Templates by BIGtheme NET
BREAKING NEWS
Home / বই ও রিসালাহ / ইলম ও আত্মশুদ্ধি / মৃত্যু একটি বাস্তবতা – শহীদ আহমাদ ফারুক রহিমাহুল্লাহ

মৃত্যু একটি বাস্তবতা – শহীদ আহমাদ ফারুক রহিমাহুল্লাহ

বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম


كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۖ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ ۗ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ . لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا ۚ وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ.

এগুলো সুরা আলে ইমরানের কিছু আয়াত (১৮৫,১৮৬), যা আমি আপনাদের সামনে পড়েছি।

আসলে… কুরআন তো সম্পূর্ণটাই মুজিযা। হযরত ইদ্রিস কান্ধলভী রহ. বলেছেন,পূর্বের যত কিতাব ছিল, সেগুলো এক দিক থেকে মুজিযা ছিল। নিজেদের ব্যাখ্যা বা অর্থের দিক থেকে মুজিযা ছিল। মানে সেখানে সেখানে যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছিল, গায়বের যে খবর দেয়া হচ্ছিল, এমন এক জগতের অবস্থা জানানো হচ্ছিল যা আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি থেকে, আমাদের অনুভূতির উর্ধে। তো এই শিক্ষাগুলো স্বয়ং নিজেরাই মুজিযা ছিল। আর দুনিয়ার ঐ সমস্ত বিষয়, মানে মানুষের সাফল্য কোন জিনিসে আছে, মানুষের দুনিয়া এবং আখিরাতের কামিয়াবী কোন জিনিসের মধ্যে আছে, আমরা কে, কোত্থেকে এসেছি, সৃষ্টিকর্তা কে, কেন এখানে পাঠিয়েছেন… এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পূর্বের আসমানী কিতাবগুলো দিয়েছিল। তো নিজেদের শিক্ষার দিক থেকে এগুলো মুজিযা ছিল।

কিন্তু কুরআন দুই দিক থেকে মুজিযা। কুরআন নিজের শিক্ষার দিক থেকে, নিজের অর্থের দিক থেকে মুজিযা এবং নিজের ভাষার দিক থেকে, নিজের কথার দিক থেকে মুজিযা। মানে এর মধ্যে যে আরবী ভাষা ব্যবহার হয়েছে, এর মত আরবী… এর মত প্রাঞ্জল আরবী… সেরা থেকে সেরা কবি এবং লেখকরাও (তাদের রচনায়) নিয়ে আসতে পারে নি। বরং একটি বাক্যও না। এমনকি ১৪০০ বছর পাড় হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও না… কুরআনে চ্যালেঞ্জ জানানো সত্ত্বেও না।তো… কুরআন সম্পূর্নটাই মুজিযা কিন্তু কুরআনের কিছু আয়াত এমন আছে যা অন্তরের খুব গভীরে প্রবেশ করে… আর একেকটা আয়াতে এত বড় সমুদ্র লুকিয়ে থাকে যে বান্দা অর্থের মধ্যে যত মনোনিবেশ করতে থাকে, একের পর এক রহস্য উন্মোচন হতে থাকে।

যেই আয়াত আপনাদের সামনে আমি পড়লাম, এই আয়াতেও একই রকম ই’জায (যা মানুষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়) আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন… (দেখুন) এক আয়াতে ঐ সকল মৌলিক প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছেন যার উপর আমার আপনার সাফল্যের নিহিত… দুনিয়ার এই জীবনের বাস্তবতা কী, আমার ও আপনার যত দৌড়-ঝাঁপ, খেল-তামাশা এই দুনিয়াতে হচ্ছে তার বাস্তবতা কী, সফলতার ভিত্তি কোন জিনিসে, সামনে এক জগত আসছে তার বৃত্তান্ত দেয়া হয়েছে… অনেকগুলো কথা আছে যা একটিমাত্র আয়াতে আল্লাহ অন্তর্ভূক্ত করে দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন, كل نفس ذائقة الموت

কথার সূচনা একটি বাস্তবতা বর্ণনার দ্বারা হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষকে, প্রত্যেক প্রাণীকে, প্রত্যেক নফসকে মৃত্যুর মজা… মৃত্যুর স্বাদ চেঁখে দেখতে হবে।

