবেন। কিন্তু একটি সাপ আপনার পথের মধ্যে, সরাসরি আপনার সামনে থেমেছে, আপনি এটাকে মেরে ফেলুন। কারণ এটা আপনাকে বাঁধা দিয়েছে। কিন্তু যদি আপনি সব মানুষকে আপনার প্রতিপক্ষ বানান, আর শত্রুর অনুসন্ধানই করতে থাকনে, তাহলে কখন আপনার গন্তব্যে পৌঁছবেন?

সারকথা হল: আমেরিকানরা আমাদের জন্য অনেক শত্রু সৃষ্টি করছে, যাতে আমদেরকে তাদের থেকে অমনোযোগী রাখতে পারে এবং লড়াই আমাদের দেশে স্থানান্তর করতে পারে, ফলে তাদের দেশে লড়াইয়ের বিষয়টি আড়ালে থেকে যায়।

তাই আমাদেকে এই বিষয়টিতে সচেতনে হতে হবে।

আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। দরূদ, সালাম ও বরকত বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সা: ও তার পরিবারবর্গের উপর।

শায়খের বয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন – মুফতি আবু তালহা (দা বা)