মৃত্যুর কথা আল্লাহ কুরআন মাজীদে বারবার, বিভিন্ন পারায়, বিভিন্ন ভঙ্গিতে আমাকে এবং আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য উল্লেখ করেছেন… যে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী… বিভিন্ন ভঙ্গিতে আল্লাহ মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ বলেন, اينما تكونوا يدرككم الموت “তোমরা যেখানেই থাক, মৃত্যু সেখানে এসে তোমাদের পাকড়াও করবে” ولو كنتم في بروج مشيدة “চাই তোমরা মজবুত দূর্গের ভেতরেও লুকিয়ে থাকো না কেন”।

এভাবে আল্লাহ বলেন, اينما تكونوا يأت بكم الله “তোমরা যেখানেই আল্লাহ তোমাদের নিয়ে আসবেন… আল্লাহ তোমাদের হাজির করবেন”।

এরপর আল্লাহ বলেন, ঐসব লোক যারা মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে… তাদের ধারণা ঘরে চুপ করে বসে থাকলে এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকলে বেঁচে যাব।

আল্লাহ বলেন, ঐসব লোক যাদের নিহত হওয়া (তাকদীরে) লেখা আছে لبرز الذين كتب عليهم القتل الى مضاجعهم যদি মৃত্যুর সময় এসে পড়ে, তবে ঐসব লোক যাদের ব্যাপারে মৃত্যুর ফয়সালা হয়ে গিয়েছে… হত্যার ফয়সালা হয়ে গিয়েছে তারা নিজেরাই নিজেদের হত্যাস্থলে হেঁটে চলে আসবে।

মৃত্যু এমন কোন জিনিস নয়, যাকে টলানো যায়। মৃত্যু এমন কোন জিনিস নয় যা থেকে আমি-আপনি পালাতে পারব।

আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) কে সম্বোধন করে এরশাদ করেন, وما جعلنا لبشر من قبلك الخلد “(হে মুহাম্মদ সা. !) আমি আপনার পূর্বে কাউকেই চিরকালের জীবন দেই নি” افان متت فهم الخالدون “যদি আপনার মৃত্যু আসে, তবে (আপনার শত্রুরা যারা কথা বানাচ্ছে) তার চিরকালের জীবন পাবে?” অবশ্যই না!

كل نفس ذائقة الموت প্রত্যেক মানুষকে, প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। ونبلوكم بالخير والشر فتنة আর এই জীবনের (স্বরূপ) কী? আল্লাহ বলেন, এটা তো ব্যাস (এতটুকুই যে)…এখানে আমি আপনাকে ভাল এবং খারাপের দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি, কখনো সুস্থতা-অসুস্থতার দ্বারা পরীক্ষা করি, জয়-পরাজয় দিয়ে পরীক্ষা করি। তো কেবল ভাল এবং খারাপের দ্বারা দুনিয়াতে পরীক্ষা করা হচ্ছে والينا ترجعون এরপর তোমাদের আমার কাছে ফিরে আসতে হবে।

এভাবে আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন كيف تكفرون بالله আল্লাহর সাথে কীভাবে তোমরা কুফরি কর? কীভাবে স্পর্ধা হয় তোমাদের আল্লাহর নাফরমানী করার? وكنتم اموتا অথচ তোমরা মৃত ছিলে… তোমাদের প্রাণ ছিল না। فاحياكم এরপর তিনি তোমাদের জীবিত করলেন ثم يميتكم এরপর তিনিই তোমাদের আবার মৃত্যু দিবেন ثم يحييكم এরপর তিনিই আবার জীবিত করবেন ثم الينا ترجعون এরপর তার কাছেই ফিরে যেতে হবে।

তো দেখুন! কুরআনে বিভিন্ন ভঙ্গিতে আল্লাহ এই কথাটি পুনরাবৃত্তি করছেন انك ميتون وانهم ميتون “হে নবী সা.! আপনারও মৃত্যু আসবে এবং (আপনার এই দুশমনদের যারা আপনার বিরূদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে) এদেরও মৃত্যু আসবে।”

এইভাবে হাদীসে এসেছে, রাসুল সা. আমাদের দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি (সা.) (দোয়া তে) বলেন, يا حي الذي لا يموت والجن والانس يموتون অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি সেই সত্তা যার কোন মৃত্যু নেই, আর বাদবাকি সমস্ত জ্বিন এবং ইনসানের মৃত্যু আসবে।” এইভাবে আল্লাহ কুরআনে নিজের গুণ বর্ণনা করেন, هو الاول والاخر “প্রথমও তিনি, শেষও তিনি।” হযরত ইমাম ত্বাহাবী রহ. আল্লাহর গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন, قديم بلا ابتداء “তিনি এমন আদি সত্তা যার কোন সূচনা নেই।” ودائم بلا انتهاء “এবং তিনি এমন চিরস্থায়ী সত্তা যার কোন সমাপ্তি নেই।”

আল্লাহ এই কথাটিই বলেছেন كل شيئ هالك الا وجهه “প্রত্যেক বস্তু শেষ হয়ে যাবে… ধ্বংস হয়ে যাবে কেবল আল্লাহ তায়ালার চেহারা ব্যাতীত।” ইমাম মুজাহিদ রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন , “আল্লাহর চেহারা বলতে এখানে উদ্দেশ্য আল্লাহর সত্তা। মানে সমস্ত বস্তু শেষ হয়ে যাবে কেবল আল্লাহর সত্তা ব্যাতীত।” আর ইমাম সুফিয়ান সাওরী রহ. লিখেন, এখানে “আল্লাহর চেহারা” বলতে উদ্দেশ্য الا ما اريد به وجهه “প্রত্যেকে বস্তু শেষ হয়ে যাবে কেবল সেই আমলগুলো ব্যাতীত যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা হয়।” তো সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, কিছুই বাকি থাকবে না।

এক হাদীসে এসেছে, “যখন এই আয়াত নাযিল হল كل من عليها فان “জমিনের উপর যা কিছু আছে সে সবকিছু নশ্বর (ধ্বংসশীল)” ويبقى وجه ربك ذو الجلال والاكرام “কেবল প্রতাপ ও প্রতিপত্তির অধিকারী আপনার রবের চেহারা বাকি থাকবে”। তখন এই আয়াত যখন নাযিল হল, ফেরেশতারা বলতে লাগল, “জ্বিন-ইনসান (তথা) দুনিয়াবাসী তো মারা গেল… মানে তাদের মৃত্যু লেখা হয়ে গেছে। এরপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন كل شيئ هالك الا وجهه “সমস্ত বস্তু ধ্বংস হবে কেবল আল্লাহর সত্তা ব্যাতীত” তখন এর উপর ফেরেশতারা বলল متنا “আমরাও মারা গেলাম।” মানে মৃত্যু আমাদের জন্যও লিখে দেয়া হয়েছে। স্থায়ী সত্তা কেবল একজনই। আর তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার সত্তা।

তো আল্লাহ তায়ালা কুরআনে আমাদের বারবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন… ঐ সত্যিকারের মনযিলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যেখানে আমাকেও যেতে হবে, আপনাদেরও যেতে হবে। তো মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, গাফেল হয়ে যায়। আর আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। কুরআনের কাজ এটাই… তাযকীর… স্মরণ করিয়ে দেয়া।

হাদীসে এসেছে الناس نيام লোকেরা ঘুমিয়ে আছে فاذا ماتوا استيقظوا যখন তারা মারা যায়, তখন তারা জেগে ওঠে। তো কুরআনেও একই কথা সুরা ইয়াসীনে বলা হয়েছে, যখন লোকেরা (পুনরুত্থানের পর) উঠবে, তখন উঠে কী বলবে? من بعثنا من مرقدنا কে আমাদেরকে স্বপ্নের স্থান থেকে উঠিয়ে দিল? তো গাফলতের মধ্যে যে জীবন চলে… বাহ্যিকভাবে একজন মানুষ হয়ত চলছে-ফিরছে। কিন্তু যদি আখিরাতের ব্যাপারে গাফেল থাকে, নিজের পরিণতি সম্পর্কে গাফেল থাকে, যেখানে যেতেই হবে সেখান সম্পর্কে গাফেল থাকে, তাহলে এটা তো জীবন নয়। বরং তারা তো চলাফেরা করা লাশ। হাদীসেও এই কথাই এসেছে, শুয়ে আছে সবাই। মরবে। তারপর হুশ ফিরবে যে, আচ্ছা! বাস্তবতা তো এটাই ছিল। এখানেই তো ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তো এর প্রস্তুতি নেই নি।

তো আল্লাহ তায়ালা বারবার… বারবার কুরআনে আমার-আপনার ফালাহের জন্য… আমার-আপনার সফলতার জন্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, আমার-আপনার আসল ঠিকানা ঐটা (আখিরাত)। এই দুনিয়ার রঙ-তামাশায় হারিয়ে যেও না।

About GazwatulSolder

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*